৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, বৃহস্পতিবার মে ২৩, ২০১৩ ১২:৩৬ পিএম BDST banglanew24
17 Aug 2012   03:12:32 PM   Friday BdST
E-mail this

আফগানিস্তানের ডায়েরি


শারমিন সুলতানা
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আফগানিস্তানের ডায়েরি

বাবাকে ওরা বন্দুকের কাঠের অংশটা দিয়ে একটা অঘাত করতেই তিনি চুপ। মাকে নিয়ে আমি দৌড়াচ্ছি। দৌড় দৌড়… কিন্তু গুলির চেয়ে দ্রুত যে দৌড়াবো তাতেও তো ধর্মের নিষেধাজ্ঞা ছিল যা ছোটবেলা থেকেই পালন করতে বাধ্য; ধরা পড়ি এবং রাতভর লালসার ইনসাফের পর চোখে আর এক ফোঁটা কান্নাও ছিল না যে- টলিয়ে টলিয়ে হাঁটতে না পেরে তৃষ্ণার্ত পান করবো জল। সব কিছু কেমন গুলিয়ে আসছে। ঘৃণা করার মতোন অনুভূতিগুলোও টলছে। ফারহ থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ডির গ্রামের এক দর্জির ঘরের মেঝেতে পাতা বিছানায় যখন আমি চোখ খুলি প্রায় অন্ধকার ঘরটিকে আমার আফগানিস্তানের মতোই কবরখানা মনে হয়েছে...

গতকাল পর্যন্ত সব ঠিক-ঠাক ছিল। শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার কারণে মাকে ঠিক কোথায় হারিয়েছি মনে আসেনি। পরিবার ব্যাপারটাই মাথার ভেতর কাজ করেনি। দর্জির কোন ছেলে-মেয়ে নেই। সে একাই আজ তের বছর যাবৎ এখানে। যখন ফারহ প্রদেশেও নিষ্ঠুর ঘটনাবহুল দিনগুলোর শুরু হচ্ছে তখন থেকেই ময়মানা থেকে একটা খুনের ঘটনায় জড়িত হয়ে পালিয়ে এসেছে এখানে। একটা রুটি ও শুকনো কয়েক টুকরা মাংস থালায় রাখা। যতোই বোধের কাছে ফিরছি ততোই যেন হাহাকার আর যন্ত্রণাগুলো তেড়ে আসছে। কামড়ে ধরছে। নাহ, আর পারছি না, কয়েকবার চিৎকার করে উঠতেই, দর্জি এসে জানালো এলাকা আজ যুদ্ধের সম্ভাবনায় প্রস্তুত। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে চলে যেতে হবে। একটা বোরখা আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, খাওয়াটা যেন শেষ করে নেই। লোকটা খুবই নির্লিপ্ত। চোখগুলোর মধ্যে একটা অনুভূতিরও ছাপ কোথাও নেই। একবারের জন্য কিছুই জানতে চায়নি। শুধু বলল, ‘এখানে তোমার যন্ত্রণাগুলোর মতই অনেক ব্যাথা লুকিয়ে আছে। তাদের সঙ্গী হয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারো।’ এমনভাবে কথা শুনার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে আমার চোখ তাকাচ্ছে আর বিস্মিত হচ্ছে। এ যেন এক অন্য পৃথিবী- যেখানে আমি যে আমার সামনের মানুষগুলোর মতই একটা মানুষ তা প্রতিনিয়ত মনে রাখা হয়। ছেলেবেলা থেকে যে সব কথা শুনে আসছি সব যেন এক একটি আয়াৎ। শোনা এবং পালন করাই একমাত্র বাধ্যবাধকতা। যতো বারই এর বাইরে কিছু করার চেষ্টা করেছি সামাজিক মূল্যবোধের ধারক আমার পরিবারের পুরুষেরা নির্মমভাবে আঘাতের দাগগুলো শরীরে টাঙিয়ে দিয়ে জানিয়েছে কখনো যেন এটা ভুলে না যাই আমি একটা মুসলিম মেয়ে। মানুষ নই! কিন্তু, কোথায় যাব...

দর্জি প্রায় উড়ে এসে দরজায় লুটিয়ে পড়ল। রেকাবে মুখ বাঁধা কয়েকজনের একটা দল লাফিয়ে ঘরে ঢুকল। প্রত্যেকের হাতেই অস্ত্র এবং আমার দিকে চোখ পড়তেই গুলি ছুঁড়ল একজন। ব্যাথায় কাতর কয়েকবার উঠতে চেষ্টা করে ব্যর্থ, অবিরাম গুলির শব্দের মধ্যে একটু একটু করে হারিয়ে ফেললাম বাবার মৃত্যু, মায়ের হারিয়ে যাওয়া বিস্ময়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় এবং দর্জির মাথা গড়িয়ে রক্তাক্ত মেঝের স্মৃতি... (ফারহ, ২০০৯)

তরমুজের লতাগুলো দারুণ পুষ্ট। এ বার ফলন ভালোই হচ্ছে। সেচেরও তেমন সংকট হয়নি। হারিরুদ এই বার তার বুক জুড়ে জলের জোয়ার নিয়ে আসায় গানাত ভরে ঢল এসেছে(ছোট ছোট খাল)। খান দুরানির চোখে তিতির পাখির স্বপ্ন নেচে বেড়াচ্ছে। হাজারা’র সাথে তার বিয়ে ঠিক ঠাক আছে। এ ফসলটা উঠলেই  হাজারাও তার ঘরভর্তি রোশনাই নিয়ে আসবে। হেরাতের আকাশে পূর্ণিমা। মাঠভর্তি তরমুজ আর বাদামের ঘ্রাণ। দূরের শহরের দিকে রাস্তায় যৌথ বাহিনীর একটা ক্যাম্প। এই লোকগুলোকে কখনোই দুরানির ভাল লাগেনি। পরশু না কবে এক দল এসে কাহালার চাচার বাদাম ক্ষেতের উপর গাড়িটা চালিয়ে নিল। মানুষটা গত বছর থেকেই ঋণের মধ্যে ডোবা। তৃতীয় মেয়েটাকে বিয়ে দিতে না দিতে প্রথম মেয়েটা বিধবা হয়ে বাড়িতে এসে উঠেছে, সাথে দুটি ছেলে-মেয়ে। এমনিতেই কষ্ট হচ্ছিল সংসারটা চালাতে। তার উপর বিধবা মেয়ের ভরণ-পোষণ। স্বামী তালিবানদের খবরি হিসেবে কাজ করতো- এ অভিযোগে পুরো বাড়িটাতেই আগুন জ্বালিয়ে দিল যৌথ বাহিনীর শান্তি প্রচেষ্টার গোলা ও গুলি। কায়েনাত তখন জল আনতে গ্রামের একমাত্র কুয়ার কাছে ছিল। দৌড়ে আসতে আসতে ঘরে থাকা চার চারটা মানুষ পুড়ে ছাই। ছোট ভাইটির চলা ফেরাও আজকাল ঠিক লাগছে না। সংসারের কাজগুলোর প্রতি ভীষণ অমনোযোগী হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোথায় কোথায় যে থাকে বাড়ির বাইরে। খুব মধুর একটা শিশ বেজে উঠলো। এটা যে তিতির নয় সেটা নিশ্চিতভাবেই জানি, হাজরার। কোথাও লুকিয়ে আছে। আমাদের এ লুকোচুরি সেই ছোটবেলায় উপত্যকার খাদগুলো ধরে শুরু। যতো বড় হয়েছি ততোই আলাদা হতে বাধ্য হয়েছি। ঐ মাদ্রাসাটার কথা সব চেয়ে ঘৃণাভরে মনে পড়ে যে আমার ভেতর একটা দানবকে প্রায় জীবন্ত করে তুলেছিল। আব্বুজানের মৃত্যু আমাকে ভয়ানক এক পীড়ন থেকে বাঁচিয়ে চির ব্যথায় আপ্লুত করেছে। নকশা করা হালকা বেগুনি রঙের একটা ওড়নায় ময়ূরের রঙিন খোলা পাখার সেলাই নিখুঁত সুন্দর ঠিক তার মুখেরই মতন। বারান্দায় ঝোলানো ক্যাকটাসের কাঁটার সৌন্দর্যের যে মোহ ও মুগ্ধতা আমাকে গন্ধের মতন টেনে নিয়ে এসেছে ঝোপের পাশে, হাজরার ঠিক যেখানটাতে দাঁড়িয়ে তার পাশেই। রেকাবের অন্ধকার থেকে যেন এক নকশা করা পরির আলো ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে। পাশের বাদাম ক্ষেতের মিষ্টি ঘ্রাণ ও বাতাসের বেসামাল চলা-ফেরা সবই যেন স্বপ্নকথন। হাজরার চলে যাওয়ার দিকে শেষবার যখন তাকিয়ে আছি একটা প্লেন আমাদের মাথার উপর দিয়ে চলে যেতে যেতে আমাদের স্বপ্নের সবগুলো সত্যিকে গুড়িয়ে, মৃত রেখে, উড়ে গেল ধোঁয়া আর লাশের মাঝখানে... (হেরাত, ২০০৭)

বাংলাদেশ সময়: ১৬২৮ ঘণ্টা, ১৭ আগস্ট, ২০১২
সম্পাদনা: এম জে ফেরদৌস, নিউজরুম এডিটর

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
Bookmark and Share
REVE Systems
VISA Center Inc
Holy Hajj BD
RehabHousing.com

শিল্প-সাহিত্য

8877
Kaspersky Lab - Antivirus Software [ Bangladesh ]
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম | এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: news.bn24@gmail.com, editor.banglanews@gmail.com, editor@banglanews24.com    বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন

বাংলায় লেখা হলে ইউনিকোডে পরিবর্তন করে ইমেইল করুন    কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান