৬ আষাঢ় ১৪২০, বৃহস্পতিবার জুন ২০, ২০১৩ ৯:৫৯ এএম BDST banglanew24
08 Jun 2012   04:07:33 PM   Friday BdST
E-mail this

তৃণমূলের বাজেট ভাবনা : ‘আমগো কি?’


মাজেদুল নয়ন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
তৃণমূলের বাজেট ভাবনা : ‘আমগো কি?’

ঢাকা : ‘বাজেট দিয়া আমাগো কি অইব? কোন বাজেটে জিনিসের দাম কমছে কইতে পারেন? চাল, ডাল, নুনের দাম কি আর বাজেট দিয়া বোঝা যায়?’ রাজধানীর শাহবাগের রিকশাচালক শামসুলের কাছে জানতে চাইলে এটাই ছিল তার বাজেট প্রতিক্রিয়া।

৪৫ বছর বয়সী শামসুলের বাড়ি সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায়। ৩ মেয়ে আর ২ ছেলের বাবা শামসুল গত ১২ বছর ধরেই ঢাকায় রিকশা চালান। আলোচনায় যোগ দেওয়া আরেকজন রিকশাচালক কাদেরের বাড়ি জামালপুর। তিনি ঢাকায় রিকশা চালান গত ৮ বছর ধরে। এই দুই রিকশাওয়ালার কেউই জানেন না, বৃহস্পতিবার সরকারের অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরের জন্যে বাজেট ঘোষণা হয়েছে।

শামসুল ও কাদেরের মতো গরিব রিকশাচালকদের জীবনে বাজেটের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা বৃথা হলো একটি প্রশ্নে। যখন বললেন, ‘আমগো কি?’।

শামসুল জানালেন, ৭/৮ বছর আগেও বাজেট নিয়ে ভাবনা ছিল তার। বাজেটের পুরো বক্তব্য রেডিওতে শুনতেন। শুধু তিনি না, গ্রামের অনেকেই বাজেট শুনতেন। আবার গ্রামের দোকানগুলোতেও টিভিতে বাজেট বক্তব্য শুনতেন গ্রামের মুরুব্বি ও শিক্ষিতরা। কিন্তু এখন আর আগ্রহ নাই শামসুলের।

কাদের জানালেন বিস্তারিত, ‘বাজেট দিয়া কি হইবো কন? এইসব বাজেটের উপরে কি আর চাইল, ডাইল, নুন, তেলের দাম ঠিক থাহে? সারা বছরইতো এইসব জিনিসের দাম বাড়ে। আবার মাইঝে মইধ্যে কমে। সারা বছরতো আর বাজেট ঘোষণা হয় না।’

আর তাই বাজেট নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নাই এ দুই রিকশাচালকের। দুজনের কথা থেকে এটা স্পষ্ট, বাজেটের আগে-পরে যে সব জিনিসের দাম বাড়ে বা কমে, সেসব দ্রব্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই তাদের।

বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত বাজেটে ভিক্ষুক পুনর্বাসনে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। হতদরিদ্র এসব মানুষের পুনর্বাসনে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। রাজধানীর ১০ হাজার ভিক্ষুকের ওপর জরিপ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগ, কাওরানবাজার ও গুলশান এলাকায় ৬ জন ভিক্ষুকের সঙ্গে কথা বলে কোনো ধরনের জরিপের কথা জানা যায়নি। তাদের পুনর্বাসনের জন্যে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টি জিজ্ঞাসা করার সাহসই হয়নি। কারণ, বাজেট শব্দটির সঙ্গে তাদের দু’একজন পরিচিত হলেও এর বাইরে কোনো কিছুই জানেন না তারা।

কাওরানবাজার মোড়ে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করেন পঞ্চাশোর্ধ রহমান মিয়া। একটি পা পোলিওতে আক্রান্ত হওয়ায় এবং শারীরিক আরো অসুস্থতা তাকে নিয়ে এসেছে ভিক্ষাবৃত্তিতে। রাতে কাওরানবাজার ফুটপাতেই স্ত্রী হাজেরা খাতুনসহ থাকেন তিনি।

‘বাজেট’ শব্দটি উচ্চারণ করতেই জানান, এটি কি এবং কেন, সেটি সর্ম্পকে তার কোনো ধারণা নেই।

একই এলাকায় ভিক্ষারত ১০ বছরের শিশু শরিফ অবশ্য বাজেট শব্দটি বৃহস্পতিবারই শুনেছে। সকালে বাসে হকাররা পত্রিকা বিক্রি করতে উঠলে ‘বাজেট’ শব্দটি বারবার উচ্চারণ করায় তার কানে আসে।

শুধুমাত্র এ ধরনের হতদরিদ্র লোক নন। বাজেট নিয়ে অজ্ঞতা রয়েছে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্তদেরও।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ফলের দোকানদার ৪০ বছরের আবুল হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, ‘এসব বাজেট দিয়া কি হইব। বাজেট আসলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। আমি কোনো দিন শুনি নাই বাজেটের পর কোনো জিনিসের দাম কমছে।’

সিএনজি অটোরিকশাচালক মোবারক বলেন, ‘বাজেট হইলে সরকার কইবো, উন্নয়নের বাজেট আর বিরোধী দল কইবো গরিব মারার বাজেট।’ পঞ্চাশোর্ধ রসিক এ চালক আরো বলেন, ‘ভাই কোনো বাজেটে আমার যেমন উন্নয়ন হয় নাই, আবার মইরাও যাই নাই। এগুলো হইলো ফাও জিনিস।’

ঢাকার বাইরের চিত্রও একই ধরনের। শিক্ষিত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী ছাড়া বাজেটের খবর রাখেন না কেউ।

লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক মো. আলী ফোনে বাংলানিউজকে জানান, ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

সিগারেটের দাম, গাড়ির দাম, পোশাকের দাম যে বাড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, সেটাও তিনি জানেন।

তবে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত এ বাজেট লক্ষীপুরের রামগঞ্জের কি কাজে আসবে সে ব্যপারে তার কোনো ধারণা নাই। গ্রামের মানুষের বাজেট নিয়ে তেমন কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই বলেও জানান মো. আলী।

তৃনমূলের মানুষের বাজেট নিয়ে এ ধরনের অনীহা সর্ম্পকে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ বলেন, সাধারণ মানুষের মাঝে বাজেট নিয়ে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একটি হচ্ছে, বাজেট সর্ম্পকে তাদের ধারণা শূন্য। তারা অনেকেই বাজেট শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন। আর বাজেটে নাগরিকের অধিকারের সর্ম্পকটিও অজানা।

আরেকটি প্রতিক্রিয়া হলো, মানুষ বাজেট নিয়ে আতঙ্কে থাকেন। তাদের ধারণা, বাজেট এলেই জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। এই হলো সাধারণ মানুষের বাজেট ভাবনা।

অধ্যাপক আকাশ বলেন, শুধু নির্দিষ্ট একটি শ্রেণী রয়েছেন, যারা বাজেট নিয়ে ভাবতে পারেন। অনুন্নয়ন বাজেট, উন্নয়ন বাজেট, ব্যবহার এসব নিয়ে মাথা ঘামান তারা।

সাধারণ মানুষের মাঝে বাজেট সর্ম্পকে অনীহার কারণ হিসেবে ‘টপ টু ডাউন’ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন এম এম আকাশ। তিনি বলেন, তৃণমূল থেকে যদি রাজনীতি পরিচালিত হতো, তবে সমস্যা হতো না। তৃণমূল থেকে যদি উন্নয়ন বাজেট হয়, তবে মানুষ যেমন সচেতন হন, তেমনি জবাবদিহিতা থাকে।

তিনি বলেন, ‘আমরা অনেকদিন ধরেই তৃনমূলের বাজেটের দাবি জানিয়ে আসছি। যদি উপজেলার একটি লোক জানতে পারেন, তার উপজেলার কোন খাতে কত বরাদ্দ, তবে তিনি বাজেটের ব্যাপারে সচেতন হবেন। বিশ্বের অনেক দেশে তৃনমূলের বাজেট করা হয়।

উদাহরণ হিসেবে তিনি পশ্চিমবঙ্গের কথা বলেন। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েতকে ৩০ শতাংশ খরচের দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়। গ্রামের মানুষের সুবিধা এবং অগ্রাধিকারের কথা বিবেচনা করে এবং কেন্দ্র থেকে পাওয়া ৩০ শতাংশের সঙ্গে হিসেব করে তারা অর্থ খরচ করেন। এক্ষেত্রে গ্রামবাসী জানতে পারেন, তার এলাকায় সরকার একটি সেতু নির্মাণে কত বরাদ্দ দিয়েছে। তখন জনপ্রতিনিধিকেও জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হয়।

বাংলাদেশ সময় : ১৬০৩ ঘণ্টা, জুন ০৮, ২০১২
এমএন/ সম্পাদনা : অশোকেশ রায়, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
banglanews24 All Apps
RehabHousing.com

অর্থনীতি

8877
IIMEJ
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান