 |
| অলঙ্করণ: সরফরাজ স্বয়ম |
কবিতা নিয়ে কী বলবার আছে আমার যে। ভেবে পাই না। ভেবে পাই না মানে ভাবতেই পারি না। আমি হলাম কবি-কবি-ভাব ভাবের অভাব। এ-অভিযোগ অনেকের। অনেকে বলেন আমার কবিতা প্রকরণ-সর্বস্ব, ওতে ‘ভাব’ নাই, ভাবানো নাই, আছে খালি ভ্যাবানো, খালি খালি-শব্দ, ফাঁকা আওয়াজ। মানে, কবিতায় প্রাণ নাই আমার, দেহ শুধু আছে। লাশের সৌন্দর্যে কে-ই বা আহা-উঁহু করবে। কে-ই বা নাকে রুমাল দিয়ে তারপর মুখ ফিরিয়ে না-নেবে। শকুন শেয়াল কেউ নয় তো। আমি-ছাড়া, হয়তো।
এমন এক অস্তিত্ব-সঙ্কট, তাও এই পড়ন্ত বেলায়, কী যে বাক্-রুদ্ধ (বা ক্রুদ্ধ) অসহায়তার।
আমি পিছন ফিরে তাকাই ফেলে-আসা দিনের দিকে, মাড়িয়ে-আসা পথের পানে। অসঙ্গতিগুলি কোথায় ছিলো যে, টের পেতে চাই। আয়োজন তো ভালোই ছিলো জমজমাট। এর অর্ধেক চেষ্টায় চারটা বিয়ে ক’রে ফেলা যেতে পারতো। কিন্তু, তবু, কেন, এই বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া। সারা পথ নুড়ি কুড়িয়ে এক আস্ত গন্ধমাদনের সামনে আমি বিমূঢ়। পরশপাথরটি খুঁজেই পাওয়া গেল না। যাবে না আর। লোকে বলে সেই পরশপাথর ‘ভাব’। কী বস্তু এই ‘ভাব’? কী তার স্বভাব?
দেখে-শুনে যা মনে হচ্ছে তা এই যে ‘ভাব’ আর ‘ভাবনা’ আসলে দু’টি শত্রুভাবাপন্ন ব্যাপার। ভাবনার ফসল ভাব না, বরং হয়তো ভাবনার অভাবই ভাব, বা ভাব-এর অভাব ভাবনা। আমার নিজের অবশ্য হয়তো দুইয়েরই অভাব, মানে ‘ভাব-না’র অভাব। তবে আমি ভাবনা কিছু বুঝি। মানে কীনা কবিরা আমাকে ‘বোঝাতে’ চান কিছু যখন, আমি বুঝি যে তাতে ভাবনা আছে। আমি কৌতূহলী হই, ভাবনার সূত্রগুলি ধরতে আঙুল বাড়াই, মাঝে-মাঝে ধ’রে ফেলিও একটা-দু’টো, মনে হয়, আর আনন্দ— জিগস পাজল মেলাবার। কাব্য-আস্বাদনেরও কি? জানি না। জানি না ‘কাব্য-আস্বাদন’ কী আসলে।
কবিতার পাঠক কারা, এই পৃথিবীতে, এখন? কবিতা কারা পড়ে আর, এখনও? কবিরা, প্রধানত? আর, বোধ হয়, সবে-প্রেমে-পড়া, মেয়েরা? কবিদের কথা পরে বলি। কিন্তু কবি-নয় তবু কবিতা যারা পড়ে, কী তারা পড়ে? আমি এখানে-ওখানে কবিতা নিয়ে মন্তব্য পড়ি; বিশেষ ক’রে যাদেরকে কবি ব’লে জানি তাদের মন্তব্যগুলোকে বাদ দিলে, স্পষ্ট দেখতে পাই যে সবচেয়ে সহজ, সর্বজনীন (রোমান্টিক) উচ্চারণগুলিরই তারিফ সবচেয়ে বেশি, যেরকম এক-দু’টো লাইন খোদ প্রশংসাকারীদের মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়াও, প্রবলভাবেই, সম্ভব। যায়ও। ঐসব তারিফের ভিতরেই। হামেশা। আমি ভাবি, ও-ভাবে না-বললে আর কবি হওয়া হ’ল না এ-মরজীবনে। কিন্তু আমি (আবার) ভাবি, ও-ভাবে বলবার জন্য তেলসলতে-ইলেকট্রিসিটি পুড়িয়ে কবি হবার দরকার কেন। মানে কবি না-হ’য়ে-ই/ও তো অমন ক’রে বলা বা শোনা যেতে পারতো; কবি না-হ’য়েই বরং পারতো।
তবে কি কেবলই কবিদের জন্য লিখতে হবে কবিতা! কবিরা কী আসলে পড়ে? একটা জরিপ ক’রে দেখা যায়। আচ্ছা, (মাসুদ) খান সাহেব, আপনাকে আমার কবিতা পড়তে পাঠালে, পড়েন যখন আদৌ, কী পড়েন আমার কবিতায়? সাজ্জাদ (শরিফ), আপনি? (ব্রাত্য) রাইসু, তুমি? সুব্রত (অ.গো.), আমি (অন্যরা পাঠান যখন আমাকে)? কবিদের পক্ষে কতখানি নিজেদেরকে কবিতা-পাঠক বানিয়ে তোলা সম্ভব, আদতে? নিজের কবিতার সঙ্গে প্রতিতুলনা কতটা না-ক’রে থাকা সম্ভব? আমি বলি, মাসুদ খানের কবিতা আমার প্রিয়। রাশিদা সুলতানা-ও (ধরা যাক, এবং ধরা হ’চ্ছে এ-জন্য যে তিনি মূলতঃ কবি ন’ন,) তা-ই বলেন। কিন্তু আমরা কি একই কবিতা পড়ি খানের কবিতায়? বা আমরা দু’জনই কি ‘কবিতা’ পড়ি? নাকি বরং দু’জন দু’টি ভিন্ন বস্তু পড়ি, যার কোনোটিই কবিতা নয়?
কবি আর কবিতা-পাঠকের বাইরে কবিতা থাকে? মানুষের ইন্দ্রিয়ানুভূতির বাইরে থাকে জগৎপ্রপঞ্চ? থাকেও যদি বা, তার সঙ্গে মানুষের তালুক থাকে কোনো? জগৎ কথাটার কোনো মানে থাকে আর? মানে মানুষের ধারণায়? আর, ধারণা না-থাকলে বস্তু থাকে কোনো? মানে মানুষের কাছে... কোনো (অস্তিবাদ-কথিত?) ‘বিয়িং ইন ইটসেল্ফ’?
কবি আর পাঠকের মৈথুনের প্রসূন হয় যদি কবিতা, এ-দুই ভিন্নজাতীয় সত্তার বিবাহের পৌরোহিত্য কে করে? ভাব? মানে যেমন দু’টি আলাদা-জাতের প্রাণীকে— পুরুষ এবং নারীকে— জুড়ে দেওয়া হয় ‘ভালোবাসা’ নামের একটা আসমানি আঠায়, এবং তার ফলে, ফলে তার নানা সুফল-কুফল, সন্তান-পরিজন-সমাজ-সংসার... ধ’রে নেওয়া হয় যে এ-দুই ভিনজাতের মানুষের মাঝে একটা ‘সামান্য’ আছে, ভালোবাসা... এই কনস্ট্যান্ট-টুকুর উপর ভর দিয়ে আমাদের মানবজাতির যৌথ ইতিহাস আছে দাঁড়িয়ে। কিন্তু কালকে যদি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণিত হ’য়ে যায় যে ভালোবাসা, হয় একটা অলীক ধারণা, নয়তো প্রতিটি মানুষের বুড়ো আংলার ছাপের মতোই ‘অ-সামান্য’, তখন আমাদের পরিজনপরিবৃত ঘরকন্না, জগৎসংসারের অবস্থা কী দাঁড়ায়? (এবং, গাঁয়ে না-মানলেও, বৈজ্ঞানিকেরা এটা একভাবে প্রমাণ কিন্তু ক’রে ছেড়েওছে এর মধ্যে।) অতএব, ভাব নিয়ে ভাবনা, নহে অমূলক।
কিন্তু হায়, ভাবনায় ভাব মেলে না। কীসে তবে মেলে?
কথা বাড়াবার আগে, চলুন, আর-একটা কথা পাড়া যাক। আমাদের গাঁওগেরামে আগে একজন ক’রে বোনাফাইডি ‘ভাবুক’ থাকতো (যেমন থাকতো অন্তত একজন ক’রে চোর, পাগল আর মোড়ল), যার প্রধান বা একমাত্র কাজ হ’ত ‘ভাবা’। সে রাত-দিন ভাবে আর ভাবে, নানা সম্ভব-অসম্ভব বিষয়ে। কিন্তু তার ভাবনায় কিছু এসে যায় না কারো। লোকে তাকে নিয়ে হাসে। তাকে তার ভাবনা বলতে বলে, আইজকা কী ভাবলা, মন্টু মিয়া। ভাবনা শুনে হাসতে-হাসতে বাড়ি যায়। গুরুত্ব দেয় না কিছু। এর কারণ কী। কারণ, মনে হয়, ভাষা— বা, তার অভাব। সে যে কেবলই আবোলতাবোল ভাবে, তা-ও এমনকি না-ও হ’তে পারে— আর, যে-কোনো চর্চাতেই বস্তুলাভ কিছু ঘটবারই তো কথা; রাত-দিন ভাবনার চর্চা যে করে, তার মাথায় চমৎকার কোনো ভাবনার উদয় কখনোই হবে না এমনটা হলপ করে বলা যায় নাকি? কিন্তু সে তা ‘প্রকাশ’ করতে পারে না, পারে না এমনভাবে বলতে যা দাঁড়িয়ে প’ড়ে শুনবে শুধু না, শোনার পরে অন্য মানুষ হ’য়ে যাবে অন্য মানুষেরা।
আমাদের নবিগণের কথা ভাবুন। তাঁদের প্রায় সকলেরই কোন্ গুণটির কথা মনে আসে প্রথমেই? বা কোন্ গুণটি না-থাকলে তাঁদেরকে নবি ভাবতে পারা দুষ্কল্পনীয় হ’য়ে পড়তো?— কথা। তাঁরা প্রায় সকলেই কল্পনাতীত-ভালো বক্তা ছিলেন। ‘প্রবক্তা’। ভাষার, এমন লক্ষ্যভেদী প্রয়োগ— আহা! আজকালকার বাঘা-সিংহা উকিলেরাও, রাজনীতিকেরাও, মুখ লুকাতেন লজ্জায়।
ভাষাই মানুষের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার, শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। ভাষা সবচেয়ে শক্তিশালী রূপে ভাববাদ; সুন্দরতম রূপে, কবিতা। ভাববাদ ‘বাধিত’ করে, যে-কোনো অর্থে; কবিতা করে ‘মোহিত’— সে-ও, যে-কোনো অর্থে। তো ভাষা বড় না ভাব? অন্তত কবিতার ক্ষেত্রে?
কিন্তু ভাষা আর ভাব-এর প্রতিতুলনা সম্ভবই বা কেমন ক’রে?
ভাষা, মোটের উপর, একটা ধরাছোঁয়ার ভিতরকার ব্যাপার, মানে পুরো ট্যানজিবল না-হ’লেও প্যালপেবল তো বটেই। আর ভাব, যে-ভাবেই ভাবা যাক না কেন, তার বাইরের। ভাষা একটা রেওয়াজ-সাধ্য বিষয়, ভাবও কি অভ্যাসলভ্য? যদি না হয়, তো কোনো তুল্যযোগিতা থাকে আর এদের? আবার, হয় যদি, আর তুলনা চলে যদি, তো ভাবের ভাবমূর্তি বজায় থাকে কি আর? তা তো প্রায় ভাবনা হয়ে দাঁড়ায়; মানে কীনা ঈশ্বরে মানবত্ব আরোপ করলে ‘তার’ ঈশ্বরত্ব বহাল থাকবে কোন গুণে (বা নির্গুণে)?
আমাদের আধুনিক ভাববাদীদের সুবিধার্থে আমরা ভাষাকে একটা মানবিক আর ভাবকে একটা ঐশ্বরিক ফেনোমেনন ব’লে ধ’রে নিই আপাতত, ধ’রে নিই যে ভাষাকে মানুষ খেটেখুটে, মুচির সাকরেদের মতো, রপ্ত করে, আর ভাব ঈশ্বর বা প্রকৃতির তরফে কোনো-কোনো অপ্রস্তুত মাথায় ঠাঠার মতো পড়ে কখনও। কিন্তু বিচারটা যখন শিল্পের, কবিতার, ভাববাদের নয়, তখন কোনটির মূল্য আমাদের কাছে বেশি, কষ্টোপার্জনের নাকি অকস্মাৎপ্রাপ্তির? শিকারীর দক্ষতার প্রমাণ তার হাত থেকে ছোঁড়া তিরের লক্ষ্যভেদ নাকি ঝড়ে-মরা বক? একটা দৈবী ওহির মূল্য মনুষ্যরচিত সকল বহির চেয়ে বেশি হয়ও যদি, মানুষের তা নিয়ে বারফট্টাইয়ের কোনো অবকাশ আছে নাকি? সে তো তা-ই নিয়ে কেবল গর্বিত হ’তে পারে যা তার, তারই একান্ত?
প্রকৃতির সকল বস্তু ও প্রাণী সুন্দর, সর্বাঙ্গসুন্দর, এমনকি কেঁচো কিংবা কচ্ছপ কিংবা সিলাকান্থ্। তুলনায়, মানুষের তৈরি কোনোকিছুই সর্বাঙ্গসুন্দর নয়। তবু গাছের গোলাপকে শিল্পকর্ম বলবার সার্থকতা কই। আমরা সোনারুর হাতের ঈষৎ বিকৃতদর্শন গোলাপকেই শিল্প বলি, তাই না? (তাছাড়া, যা সর্বাঙ্গসুন্দর, তাকে আলাদা ক’রে সুন্দর বলা চলে কি আর? পরম সুন্দরের দিকে যাত্রার পথটাকে বরং সুন্দর বলি আমরা, সেই পথটাকে মাপবারও প্রয়াস পাই, এমন বলি যে অমুক লেখাটা, তমুক লেখাটার ‘চেয়ে’ সুন্দর; তদ্রূপ, ‘ঈশ্বর সর্বশক্তিমান’ কথাটাও নিরর্থক।)
মানুষের শিল্প প্রাকৃতিক নয়, কৃত্রিম। এটা বুঝতে বোদলের কি ফিউচারিস্ট হওয়া লাগে না।
ভাব দিয়ে, কাজেই, কবিতা হয় না। ভাববাদও কি হয়? কী হয় তবে ভাব দিয়ে? ভাব হয়? এবং হয় যদি, তো, ভাব, বিশুদ্ধ ভাব, হয় যদি, তার আধার, আর-যে-হোক, মানুষ হ’তে পারে না। ভাব-এর, নিজেরই নিজের আধার হওয়া-ভিন্ন গত্যন্তর নাই। তৈলাধার পাত্র নাকি পাত্রাধার তৈলও নয়, একেবারে তৈলাধার তৈল। ‘যে ধন তোমারে দিব সেই ধন তুমি’— চণ্ডীদাসের রাধা বলেছিল, কৃষ্ণকে। মানে ‘শ্রেষ্ঠ’ যে, তাকে তো ‘শ্রেষ্ঠ’ ছাড়া আর কোনো উপহার দেওয়া যায় না। আর শ্রেষ্ঠ তো নির্বিকল্প। সে তো অনেকের মাঝে এক নয়; এক এবং অদ্বিতীয়।
নাকি ভাব হচ্ছে সেই জিনিস, যার প্রভাবে শ্রীচৈতন্যদেব আর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ঘন-ঘন মূর্ছা যেতেন? মানে কোনো শারীরিক কারণ ছাড়াই হিস্টিরিয়া বা এপিলেপ্সি ঘটিয়ে দেবার মতো কোনো মনোদৈহিক অধ্যাস? তা হয় যদি তো হোক না, সমস্যা কী। কিন্তু তার দ্বারা ভালো কবিতায় জন্ম হয়, এমন তো দেখি না। এই অর্থে যাঁরা ‘ভাবুক’, ওনারা কবিতা লেখেন নাই কেন যে! আহা কেন যে! লিখলে, আমাদের শখের ভাববাদীদের মুখে কতো-না ফুলচন্দন (নাকি চুনকালি?) পড়তো! কতো-না!
য়ুরোপে অটোম্যাটিক রাইটিং-এর চর্চা খুব হয়েছিলো একসময়। অনেক বড় লেখকও (যেমন ইয়েটস) মাঝে-মাঝে করেছেন এটা। এর একটা বড় অংশ ছিল আবার মাদক-প্রযুক্ত। বর্তমান লেখকও এ-কাজের চেষ্টা করেছে একসময়, কিছু। কিন্তু এর দ্বারা খুব বেশি-সংখ্যক প্রথম শ্রেণির রচনার জন্ম হয়েছে ব’লে জানা যায় না।
কাজেই, ‘ভাব’ ব্যাপারটাকে কবিতার আলোচনার বাইরে রাখাটাই সমীচীন মনে হচ্ছে আমার; ‘ভাবনা’ নিয়ে ভাবা যায় বরং, যে-ভাবনা মানুষে ‘ভাবে’, যা মানুষের তৈরি এবং তাই মানুষের পক্ষে বোঝা ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব যাকে। ভাষা আর চিন্তার দ্বৈরথ নিয়ে আদিত্য কবিরের সঙ্গে একবার বাতচিত হয়েছিলো ‘কবিসভা’য়, মনে পড়ে, যেখানে এ-দুইয়ের অন্যোন্য-নির্ভরতা এবং পরস্পরকে শাসন করবার, নির্ধারণ করবার, বিষয়টা আমরা খতিয়ে দেখেছিলাম। আদিত্যর প্রাথমিক প্রস্তাবনা ছিলো এই যে বিশৃঙ্খল ভাষা বিশৃঙ্খল চিন্তার ফসল। আমি তা মেনে নিয়েই আর্জি করেছিলাম যে বিশৃঙ্খল চিন্তাও আবার বিশৃঙ্খল ভাষার ফসল— কেননা, মানুষ ভাষা দিয়ে চিন্তা করে, মানে চিন্তা ভাষার বাইরে নয়।
এখানে ভাষার দু’টি আলাদা পিঠ দেখতে পাওয়া গেল— ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাজ ইনপুট’ আর ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাজ আউটপুট’। ভাষা দিয়ে চিন্তা করলাম, আবার ভাষা দিয়ে তা প্রকাশ করলাম : ভাষা > অর্জন, ভাষা > সর্জন। ফুলের মধু > মৌমাছির পেট > চাকের মধু। চিন্তার ভাষা আর প্রকাশের ভাষা আবার এক কখনও হয় না মানুষের, কেননা এ-দুই ভাষা দু’টি আলাদা প্রক্রিয়ার ফল। কাজেই, প্রকাশমাত্রই আসলে এক প্রকারের অনুবাদ-কর্ম।
অনুবাদ করবার অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে তাঁরা জানেন যে যদিও সোর্স আর টার্গেট, এই উভয় ভাষায় সমপরিমাণ দখল থাকলে হ’ত সবচেয়ে ভালো, অতটা মানুষের থাকে না সচরাচর। একাধিক মাতৃভাষা নিয়ে ক’জন জন্মায়। সেকন্ড বেস্ট অপশন হ’ল টার্গেট ভাষায় জবরদস্ত, এবং সোর্স ভাষায় যথেষ্ট দখল থাকা। মানে, প্রকাশের ভাষায় সম্পূর্ণ দখল না-থাকে যদি, অবস্থাটা হয় আমাদের গ্রামের ভাবুকের। কবি-কবি ভাব, কাব্যের অভাব। অপিচ পাঠক কিন্তু কবিতায় ‘ভাব’ পড়ে না, পড়ে ‘কথা’, শব্দ, ভাষা। ভাব ব’লে থাকেই যদি কিছু, তা নিশ্চয়ই গজায় পাঠকের মনে, তা কবিতায় থাকে না।
এই অর্থে ‘ভাব’ সেই বস্তু যাকে প্রাচীন ভারতের আলঙ্কারিকেরা বলেছেন ‘রস’। এবং তাঁরা বলেছেন যে রস শিল্পভোক্তা বা রসিকের, হৃদয়বানের, মনে তৈরি হয়, খোদ শিল্পবস্তুতে থাকে না। শিল্পবস্তুতে থাকে কিছু সুড়সুড়ি, কিছু ইঙ্গিত, যারা রসিকের মনে রসের আগুনকে উসকে দেয়— একজন সুন্দরীর মুখ যেমন ক’রে একজন পুরুষের ভিতরে কোনো-কোনো হরমোনের ক্ষরণ দেয় বাড়িয়ে।
তাই, যে-কোনো ভাষাব্যবসায়ীকে প্রথমত আয়ত্ত করতে হয় প্রকাশের ভাষা, পরত চিন্তার ভাষা। প্রকাশের ভাষার নানা কায়দা-কানুন, নানা গোমর আছে, তাকে আয়ত্তির আছে কতগুলি ধাপ, আছে শরিয়ত-মারেফত। শরিয়তকে আয়ত্ত না-ক’রে মারেফতে পৌঁছানো যায় না। সাধন মার্গের মতো শিল্পের মার্গেও শর্টকাট কোনো নাই। আজীবন পুণ্যার্জন ক’রে স্বর্গে যাবার দরকার কী, বরং চটজলদি দলায় দড়ি দিয়ে স্বর্গে চ’লে যাওয়া যাক, এমতো ভেবে, তা-ই যারা করে, তারা বড়জোর বুদ্ধুর বেহেশতে গিয়ে পড়ে।
প্রকাশের ভাষার ক্ষেত্রে ‘প্রসাদ গুণ’ ব’লে একটা ব্যাপারের কথা বলতেন আমাদের ম’রে যাওয়া লেখকেরা। এটি নাকি উত্তম লিখিয়েদের একটা বড় পরিচয়-চিহ্ন। তো বাপু বস্তুটা কী আসলে? এরকম শোনা যায় যে ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ক্ল্যেরিটি’ তারেই বাংলায় প্রসাদ গুণ বলতেন মানুষ। ক্ল্যেরিটি, সম্ভবত, অ্যাম্বিগ্যুয়িটির বিপরীতার্থক শব্দ। এ হ’ল ভাষার স্বচ্ছতা, ঋজুতার গুণ, যথার্থ শব্দ-প্রয়োগ, শুদ্ধ ও সুষ্ঠু বাক্যগঠন, আর পরিমিতিবোধের দ্বারা নির্দিষ্ট অর্থযুক্ত সহজবোধগম্য, সহজপাঠ্য এবং তত্তৎসত্ত্বেও কর্ণসুখকর যে রচনাকৃতি তারই জয়গান গাইতেন আমাদের অনুত্তরাধুনিক পূর্বজরা। কী বুদ্ধুই তাঁরা ছিলেন যে, ভাবলেও আজকের তুর্কি তরুণ কবিদের হাসি পায় বোধ হয়।... তো, এই যে ক্ল্যেরিটি তথা প্রসাদ গুণ, এ-জিনিস প্রধানত গদ্য-লিখিয়েদের উদ্দেশে প্রযুক্ত হ’লেও, পদ্যকারেরা যে এমন কোনো লাইসেন্স পেয়ে গেছে যে এর অভাব-সত্ত্বেও বা এমনকি এর অভাবের দ্বারাই তাদের রচনা পাঠযোগ্যতা অর্জন করবে, এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। এটাকেই আমি নিজে বলি ‘গদ্য-সিদ্ধি’, এ যার নাই, গদ্য-পদ্য কোনোটা লেখারই যোগ্যতা তার নাই। যার লেখা একটা বাক্য থেকে কমপক্ষে একটা সুনির্দিষ্ট অর্থের বোধ না হয়, তার লেখা লেখা না, অলেখা।
পক্ষান্তরে, চিন্তার ভাষা আয়ত্ত করা মানে দিনমান ভাবনাচিন্তা করা নয়। এতে ছাত্রত্ব পাবার প্রথম ধাপ হ’ল যথার্থ দীক্ষা— ইনিশিয়েশন। এ-ব্যাপার বাউলদের আছে, আছে সুফিদের, পশ্চিমের ফ্রিমেসনদের, বলতেকি অধিকাংশ বিদ্যা, ধর্ম বা বৃত্তিতেই এটা আছে যে-কোনো-রূপেই হোক। গান শেখা শুরু করতে গাণ্ডা বাঁধবার যে-দস্তুর সেটাও মোটামুটি একই ব্যাপার। এ হ’ল গুরুর কাছে একেবারে দিব্যি দিয়ে, পূর্ণ আত্মসমর্পণ। বিদ্যামাত্রই গুরুমুখী, কৃচ্ছ্রসাধ্য। বাউল ধর্মে ইনিশিয়েট না-হ’য়ে লালনের গানকে সম্পূর্ণ হাসিল করা অসম্ভব। বাইরে থেকে আমরা সূত্রগুলি, তত্ত্বগুলি এক-বসায় প’ড়ে ফেলতেই পারি, কিন্তু তাতে তো বাউল হওয়া হয় না। ভাতখণ্ডের সবগুলি খণ্ড প’ড়েও তো ফৈয়াজ খাঁ হওয়া যায় না, বড়জোর তাঁকে শোনবার ইচ্ছা জাগানো যায় মনে, হয়তো।
আর, দীক্ষাও, একেবারে শুরুর কথা— তার পর থেকে নিজের দেহের দশগুণ ওজনের ঘাম ঝরাবার পরই পাওয়া যেতেও (এবং না-যেতেও) পারে স্নাতকত্ব। আর স্নাতক হবার পর ঝরানো শুরু হয় রক্ত (‘গজল-মে বন্দিশ-এ-আলফাজ-হি নাহি কাফি, জিগর-কা খুন-ভি কুছ চাহিয়ে আসর-কে লিয়ে’)। রক্তক্ষরণ-ব্যতিরেকে স্বাধীনতা আসে না যেমন, শিল্পও আসে না। আর শেষ বিচারে... শিল্পেই, শিল্পই, স্বাধীনতা।
সকল শিল্পেরই মোক্ষ বোধ হয় প্রকৃতির যথাসম্ভব কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছুনো। কিন্তু শিল্পের তো বটেই, প্রকৃতিরও বাবদে জনগণের যে-ধারণা তা নেহাত মনগড়া, নেহাত অবৈজ্ঞানিক। ধ’রে নেওয়া হয় যে প্রকৃতি ‘সহজ’, ‘সরল’, ‘অবাধ’, আর শিল্পেরও ভিতরে এই-এই ‘গুণ’গুলির তালাশ করে আম আর গাব-জনতা। কিন্তু ঊনকবিদের তৈরি সানগ্লাসটা খুলে প্রকৃতির পানে তাকালে বোঝা যায় যে তিনি না-সহজ, না-সরল, না-অবাধ; তাঁর একটা ধূলিকণা আপতিক নয়, আকস্মিক নয়; সব প্রয়োজনীয়, সুপরিকল্পিত, সুবিন্যস্ত, এবং অতিজটিল এক মান্দালার, এক উচ্চতর গণিতের, এক মহত্তম ছন্দের অনুশাসনে ‘বাধিত’।
এহেন প্রকৃতি যার আদর্শ (আমি অ্যারিস্টটলের ‘ইমিটেশন’ তত্ত্বের প্রভাবে বলছি না এখানে, যদিও সেই তত্ত্ব যতটা নিন্দিত হয়েছে পরে, ততটা নিন্দনীয় আমার কাছে কখনও লাগে নি তাকে), তা সহজ, সরল আর অবাধ হয় কী ক’রে? সেরকম যা হ’তে পারে তার মোক্ষ তো প্রকৃতি নয়, কেয়স।
প্রকৃতি যেসকল অঙ্কের শাসনে চলে তারা আর-যা-হোক যদুবাবুর পাটীগণিত নয়, এবং তার মাঝে আমাদের চোখে নানা অসঙ্গতি ধরা যদিও পড়ে, তারা প্রকৃত অসঙ্গতি নয়, বরং এক বৃহত্তর, মহত্তর সঙ্গতির অংশ। পাশ্চাত্ত্য সঙ্গীতে হারমনি ব’লে একটা কথা আছে। নানা স্বরের, নানা ধরনের ধ্বনির এক পরিষাম্য সেটি; নানা গন্ধ-বর্ণ-রসের মিশ্রণে পাকানো এক অপূর্ব ব্যঞ্জন, তাতে আছে ঝাল, মিঠা, নোনতা, টক, তিতা, নানা স্বাদের এমন এক রসায়ন, রান্না-শেষে যা না-ঝাল না-মিষ্ট না-কষায়— এক সম্পূর্ণ অন্য স্বাদ, এক অভূতপূর্ব, অনির্বচনীয় কিছু,— সঙ্গীত! শিল্প। কেবলই মিঠা আওয়াজ, কেবলই য়ুফোনি, উত্তম সঙ্গীতের জন্ম দেয় না, তা হ’লে গায়কেরা মধ্যম আর পঞ্চম, এই দুই স্বরেই সব গান বাঁধতো। ভালো গানের জন্য গম্ভীর ষড়্জ আর তীক্ষ্ণ নিষাদেরও ততটাই দরকার, যতটা সুমিষ্ট পঞ্চমের।
কলের পুতুল চাবি দিলেই ঘোরে, প্রতিবারই একইরকমে ঘোরে, এবং অপোগণ্ড শিশুরও পক্ষে, বেধড়ক কষ্টকল্পনার অপব্যয় ছাড়া তাকে সপ্রাণ ব’লে মনে করতে পারাটা কঠিন। কিন্তু পুতুল-নাচের কলাকর অনেকগুলি সুতাকে মাথা, হৃদয় আর আঙুল দিয়ে চালিয়ে, একটা জড় পদার্থের ভিতর থেকে গল্প, ছন্দ, প্রাণ বের ক’রে আনে যখন, তাকে বলতে হয় শিল্পরচনা— সৃষ্টি।
শিল্পী-মাত্রই, অব নেসেসিটি, দক্ষ কারিগর। তবে তারা শুধুই কারিগর নয়। বা বলা যায়; কারিগরের যেখানে শেষ, শিল্পীর সেখানে শুরু। শিল্পী না-হ’য়েও কারিগর হওয়া যায়, কিন্তু কারিগর না-হ’য়ে শিল্পী হওয়া না-মুমকিন। শিল্পী যখন প্রচলন থেকে বেঁকে স’রে যায়, তাকে বলা যায় ত্বরণ বা অ্যাবারেশন, কারিগর সেরকম করলে তাকে বলতে হয় স্খলন বা ফল্ট।
শোনা যায়— কবিতা ছন্দের বাইরে বেরিয়ে যেতে চাইছে এখন (এখন কথাটাও খেয়াল করা দরকার, অথচ সেই অর্থে ছন্দের থেকে গদ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল য়ুরোপীয় কবিতা গতশতকের শুরুর দিকে প্রায়)। আমি বুঝতেই পারি না কথাটার মানে। যা কবিতা, ‘প্রাকৃতিকতা’র যা প্রয়াসী, ছন্দের বাইরে তো তার পক্ষে যাওয়া সম্ভবই নয়, গদ্যে লিখলেও নয়...
‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, চুনি উঠলো রাঙা হয়ে’, গদ্যে লেখা এই টুকরোটিতেও কি ছন্দ নাই (মনে রাখতে হবে, প্রাচীন ভারতীয় ছান্দসিকেরা গদ্যকেও ছন্দঃশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন)? না থাকতো যদি, কানে কি লাগতো না আমাদের, এমনকি ছন্দের সূত্রগুলি জানা না-থাকলেও? যেরকম, রাগবিদ্যা রপ্ত না-ক’রেও আমাদের কানে সুরের স্খলন ধরা প’ড়ে যায়? যায়, কেননা এ-ব্যাপারে সচেতন-অচেতন যা-ই থাকি, আমরাও প্রকৃতিরই অংশ, এবং প্রকৃতির আত্মার ভিতরকার ছন্দ আর সামঞ্জস্যের বোধ আমরাও ধারণ করি আত্মায়। আবার, যে-বস্তু কবিতা হ’য়ে উঠলো না, তা বিশুদ্ধ মাত্রাবৃত্তে লেখা হ’লেও ছন্দোভ্রষ্ট... মানে কীনা পাটীগণিতের হিসাবে টায়-টায় মাত্রা-পর্বে কথাগুলি সাজানো হ’লেও, কথা যে-ছন্দের প্রত্যাশা করছিলো বা ছন্দ যে-কথার, তার কোনোটিরই পূরণ হয় নি সেখানে। ছন্দের সূত্রগুলি ছন্দের ভিতরকার কঙ্কাল-মাত্র— কেবলই কঙ্কালকে তো মানুষ বলে না। তবে, অবশ্য, কঙ্কালকে অস্বীকার করাও, অ্যানেলিডা বর্গের প্রাণীদেরই পক্ষে শুধু নিরাপদ।
ছন্দ তবলার বোল ততটা নয়, যতটা তানপুরার লয়। আবার তানপুরার লয়ও ততটা নয়, যতটা সুগায়কের রক্তস্রোতের বেগ... যা তবলা বা তানপুরার দ্বারা বাধিত নয়, বরং তবলা আর তানপুরার নিয়ন্তা। ছন্দ ছাড়া হাঁটা যায় না, কোনো রাস্তাতেই না। বড় ওস্তাদেরা লয়কারি করেন, লয় আর তাল নিয়ে খুনসুটি করেন; বড় কবিরাও হামেশা ছন্দ নিয়ে খেলেন, নানা গিটকিরির পরে সম-এ এসে ভেড়েন (বা ইচ্ছা ক’রে কখনও বা ভেড়েন না)। এইসবই সৃষ্টিশীল কাজ, কবিকর্ম। যে শুধুই কারিগর, বা নবিশ, বা ঊনকবি, তার এসবে অধিকার নাই। এসব তার পক্ষে আত্মহত্যার নামান্তর।
ছন্দ সৃষ্টিবাধক নয়, সৃষ্টিসাধক, এবং এমনকি সৃষ্টির অংশ। একই ছয়-মাত্রায় লেখা ‘ঐখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে’ আর ‘ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে’-তে কি আদতে একই ছন্দ? একই ছয়-মাত্রার ছন্দ দু’ভাবে কি সৃষ্ট হয় নি এই দু’টি কবিতায়?
প্রথমে পাথরের মূর্তি গড়তে হয় প্রচুর যত্নে, স্ট্রিক্টলি বাই দ্য বুক। মূর্তি-গড়া একটা গুরুমুখী, কট্টর নিয়মানুবর্তী বিদ্যা। এ-বিদ্যা পুঙ্খানুপুঙ্খ রপ্ত করবার পরই ত্রুটিহীন মূর্তি তৈরি হয়। সেই মূর্তি সুন্দর। কিন্তু তখনও সে পাথরই কেবল। এর পরে শুরু হয় শিল্পীর কাজ। মূর্তির শিরায় রক্ত সঞ্চালন, মূর্তিতে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা... তাই করতে গিয়ে শিল্পী, স্রষ্টা, মূর্তি-নির্মাণ-পর্যায়ে অনুসৃত কিছু বিধিনিষেধের ব্যত্যয় ঘটিয়ে দিতে পারেন। মূর্তিতে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করতে, তাকে শিল্পবস্তুতে রূপান্তরিত করতে, যা দরকার মনে হয় তাঁর, তিনি তা-ই করেন, মায় দু’একটা খুনখারাপি পর্যন্ত। ঈশ্বরকে, স্রষ্টাকে, নির্মম হ’তে হামেশা হয়। কিন্তু যে শিল্পী হ’য়ে ওঠে নি, এমনকি উত্তম কারিগরও যে নয়, সে যখন মূর্তি গড়ার নিয়মগুলি ভাঙে বা উপেক্ষা করে (বা সেগুলি না-জেনেই মূর্তি গড়ায় উদ্যত হয়), তখন কিছুই গড়া হয় না আর, ভাঙা-ই হয় কেবল। পয়দা হয় শিল্পের ধ্বংসস্তূপ, কেয়স।
কিন্তু কারিগরির দীক্ষা, তৎপরবর্তী শিক্ষা, তারপর স্নাতকত্ব, এসব আমার হয়েছে কীনা বুঝব কেমন ক’রে? কে ব’লে দেবে আমাকে?
আমার মুখ থেকে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল; কেন, আমি নিজে? আমারই মন আমাকে ব’লে দেবে আমি শিল্পী কীনা। উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু হায়, মন-মহাশয় বড্ড বেশি সদাশয়। কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের মন জুগিয়ে চলতে ভালোবাসেন। আমাদের একটা দুধ-দাঁত উঠলেই বাঘের বাচ্চা বানিয়ে বসেন তিনি আমাদের। কাজেই সত্য বুঝতে হ’লে এই মন-বাবুকে ঘর থেকে বের ক’রেই দিতে হবে বরং। আবার মাথাকে জিজ্ঞেস করাটাই বা কী ক’রে সম্ভব। মানে এমন বলা; হে মাথা, তুমি কতটা পেকেছো?
গায়কদের, মুচিদের, থাকে ওস্তাদ; ডাক্তারদের, এঞ্জিনিয়ারদের, অ্যাকাডেমি; যারা শিক্ষার্থীদের ব’লে দেয়, এখানকার পড়ালেখা শেষ হয়েছে তোমার, এবার যাও চ’রে খাও। হায়, কবি-হবুকবিদের এমন কেউ নাই... ফলে, এতো বিতিকিচ্ছিরি লঙ্কাকাণ্ড, এতো মুই-কী-হনু-রে দিকে-দিগন্তরে। আজকাল এমনকি মুই-কী-হনু-রে বলাটাই কবিত্বের (একমাত্র) লক্ষণ হ’য়ে দাঁড়িয়েছে। ঐ লোক কবি? ওর দাড়ি আছে? পাঞ্জাবি পরে? বারফট্টাই করে? কথায়-কথায় অন্য কবিদের গালি দেয়? আজকে শেক্সপিয়র কালকে রবীন্দ্রনাথের নিকুচি করে? হাইডেগার ঢেঁকুর, লাকাঁ হাই তোলে? বড় কাগজের আপিসে, চাকরি না-ক’রেও দিনরাত ব’সে থাকে? না?— তাইলে এ-হালায় কবিই না।
চড়ুই পাখির ধরনে লিখছি। যখন যা মনে পড়ছে টুকে ফেলছি টুক ক’রে। এখন মনে পড়ল গ্রীক নাটকের কথা। না, গ্রীক নাটকের সাহিত্য— বা কাব্য-মূল্য বা নাট্য-মূল্যও না। মনে পড়ল গ্রীক নাটকের ‘অনুষ্ঠানের’ কথা। স্টেডিয়ামের মতো বিশাল অ্যাম্ফিথিয়েটার, দর্শকদের পক্ষে নাটকের পাত্রপাত্রীদেরকে ভালোমতো দেখবার উপায় নাই; আর নাই ব’লেই, নিজেদেরকে দেখাবার জন্য অনেকটা, আর কিছুটা নাট্য-পূর্ববর্তী ব্যাকাস বা ফন-এর সম্মানে কোরাল নাচ-গানের ধারাবাহিকতায়, কুশীলবরা বিশাল-সব মুখোশ প’রে আছে, আর অতবড় নাট্যাঙ্গনের অডিয়েন্সকে শোনাবার জন্য, মাইকহীন সেই জমানায়, আক্ষরিক অর্থেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে— অর্থাৎ ‘অভিনয়’ দেখাবার, বা এমনকি শোনাবার, কোনো উপায়ই নাই। পরন্তু নতুন কাহিনির মজা দেবারও পথ খোলা নাই কোনো, অন্তত ট্র্যাজেডিতে। কাহিনীর সবই, হয় হোমার বা হেসিয়ডের কাব্য, নয় তো অতিপরিচিত গ্রীক উপকথা থেকে আহৃত। কী দেখতে যেত তবে অত হাজার-হাজার দর্শক? তা-ও আবার বারে-বারে?
তুলনায়— আমাদের গ্রামাঞ্চলে রাতভোর পুথিপাঠ যে হ’ত, তারও কাহিনী থাকতো শ্রোতাদের নখদর্পণে, আর বার-বার শুনবার ফলে পুথিটাও তাদের অনেকেরই একেবারে মুখস্থ হ’য়ে যেত— এতটাই, যে খোদ ‘পাঠক’ একটা লাইন ছাড় দিয়ে গেলে কেউ-না-কেউ তা ধরিয়ে দিতই। পুথিপাঠ আমি শুনেছি। একটা নির্দিষ্ট ‘সুরে’ পাছায়-ঝিঁঝি-ধরানো একঘেয়ে ভঙ্গিতে, প্রায় কোনোরকমের ভয়েস মড্যুলেশন ছাড়া আবৃত্তি— সারারাত! অথচ তার শ্রোতারা, ঘুমিয়ে পড়া দূরে থাক, কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে, হেসে খুন হচ্ছে (এমনও কখনও হ’ত যে গল্পের একটা ট্র্যাজিক জায়গায়, যেখানে সকলের ‘কাঁদবার কথা’, তার কথা ভেবে কিছু আগেই কেঁদে বসলো একজন, যখন হয়তো চাঁদ বেনে হেঁতালের বাড়ি নিয়ে মনসাকে তাড়া করেছে এবং সকলে হেসে গড়াগড়ি দিতে গিয়ে ‘এ কি! কান্দে কেডা!’)। কিমাশ্চর্যমতঃপরম্!
তো গ্রীক নাটকের দর্শকেরা আর আমাদের গাঁয়ের ‘মনসার ভাসান’ শুনতে যাওয়া দর্শক-শ্রোতারা ‘কী’ দেখতে/শুনতে যেত, বার-বার-বার-বার?
আমার অনুমান এই; তারা বিশেষ কিছুই দেখতে বা শুনতে যেত না; বরং, এমন এক ‘আনুষ্ঠানিকতার’ ভিতরে নিজেদের নিয়ে যেত, যেখানে তাদের ভিতরে তালাআঁটা গোপন বারান্দাগুলির দরোজা খুলে দেওয়াটা বেআইনি নয়। তারা যেত নিজেদের ‘মুক্তি’ দিতে, কিছুকালের জন্য, কিছুকালের জন্য ভেদবুদ্ধির দ্বারা চালিত না-হ’য়ে কল্পনার দ্বারা চালিত হ’তে। কিছুকালের জন্য... কবি হ’তে (অ্যারিস্টটল ঠিক একেই ‘ক্যাথার্সিস’ যদিও বলেন নি, তবু শব্দটার পুনঃস্মরণ না-ক’রে পারছি না)। কবি কবিতার জন্ম দেয়, নাকি কবিতা কবির? নাকি কবিই কবির জন্ম দেয়, এবং এই প্রজননক্রিয়ার নাম কবিতা? ভাবা যাক।
এবং, ‘অনুষ্ঠান’ ব্যাপারটাকে আমরা না-ভুলি যাতে কখনও। যথাযথ অনুষ্ঠানের বাইরে কাব্যদেবীর অধিষ্ঠান ঘটে না (বা কবিতার ভূত ভর করে না)। একই পদ্য এই অনুষ্ঠানের বাইরে অর্থহীন শব্দদঙ্গল, আর ভিতরে, মানুষের মহত্তম উচ্চারণ। শুধু কবিতার ভিতর দিয়ে, শিল্পের ভিতর দিয়েই মানুষ ঈশিতা অর্জনে সক্ষম; আর, কবিতার হ’য়ে ওঠবার জন্য যজ্ঞানুষ্ঠানের বিকল্প নাই; আরতি, হোম, বলি, তর্পণ— কবি হ’য়ে উঠবে যে, ওঠাবে যে, তারই নিজের ভিতর, নিজেকে।
কবিতা, অতএব, আপামর জনতার হাতে, হাটেবাজারে পয়দা হবার জিনিস নয়। ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। আবার সেই কেউ-কেউ-ও সকল সময়ে কবি নয়, কোনো-কোনো মাহেন্দ্র মুহূর্তেই শুধু কবি।
বাংলাদেশ সময় : ১৬০০ ঘণ্টা, ১০ অক্টোবর, ২০১২
সম্পাদনা : তানিম কবির, tanimkabir@gmail.com