 |
| ছবি :কাশেম হারুন/বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
ঢাকা: দেশে অনুষ্ঠিত বাণিজ্যমেলা বহির্বিশ্বে দেশি পণ্যের বাজার সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক সম্বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ভূমিকা রাখছে বিজনেস ট্যুরিজম ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও।
বাংলানিউজকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এ কথা জানিয়েছেন কনফারেন্স অ্যান্ড এক্সিবিশন ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের (সেমস গ্লোবাল) প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মেহরুন এন. ইসলাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা মেহরুন ইসলাম দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কাজ করছেন বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, মার্কেটিং, এডভারটাইজিংসহ নানা বিষয়ে। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন থেকে সম্পন্ন করেছেন কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ও কম্পিউটার কোর্সও।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অসংখ্য দেশে বছরে একাধিক বাণিজ্য মেলা আয়োজন করে থাকে তার নেতৃত্বাধীন এ প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ, দেশের ব্যবসায়ীদের নিত্য নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের সুযোগ, গার্মেন্টস ও অন্যান্য শীর্ষ খাতের উপকরণ সহজে ক্রয়ের সুবিধাসৃষ্টি, বিজনেস ট্যুরিজমসহ দেশিয় অর্থনীতিতে নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এসব আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী।
অবদান রাখছে বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে সুসম্পর্ক তৈরি ও ইতিবাচক ইমেজ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও। আসছে রমজানকে সামনে রেখে মঙ্গলবার থেকে সেমস্ গ্লোবাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজন করছে আট দিনের পঞ্চম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা।
মেলার উদ্বোধনী দিনে সেমস গ্লোবালের প্রতিষ্ঠা ও এর ধারাবাহিক কার্যক্রম, বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা এবং প্রতিবন্ধকতাসহ অন্যান্য বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মেহরুন এন. ইসলাম কথা বলেছেন বাংলানিউজের সঙ্গে। তার বিশেষ এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলানিউজের স্টাফ করেসপন্ডেন্ট আশরাফুল ইসলাম।
বাংলানিউজ: সেমসের প্রতিষ্ঠা ও শুরুটা কিভাবে করলেন?
মেহরুন এন. ইসলাম: ১৯৯২ সালের আগে দেশে বিজিএমইএ ও দু’একটি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে বাণিজ্য মেলা আয়োজন করতো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা দেখে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় তেমন একটি বৃহৎ আয়োজনের বাসনা তৈরি হয়। সে আকাঙ্খা থেকেই তৈরি পোশাকখাতসহ অন্যান্য সেক্টরের পণ্যের বিপণন ও আন্তর্জাতিক বাজার তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে সেমস প্রতিষ্ঠা করি।
১৯৯২ সালে সেমস প্রথম আয়োজন করে নির্মাণ সামগ্রীর প্রদর্শনী। ধারাবাহিকভাবে তৈরি পোশাক সামগ্রীর প্রদর্শনী আয়োজনের পর ব্যাপক চাহিদা প্রত্যক্ষ করলাম। এর ফলে একটি পেশাদারি মনোভাব গড়ে উঠলো। একে একে আমরা আয়োজন করলাম মোটর শো’, পাওয়ার অ্যান্ড সোলার শো’, ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল এক্সপোসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যের বৃহৎ প্রদর্শনী।
২০০২ সালে এটি আন্তর্জাতিকভাবে কাজ শুরু করে। চলতি বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩তম টেক্সটেক ইন্টারন্যাশনাল এক্সপো ২০১২, ৬ষ্ঠ ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল আয়রন অ্যান্ড ফেব্রিক্স শো ২০১২ ও ১২তম ডাইস অ্যান্ড কেমিক্যাল এক্সপো ২০১২-তে ৪০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ায় এর সরাসরি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া আরও ১০টি দেশ সহযোগী হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। প্রতি বছর ৫টি দেশে ৩৭টি আন্তর্জাতিক এক্সিবিশনের আয়োজন করছে সেমস গ্লোবাল ।
বাংলানিউজ: এসব আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ মূলত: কী কী অর্জন করছে?
মেহরুন এন. ইসলাম: এসব প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য বা কাঁচামাল কেনার জন্য আমাদের ব্যবসায়ীদের আগে ওইসব দেশে যেতে হতো। সে কারণে কাঁচামাল ক্রয়ের সঙ্গে যাতায়াতসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় অনেক বেড়ে যেতো। দেশেই বিশ্বের অনেকগুলো দেশের শীর্ষ কোম্পানির কাঁচামাল এসব মেলায় ক্রয়ের সুযোগ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় সুযোগ। তারা তাদের এক্সপার্টদের সঙ্গে নিয়ে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে কাঙ্খিত কাঁচামালটি কিনতে পারছেন। এতে বড় অংকের খরচ বেচে যাচ্ছে দেশের উদ্যোক্তাদের।
এছাড়া মেলায় অংশ নেওয়া অসংখ্য বিদেশি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা যারা আমাদের হোটেলে থাকছেন, খাবার খাচ্ছেন, এয়ারলাইনসগুলো ব্যবহার করছেন, সর্বপরি আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও লাভবান করছেন। সম্প্রসারিত করছেন বিজনেস ট্যুরিজমের ক্ষেত্রটিও। এর বাইরেও এসব আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে অনেক ভাবেই লাভবান হচ্ছি আমরা।
বাংলানিউজ: বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এসব আন্তর্জাতিক মেলা কী ভূমিকা রাখছে?
মেহরুন এন. ইসলাম: বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসব মেলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া অনেক ব্যবসায়ীই দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তুলছেন, নিজেরাই বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন।
তৈরি পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে। বিসিক শিল্পনগরী ও ইপিজেডগুলোতে গড়ে তোলা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অনেক প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশে এসেছে এসব মেলার সূত্র ধরে।
বাংলানিউজ: বাংলাদেশের প্রচলিত ও অপ্রচলিত পণ্যের বিদেশে বাজার সৃষ্টির ক্ষেত্রে এসব মেলার কী ভূমিকা রয়েছে?
মেহরুন এন. ইসলাম: দেশে উৎপন্ন ডাইস ও কেমিক্যালস, সিরামিকস ও মেলামাইন, পাওয়ার ও সোলার, বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে রূপান্তরিত কৃষিপণ্য ইত্যাদির বৈদেশিক বাজার সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা রাখছে এই আন্তর্জাতিক মেলাগুলো। ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত, সিংগাপুর ইত্যাদি দেশে অনুষ্ঠিত সেমস-এর প্রদর্শনীতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য বিশাল বাজার সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলানিউজ: এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনায় কী ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন, বিশেষ করে দেশে?
মেহরুন এন. ইসলাম: বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক এসব মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে, এখানে উপযুক্ত অবকাঠামো নেই। যেসব ভেন্যুতে এখন আয়োজন করছি, তাতে রয়েছে নানা বাধা-বিঘ্ন। অনেক সময় আগে ভেন্যুগুলোতে বুকিং দেওয়া হলেও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের অযুহাত দেখিয়ে মেলা শুরুর পর হঠাৎই বন্ধ করে দিতে হয়। এতে আমরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ি। বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে দেশের ইমেজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নেই-এমন ধারণার জন্ম হয়, যা আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
তাই সরকারের কাছে একটি স্থায়ী সুবিধা সম্বলিত ট্রেড সেন্টারের দাবি করছি এবং সেটি রাজধানী কেন্দ্রিক যাতে হয়। বিশ্বের সম্বৃদ্ধ দেশগুলো এ বিষয়ে অনেক আগে থেকেই এগিয়ে রয়েছে।
বাংলানিউজ: আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা-
মেহরুন এন. ইসলাম: সাউথ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রোডাক্ট এক্সচেঞ্জ গড়ে তুলেতে চাই। গোটা এশিয়ায় জানিয়ে দিতে চাই বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্যে এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে সেমস কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।
বাংলাদেশ সময়: ১৮১৬ ঘণ্টা, জুলাই ১০, ২০১২
সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর