ঢাকা: ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় দেশব্যাপী সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত বিএনপি-জামায়াতের ১৮ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এক সপ্তাহের মধ্যে ১৮টি মামলা করবে সরকার।
মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য দেন। তবে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে শীর্ষ নেতা পর্যায়ের কারোর নাম বলতে চাননি মন্ত্রী। ‘‘যথাসময়ে নাম জানতে পারবেন’’ বলে জানান তিনি।
সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তা খালাফ আল আলী হত্যাকাণ্ডের বিচারের অগ্রগতির বিষয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবু আব্দুল্লাহ নাসের আল বুশাইরির সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি কর্মকর্তা খালাফ হত্যাকাণ্ডের মামলার অগ্রগতি সম্পর্কেও জানান। কক্সবাজারের রামুর ঘটনার বিচার দ্রুত বিচার আইনে করা হবে বলেও এ সময় জানান তিনি।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে মহীউদ্দিন খান আলমগীর আরো বলেন, “যারা এর প্রবর্তন করেছিলো তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা উচ্চ পর্যায়ের কারা রয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “মন্ত্রী, সাংসদ যেই হোক আসামিকে আমরা আসামি হিসেবেই দেখবো।”
``সাম্প্রদায়িকতা যারা ছড়িয়েছে সেই পশুশক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিকল্প নেই`` বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
কক্সবাজরের রামুতে সন্ত্রাসের ঘটনায় ২০০১ সালের সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আরো বলেন, “বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ওই সময় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করেছে।’’
উল্লেখ্য, ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনায় বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ২৫ জন মন্ত্রী, সাংসদসহ মোট ২৬ হাজার ৩৫২ জনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে গঠিত জুডিশিয়াল তদন্ত কমিশন।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনের ওই তালিকায় প্রকাশিত অভিযুক্ত মন্ত্রী ও সাংসদদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহম্মেদ, সাবেক তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলাম, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াতের নেতা মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা আবদুস সোবহান, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সাবেক সাংসদ শহীদুল হক জামাল, ওয়াদুদ ভূঁইয়া, নাদিম মোস্তফা, জামায়াতের নেতা আবব্দুল্লাহ মো. আবু তাহের, সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন, বাগেরহাটের সাবেক সংসদ সদস্য এইচ এম সেলিম, ঝিনাইদহের সাবেক সংসদ সদস্য শহীদুল ইসলাম, ইলিয়াস আলী, হাফিজ ইব্রাহীম, সালাউদ্দিন আহমেদ, আলমগীর হায়দার, সালেক চৌধুরী, জহির উদ্দিন মো. স্বপন, সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক মন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু ও নাটোরের বিএনপি নেতা একরামুল কবির।
খালাফ হত্যা মামলায় অগ্রগতি হয়েছে
সৌদি রাষ্ট্রদূত অফিসের কর্মকর্তা খালাফ আল আলী হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “মামলায় ৫ জনকে আসামি করে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪ জন সরকারের হেফাজতে রয়েছেন। একজন পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামি আত্মসমর্পণ না করলে পলাতক হিসেবেই বিচার পরিচালনা করা হবে।”
মহীউদ্দিন খান আলমগীর বলেন, “সৌদি দূতাবাসও মামলাটি পর্যালোচনা করবে।”
তিনি সৌদি দূতাবাসের কর্মচারী খালাফ হত্যাকাণ্ডের বিচারের অগ্রগতির বিষয়ে রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করেছেন বলেও জানান মন্ত্রী।
সৌদি সরকারকে দু’টি প্রকল্পে বাংলাদেশ সহায়তা করতে চায় উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর আরো বলেন, সৌদির ঘরে ঘরে ডাক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রেল সম্প্রসারণেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়।
মহীউদ্দীন বলেন, সৌদি সরকারের সে দেশে দু’টি প্রকল্প রয়েছে, এ দু’টি প্রকল্পে সহায়তা দেবে বাংলাদেশ। একটি হলো, সৌদির ঘরে ঘরে ডাক সার্ভিস সুবিধা দেওয়া এবং অপরটি সৌদির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রেললাইন স্থাপন।”
তিনি বলেন, “রেলওয়ের সম্প্রসারণে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ প্রকৌশলী ও জনবল সরবরাহ করা হবে।”
রামুর ঘটনার বিচার দ্রুত বিচার আইনে
রামুর ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তদন্ত সফল না হলে তখন বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রয়োজন হয়। এই মুহূর্তে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রয়োজন নেই।”
স্থানীয় প্রশাসন নির্লিপ্ত ছিলো এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “এটি সত্যি নয়, এজন্য যে, যে কোনো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতিটি ঘরে ঘরে পুলিশ পৌঁছে দেওয়া কাম্য নয়। আমরা রাখতেও চাই না। কারণ, এটি পুলিশি রাষ্ট্র নয়।”
রামুর ঘটনা সংঘবদ্ধ মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা ঘটিয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৬৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর সঙ্গে আরো যোগ হবে ৮৮ জন, মোট ২৪৫ জন। এ ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলো দ্রুত বিচার আইনের আওতায় নেওয়া হবে।”
সোনাইমুড়িতে তিনটি উপাসনালয়েও সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা হামলার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছিলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সেখানেও বেশ কিছু সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা হয়েছে।”
বৌদ্ধবিহারে হামলার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, “১১টি উপাসনালয়, ২২টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৫৩টি মূর্তি খোয়া গেছে। এগুলো সংস্কার ও পুনর্নিমাণে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।”
রামু ও কক্সবাজারের ঘটনার সঙ্গে বিএনপির ২০০১ সালের ঘটনার সঙ্গে রেশ টানার বিষয়টিকে অসত্য ও মিথ্যার বেসাতি বলে মন্তব্য করেছেন মন্ত্রী।
বাংলাদেশ সময়: ১২২৫ ঘণ্টা, অক্টোবর ০২, ২০১২
এসএমএ/ সম্পাদনা: অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর; জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর jewel_mazhar@yahoo.com