 |
| ছবি: সোহেল সরওয়ার/ বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম |
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহর এলাকায় ‘উডল্যান্ড পার্ক’ নামে একটি অভিজাত কমিউনিটি সেন্টারসহ বিরোধপূর্ণ প্রায় ২৭ কাঠা সরকারি জায়গা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে (বিএডিসি) বুঝিয়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।
শনিবার দুপুরে প্রায় তিন ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে জায়গাটি নিজেদের দখলে নেয় জেলা প্রশাসন। এ সময় সেখানে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হলে এক পর্যায়ে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ ও ধাওয়া দিতে বাধ্য হয়। কমিউনিটি সেন্টার দখল নিয়ে বিপাকে পড়ে যান রাতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজকরাও।
তবে উদ্ধার অভিযানে আসা জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কর্মকর্তা, পুলিশ কেউই কোন ধরনের আইনি নোটিশ সংশ্লিষ্টদের দেখাতে পারেননি। এ নিয়ে প্রশাসনের লোকজনের সঙ্গে কমিউনিটি সেন্টারের মালিকপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। এসময় মালিকপক্ষের কয়েকজন যুবক উচ্ছৃঙ্খল আচরণও করেছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরিফ আবদুল্লাহ বাংলানিউজকে বলেন, ‘আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশে কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের জায়গা তাদের বুঝিয়ে দিতে এসেছি। এ সংক্রান্ত লিগ্যাল নোটিশ কিংবা অন্যান্য কাগজপত্র কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে আছে। আমার কাছে শুধু জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নির্দেশের কপি আছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালের ১৭ এপ্রিল ষোলশহরে কর্ণফুলী গ্যাস সিস্টেমস লিমিটেডের পাশে দু’টি আলাদা স্থাপনাসহ ২৬ দশমিক ৮৩ কাঠা (১৯ হাজার ৩২০ বর্গফুট) জায়গা কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছ থেকে ভাড়ায় নেন মো. মুছা ও মো. হারুন নামে দু’ব্যবসায়ী।
এজন্য প্রাথমিকভাবে জামানত নেওয়া হয় সাড়ে ৯ লক্ষ টাকা। আর মাসিক এক লক্ষ ৯২ হাজার টাকা ভাড়ায় কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন তাদের এ জমি অস্থায়ীভাবে বুঝিয়ে দেয়। এরপর প্রতি দু’বছর পরপর চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে এ জমি ব্যবহার করে আসছিলেন মুছা ও হারুন।
এর মধ্যে ২০০৯ সালে কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে আবারও দু’বছরের জন্য সময় বাড়ানোর আবেদন করা হলে তা নাকচ হয়। মালিকপক্ষ এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফ আলী খান বাংলানিউজকে বলেন, ‘হাইকোর্টে তাদের রিট খারিজ হবার পরও তারা জায়গাটি অবৈধভাবে দখলে রেখেছিল। আমরা তাদের কয়েকবার নোটিশ দিয়েছি, মাইকিং করেছি। তারা গতকাল (শুক্রবার) সন্ধ্যায় আমাদের একজন লোক এখানে মাইকিং করতে এলে তাকে পিটিয়ে বেঁধে রাখে। এরপর আমরা জায়গাটি দখলে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।’
তবে এসময় সাংবাদিকরা তার কাছে হাইকোর্টের রিটের কপি ও নোটিশের কপি দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন।
উডল্যান্ড পার্ক কমিউনিটি সেন্টারের পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘হাইকোর্টে আমাদের রিট এখনও চলমান আছে। তারা আমাদের কোন উচ্ছেদের নোটিশও দেয়নি। গায়ের জোরে আর উপরের নির্দেশের কথা বলে তারা আমাদের বের করে দিচ্ছেন। আমরা এখানে সাড়ে ৩ কোটি টাকা খরচ করে আধুনিক কমিউনিটি সেন্টার বানিয়েছি। তারা সব দখলে নিয়েছেন।’
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, দুপুর ১২টার দিকে ম্যাজিস্ট্রেট আরিফ আবদুল্লাহ’র নেতৃত্বে কয়েক প্লাটুন পুলিশ ও কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জায়গাটি দখল নিতে আসেন। কমিউনিটি সেন্টারে ঢোকার পর চসিকের মোহরা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ আজম, পরিচালক মো. সালাউদ্দিনসহ আরও কয়েকজন যুবক ও মধ্যবয়সী লোক তাদের সঙ্গে বাকবিত-ায় জড়িয়ে পড়েন।
তারা অভিযোগ করেন, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী তাদের কাছে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ চেয়েছেন। ঘুষ না দেওয়ায় উচ্ছেদ করতে এসেছেন। এসময় তারা চিৎকার, চেঁচামেচি করে প্রধান প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিত করারও চেষ্টা করেন।
একইভাবে রাতে ওই কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজনকারী ব্যবসায়ী সাহাবউদ্দিন চৌধুরীও ঘটনাস্থলে আসেন। তিনি ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার অনুরোধ জানান।
এ নিয়ে বাকবিত-ার এক পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ মাইকিং করে কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে সবাইকে বের করে দেয়। এসময় মালিকপক্ষের কয়েকজন লোক উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে চাইলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয় ও মৃদু লাঠিচার্জ করে।
এসময় কমিউনিটি সেন্টারে আসেন চসিকের আলোচিত-সমালোচিত নারী কাউন্সিলর ফেরদৌস বেগম মুন্নী। তিনি এসেই ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের উপর চড়াও হন। তিনি কার নির্দেশে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে তার কৈফিয়ত তলব করেন।
ফেরদৌস বেগম মুন্নী বাংলানিউজকে বলেন, ‘সোমবার আমার আপন ভাইয়ের বিয়ে। আমরা এ কমিউনিটি সেন্টারটি ভাড়া করেছি। এখন উচ্ছেদ হলে তো আমরা বিপদে পড়ে যাব। সেজন্য শুনে এখানে এসেছি।’
তবে শেষ পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেট সব বাধা উপেক্ষা করে কমিউনিটি সেন্টারসহ সব স্থাপনায় তালা মেরে তা কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে মালিকপক্ষের লোকজনকেও সেখান থেকে বের করে দিয়েছে।
পাঁচলাইশ থানার ওসি মো.আলমগীর হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, ‘কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা সেটি আমাদের বিষয় নই। আমরা জেলা প্রশাসনের নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয় সেজন্য ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে জায়গাটির দখল কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশ সময় : ১৭২৫ ঘণ্টা, মে ২৬, ২০১২
সম্পাদনা: জাকারিয়া মন্ডল, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর