 |
ঢাকা: নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে বিমান হামলার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক চরম ট্রাজেডির দিন।
১১ বছর আগের আজকের দিনে মার্কিন সাম্রাজ্যের হৃদপিণ্ডে আঘাত হেনে কাঁপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এর ভিত্তিমূল।
ওই হামলার পরপরই পাল্টে যায় পুরো পৃথিবীর প্রচলিত সব হিসাব নিকাশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে প্রোথিত হয় এক অলঙ্ঘ সীমারেখা, নাইন ইলেভেনের আগের আর নাইন ইলেভেনের পরের পৃথিবী।
২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যাত্রীবাহী বিমান দিয়ে আঘাত করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্রে। ওই ঘটনায় পুরো ধ্বসে পড়ে টুইন টাওয়ার, নিহত হয় তিন হাজারেরও বেশি মানুষ।
পাশাপাশি আঘাত হানা হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রতাপশালী সামরিক দপ্তর পেন্টাগনের পঞ্চভূজাকৃতি সুরক্ষিত ভবনে।
আল কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সন্ত্রাসী ছিনতাই করা যাত্রীবাহী বিমান দিয়ে ওই হামলা চালায় বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পার্ল হারবারে পরিচালিত জাপানি হামলার পর একক ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আমেরিকান নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে এদিনই। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পরিচালিত প্রথম শত্রু হামলা হিসেবেও বিবেচনা করা হয় নাইন ইলেভেনকে। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েও যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড কখনই আক্রান্ত হয়নি শত্রুদের হাতে।
নাইন ইলেভেন স্মরণে গত ১০ বছর ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করলেও একাদশ বার্ষিকীতে এসে এর আবেগ কিছুটা থিতিয়ে এসেছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই। অনেকটা যেন অনাড়ম্বরভাবেই যুক্তরাষ্ট্র স্মরণ করছে নাইন ইলেভেনকে।
তবে নাইন ইলেভেনের একাদশ বার্ষিকীতে পৃথিবীতে অনেক পরিবর্তনই এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চোখে বড় সন্ত্রাসী ও তাদের শত্রু ওসামা বিন লাদেন নিহত হয়েছেন মার্কিন কমান্ডোদের হাতে। আফগানিস্তানের তালেবানরা ক্ষমতাচ্যুত। বেঁচে নেই ইরাকের প্রবল প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার লৌহমানব গাদ্দাফি।
ইতিমধ্যেই নিউইয়র্কে নাইন ইলেভেনে বিধ্বস্ত হওয়া ভবনদুটির জায়গায় নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। খুলে দেওয়া হলে এটি আবারও অধিষ্ঠিত হবে নিউইয়র্ক নগরীর উচ্চতম ভবনের মর্যাদায়। উল্লেখ্য, ধসে পড়ার আগে টুইন টাওয়ারই ছিলো নিউইয়র্কের সবচেয়ে উঁচু ভবন।
মঙ্গলবার নাইন ইলেভেনের মূল অনুষ্ঠান হবে নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে। নাইন ইলেভেন হামলা এবং এর আগে ১৯৯৩ সালে একই স্থানে পরিচালিত গাড়ি বোমা হামলায় নিহতদেরসহ মারা যাওয়া মোট ২ হাজার ৯৮৩ জনের নাম পড়ে শোনানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হবে মূল অনুষ্ঠান।
এ সময় উপস্থিত থাকবেন নাইন ইলেভেনে নিহতদের আত্মীয় স্বজনরা। নামগুলো পড়ে শোনানোর সময় পেছনের অর্কেস্ট্রোতে বাজানো হবে বিষাদের সুর। এছাড়া হামলার জন্য ব্যবহৃত যাত্রীবাহী বিমান চারটির ছিনতাই হওয়ার মুহূর্তের স্মরণে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা পালন করা হবে।
ওই চারটি বিমানের মধ্যে দুটো আছড়ে পড়েছিলো টুইন টাওয়ার নামে অভিহিত সুউচ্চ ভবন দু’টিতে। ভবন দু’টি ভেঙে পড়ার সময়ের স্মরণেও পালন করা হবে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা।
তবে গ্রাউন্ড জিরোতে আয়োজিত এবারের অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কের মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য হাইপ্রোফাইল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা আসছেন না বলে জানা গেছে। অবশ্য ২০১১ সালে হামলার দশম বার্ষিকীতে এই গ্রাউন্ড জিরোতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভিআইপি অতিথিদের একটি বিশাল দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
নাইন ইলেভেন উপলক্ষে কর্তৃপক্ষের নেওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও অন্যান্য পদক্ষেপের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে অবগত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
মঙ্গলবার সকালে বারাক ওবামা ও ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে আয়োজিত এক স্মরণসভায় সভায় যোগ দেবেন। এর পর তারা পেন্টাগনে স্থাপিত স্মরণস্তম্ভে গিয়ে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন।
এরপর ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিকের সেন্টারে যুদ্ধাহত সেনা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করবেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। এর আগে গত সপ্তাহে দেওয়া রেডিও ভাষণে ওবামা বলেছিলেন, নাইন ইলেভেনের পর যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেক বেশি শক্তিশালী ও নিরাপদ।
তবে তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মিট রমনি নাইন ইলেভেন বার্ষিকীর প্রাক্কালে দেওয়া বক্তৃতায় ওবামার সমালোচনা করে বলেন, আরব বসন্তের সময় তিনি অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে না পারার কারণেও ওবামার সমালোচনা করেন তিনি। এখনও আফগানিস্তানে মার্কিন সেনারা আল কায়েদার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মঙ্গলবার নাইন ইলেভেন স্মরণে নেভাডা অঙ্গরাজ্যের রেনোতে ন্যাশনাল গার্ড অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেবেন তিনি। পাশাপাশি নাইন ইলেভেন উপলক্ষে ফ্লোরিডায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন তার স্ত্রী অ্যান।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও মঙ্গলবার পেনসিলভানিয়ার শ্যানকসভিলে ‘ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩’ হিসেবে অভিহিত ছিনতাই হওয়া বিমানটির বিধ্বস্ত হওয়ার স্থানে স্থাপিত স্মরণ স্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাবেন।
উল্লেখ্য, ছিনতাইকারী ও যাত্রীদের ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে হোয়াইট হাউসের লক্ষ্যে ধাবিত বিমানটি এখানেই বিধ্বস্ত হয়।
এদিকে নাইন ইলেভেনে নিহতদের পাশাপাশি আফগানিস্তানে লড়াইরত সেনাদের ভুলে না যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী লিও প্যানেট্টা ।
সোমবার পেনসিলভানিয়ায় শ্যানকসভিলে ‘ইউনাইটেড ৯৩’ ফ্লাইটটির বিধ্বস্ত হওয়ার জায়গায় স্থাপিত স্মরণ স্তম্ভে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্যানেট্টা বলেন, “বিশ্বব্যাপী আল কায়েদার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। এখনও সেনারা একই উদ্দেশ্যে প্রতিদিনই তাদের নিজের জীবন দিয়ে যাচ্ছেন।”
বাংলাদেশ সময়: ১৮২২ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১২
সম্পাদনা: রাইসুল ইসলাম, নিউজরুম এডিটর; আহমেদ জুয়েল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর