 |
অত্তিলা জোসেফ। জন্ম ১৯০৪, বুদাপেস্টে। বাবা কাজ করতেন সাবানের কারখানায়। অত্তিলার বয়স যখন তিন, তখন সংসার ফেলে চলে যান তার পিতা। গরিব মায়ের পক্ষে তার প্রতিপালন সম্ভব ছিল না। অতটুকু ছেলেকে পাঠিয়ে দিতে হয় দত্তক নেয়া এক পরিবারের কাছে। সেই পরিবারের কাছে ছিলেন সাত বছর বয়স পর্যন্ত। ওই বয়সেই খামারের কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। তবে এসবের চেয়ে ছোট অত্তিলার কাছে দুর্বিষহ ঠেকেছিল, তার নাম নিয়ে তার দত্তক পিতামাতার মর্মান্তিক রসিকতা। তাদের মতে অত্তিলা কারো নাম হতেই পারে না। তারা তাকে ডাকতে শুরু করেছিল নতুন নামে, ‘পিস্তা’। এই ডাক ছোট্ট অত্তিলার অস্তিত্বকেই যেন বিপন্ন করে ফেলে। বইয়ের পাতায় হান সম্রাট অত্তিলার কথা পড়েন, আর সম্রাটের সাথে সুদূরবর্তী সম্পর্কের কথা ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। নাম নিয়ে তার এই সংকটের কথা বারবার পাওয়া যাবে তার কবিতায়।
প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হলে দুর্দশা চরমে পৌঁছে। তার ভাষায়, ‘সন্ধ্যা নয়টার দিকে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়াতাম, সকাল আটটার দিকে বলা হত রান্নার তেল সব ফুরিয়ে গেছে... সিনেমা হলে খাবার পানি বিক্রি করেছি... কয়েকবার কয়লা চুরি করেছি যাতে পোড়ানোর জন্য কিছু একটা পাওয়া যায়’। ধনী শিশুদের কাছে কাগজের উইন্ডমিল তৈরি করে বিক্রিও করেছেন কিছু দিন। যুদ্ধ শেষ হলে মায়ের মৃত্যু ঘটে। এতিমখানা বোর্ড অত্তিলার নতুন অভিভাবক নিযুক্ত করে। এতে করে অবস্থা কিছুটা হলেও ফেরে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পান। ১৭ বছর বয়সে প্রথম কবিতা ছাপা হয়। কবিতার প্রচুর প্রশংসা মিলে, বিস্ময় প্রতিভা হিসেবেও ভাবা শুরু হয়ে যায়। যদিও আত্মীয় বন্ধুহীন অবস্থায় এরই মধ্যে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করে ফেলেছেন।
আত্তিলা ছিলেন দুর্দান্ত ভালো ছাত্র। কিন্তু দারিদ্র্য আর দুর্ভাগ্য তাকে সবসময়ই তাড়া করে ফিরেছে। সেই তাড়া থেকেই দুয়েক ক্লাস টপকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ফলাফল সন্তোষজনক। কলেজে পড়ার সময় শিক্ষক হবার ইচ্ছা প্রবল হয়। কিন্তু সেটি আর পূরণ হতে পারে নি। কিছু দিন পড়ালেখা করেন বুদাপেস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু এরই মাঝে হাইকোর্টে অভিযুক্ত হয়ে গেছেন কবিতা লেখার দায়ে। শিক্ষকতার একটা চাকরির জন্য আবেদন করেন। ফল, নিশ্চিত চাকরিটাও হাতছাড়া হলো। বুদাপেস্ট ছেড়ে চলে যান প্যারিসে, পড়াশোনা শুরু করেন সর্বর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাঝের সময়টা খবরের কাগজ বিক্রি করে আর ডর্মেটরিতে সাফ-সাফাই এর কাজ করে খরচ চালাতে হয়। প্যারিসে পড়ার সময়ই হেগেল ও মার্ক্সের লেখার সাথে পরিচয় ঘটে। প্যারিসের অনেক বিখ্যাত পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হতে থাকে। একটা ব্যংকেও কেরানির কাজ করেছিলেন কিছুদিন। সেটিও দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত নেন কবিতা লিখেই জীবন চালাবেন। বায়োডাটার শেষ লাইন এ লিখেছেন, ‘আমি নিজেকে সৎ, বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী মনে করি, এবং নিজের সুস্পষ্ট ও সম্যক প্রকাশে সক্ষম’। ১৯৩০ সালে যোগ দেন নিষিদ্ধ ঘোষিত হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট পার্টিতে।
স্কিৎজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। মৃত্যু ঘটে ১৯৩৭-এ, ৩২ বছর বয়সে। আত্মহত্যা করার জন্য, অসুস্থ অবস্থায় রেললাইনের উপরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন চলন্ত ট্রেনের দিকে।
তার কিছু কবিতার অনুবাদ দেয়া হলো। দ্বিতীয় কবিতাটির বিরুদ্ধে ব্লাসফেমির অভিযোগ আনা হয়।
(১)
লিডির ছোট ভাই এইখানে,
খান বতুর বুদাপেস্টের কুটুম,
রুটির উপরই তো চলে গেলো অনেকগুলি বছর,
পালকগোঁজা দামি কম্বলেও কোনোদিন ছিল না অধিকার;
যার কবিতার জন্য মৃত্যুও
কাঠের পাত্রে ঢেলে দেয় ধোঁয়া উঠা শিম-
হে বুর্জোয়া! হে প্রলেতারিয়েত!–
আমি, আত্তিলা জোসেফ, এইখানে!
(২)
আমার না আছে পিতা, না মাতা
না কোন ঈশ্বর, না কোন রাষ্ট্র,
না শয্যা, না কফিন,
প্রেমিকা নেই, নেই চুম্বন।
তিন দিন হলো
না এক টুকরো খাবার, না কোন ভোজ।
সঞ্চয় বিশ বছরের উদ্যম
আমি এই বিশ বছর বেচে দেব।
আর যদি কেউ না নেয়
তবে শয়তানের কাছেই বিক্রি হবো।
নিষ্পাপ হৃদয়ে আমি করব প্রতারণা-চুরি
বিপাকে পড়লে খুন।
ধরা পড়ে যাবো, ফাঁসি হবে
প্রিয় পৃথিবী ঢেকে দেবে দেহ
মৃত্যুঞ্জয়ী ঘাস হয়ে জন্মাবে
আমার হৃদয়।
(৩)
শোন, আমি পেয়ে গেছি জন্মভূমির খোঁজ-
ঘর; যে মাটিতে খুঁড়ে দিবে গোর;
তার `পরে লিখে দিবে ক` অক্ষরে
বানানে নির্ভুল, একবার শেষবার, আমার নাম-স্বাক্ষর।
বসুধা দ্বিধা; নিলে সেই ঘরে; অন্ধকারে
দিলে ঠাঁই; (নাই আর কোন উপযোগ
অবশেষ), আট আনার আধুলি
ক্ষয়ে ক্ষয়ে, এখন অচল লোহা।
এ লোহায় রুচি নেই, নতুন পৃথিবী চায়
ভূমি, অধিকার: আমি পড়ি
প্রতি অক্ষর; যুদ্ধের অক্ষর-
সকলের কামনায় স্বর্ণরেণু।
অনেক দিন, আমি চলে গেছি একা;
এর পর- অনেকেই ত্রস্তপদে,
বলে গেলো: তুমিও হতে আমাদেরই
একজন হয়তো; তুমি রয়ে গেলে বোকা।
এমনি জড়বুদ্ধি জীবনের
গর্ব অবসানে দেখি: অসার ও
শূন্যতা; ওরা এমনকি
আমার মৃত্যুকেও দিয়েছে ব্যর্থতা।
উজানের দুর্বিপাকে, সারাটা সময়
চেয়েছি শুধু ভেসে থাকতে,
নিদারুণ কৌতুকে, দেখি আমিও
আরো অনেকের মত শুধুই পাপী।
বিচিত্র ঋতুভার বর্ষা-বসন্ত,
শরতেও সেই; প্রিয় শীত আমার-
প্রিয়জনের ওম আর উষ্ণ মেঝের
জন্য অতিথির প্রয়োজনীয় প্রার্থনা শুধু।
(৪)
সেদিন গিয়েছে চলে, দূর, বুঝে গেছি,
ক্রুদ্ধ গগন তলে-
ভেক আমি এক; উভচর।
এ কবিতা আমার-
অশান্ত হৃদয়ের বুদ্বুদ; নেই কোন প্রভু ইবলিশ
নেই কোন কীট অনুচর।
আমি বেঁচে থাকি-
সমুদ্রে, স্বর্গ শৃঙ্খলে-
দেবতা ও মৎসের প্রায়।
হে জীবন, মহাসমুদ্র মোর!
নিচ্ছে টেনে উষ্ণ বাহুডোরে,
আর মগজের ঘিলু-সঞ্জাত
মানবিক স্বচ্ছ আলোয়, আমার বেহেশত।
বাংলাদেশ সময়: ১৫১০ ঘণ্টা, ১৭ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর mjferdous0@gmail.com