 |
ঢাকা: এখন ঘরে বসেই দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শনের বিস্তারিত তথ্যসহ বিশাল সংগ্রহশালা।
জাতীয় জাদুঘরের ওয়েবসাইটে এখন অবজেক্ট আইডি লিখে সার্চ দিলেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে বাঙলার চিরায়ত ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির স্মারক চিহ্ন।
বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জাদুঘরে রক্ষিত নির্দশনগুলো অনলাইনে খুব সহজে দেখার জন্য এ ব্যবস্থা।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি এবং সঠিক ইতিহাস প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে হাজার হাজার নিদর্শনের জন্য আলাদা পরিচিতি নম্বর (অবজেক্ট আইডি) তৈরি করে অনলাইনে দেওয়া হয়েছে।
ওয়েব সাইটে (www.bangladeshmuseum.gov.bd) এসব আইডি লিখলেই ওই বস্তুর ছবিসহ বিবরণ পাওয়া যাবে। ওয়েবসাইটে বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনে (সংস্করণে) পাওয়া যাবে এসব নিদর্শনের পরিচিতি।
জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ বলেছে, অনলাইনে নিদর্শনের বিন্যাস ছাড়াও জাদুঘরের প্রশাসনিক কাজ সহজ করতে জাতীয় জাদুঘরকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করে গড়ে তোলা হয়েছে, যা ডিজিটাল দেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এছাড়া, চারটি শাখা জাদুঘরের নিদর্শন ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক প্রকাশ চন্দ্র দাশ বাংলানিউজকে বলেন, “নিদর্শন সামগ্রী স্বচ্ছতার সঙ্গে নিরাপদে সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিশ্বের যে কোনো জাদুঘরের আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমতুল্য করাই এর মূল লক্ষ্য।’
জাতীয় জাদুঘরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর তথ্য যোগাযোগ ও ডিজিটালাইজেশন’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় জাতীয় জাদুঘরের সংগৃহীত নিদর্শনের জন্য যুগোপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানের অবজেক্ট আইডি প্রস্তুত করা হয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, এর আগে ডিজিটালাইজেশন কর্মসূচির জন্য ২০১০ সালের ১৫ মার্চ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ চাহিদা পাঠালে নভেম্বরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এর অনুমোদন দেয়। নভেম্বর থেকে ২০১২ সালের জুন মাস পর্যন্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয়। কর্মসূচি বাস্তবায়নে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ছাড় দেয় সরকার।
কর্মসূচির আওতায় জাতীয় জাদুঘরের ৮৬ হাজার ৪৫১টি নিদর্শনের ১৬ ডিজিটের নিদর্শন আইডি ব্যবস্থায় নিদর্শন শনাক্তকরণ নম্বর, আলোকচিত্র ও অত্যাবশকীয় তথ্যসমূহ সংরক্ষণের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ডাইনামিক ওয়েবসাইট।
জাতীয় জাদুঘর ও শাখা জাদুঘরগুলোকে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন কর্মসূচি পরিচালক ড. শিখা নূর মুনসী।
কর্মসূচির আওতায় জাতীয় জাদুঘরের মানব সম্পদ, তথ্য ব্যবস্থাপনা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, ডাইনামিক ওয়েবসাইট, গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) সফটওয়্যার ডেভেলপ করা হয়েছে বলে জানান কর্মসূচির পরিচালক।
তিনি জানান, ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়ায় জাতীয় জাদুঘরের প্রত্যেকটি নিদর্শনের ডিজিটাল ছবি ওয়েবসাইটে দেখা যাবে। এছাড়া, গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর ক্ষেত্রে চার দিক থেকে ছবি তোলা হয়েছে।
এজন্য ৩১টি শনাক্তকারী নির্ণায়কের মাধ্যমে নিদর্শন শনাক্তকরণপত্র তৈরি করা হয়েছে। এতে নিদর্শনের নাম, ক্রমিক নম্বর, তৈরির সময়, নির্মাণকারীর নাম, দাতার নাম, দেশ, নিদর্শন প্রাপ্তিস্থান, ঐতিহাসিক তাৎপর্য ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি শনাক্তকারী নির্ণায়কের সঙ্গে একাধিক লিঙ্ক দেওয়া হয়েছে।
জাদুঘরের সহকারী রেজিস্ট্রেশন অফিসার ও ফোকাল পয়েন্ট অফিসার শহীদুর রহমান এ ব্যাপারে বলেন, “জাদুঘরের বিভিন্ন নিদর্শনের ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন শেষ হয়েছে। অটোমেশন অপারেশনে প্রবেশ করেছি। এখন ভেরিফিকেশন পোস্ট টেস্টিং চলছে।”
মহাপরিচালক জানান, জাতীয় জাদুঘরের নির্বাচিত একশ’ নিদর্শন এখন ইন্টারনেটে দেখা যাচ্ছে। তবে, বাকি নিদর্শন গবেষকদের জন্য কিছু শর্তের বিনিময়ে উন্মুক্ত থাকবে।
তিনি আরো জানান, ডিজিটালাইজেশন কর্মসূচির অধীনে জাদুঘরের রেফারেন্স লাইব্রেরির ডিজিটালাইজেশনও সম্পূর্ণ করা হয়েছে।
জাদুঘরের সহকারী রেজিস্ট্রেশন অফিসার শহীদুর রহমান খান জানান, লাইব্রেরির ডিজিটালাইজেশন হওয়ায় বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতিতত্ত্ব, সমকালীন শিল্পকলা ও বিশ্বসভ্যতা বিষয়ক দুষ্প্রাপ্য বই-সাময়িকীর ‘অনলাইন ডিজিটাল অটোমেশন ইন্টিগ্রেটেড লাইব্রেরি সিস্টেম (আইএলএস)’ প্রবর্তনের লক্ষ্যে মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম লিনাক্সের কোহা সফটওয়্যার সংস্থাপন করে প্রায় ৩০ হাজার বইয়ের ক্যাটালগিং করা হয়েছে। এ ডিজিটালাইজেশন হওয়ায় পাঠক ও গবেষকরা চাহিদা মোতাবেক তথ্য সেবা নিতে পারবেন।
এ ব্যাপারে জাদুঘরের কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় জাদুঘর এবং অধীনস্থ চারটি জাদুঘরের প্রায় ৫শ’ জনবলের যাবতীয় তথ্য, হিসাব সংক্রান্ত তথ্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এমআইএস সফটওয়্যারের ব্যবহার সক্রিয় রাখতে ৭৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা হয়েছে।
জাতীয় জাদুঘরের নিদর্শনের অবজেক্ট আইডি তৈরি ও সন্নিবেশ শেষ হয়েছে। আর এর অধীনস্থ চারটি শাখা জাদুঘরে (আহসান মঞ্জিল জাদুঘর, সিলেটের ওসমানী জাদুঘর, চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘর এবং ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা) এমআইএস প্রবর্তন করা হয়েছে। চারটি শাখার আরো ১৪ হাজার নিদর্শনের বিস্তারিত বিবরণ এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এসব কর্মসূচি ছাড়াও ‘জাতীয় জাদুঘরের দু’টি বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শনী’ ও ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানায়, আগামী অক্টোবর নাগাদ প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
জাদুঘরের মহাপরিচালক বলেন, “ডিজিটাল জাদুঘরের উদ্বোধন হলে জনসাধারণ অধিকহারে জাদুঘরমুখী হবে এবং দর্শক সংখ্যা দিগুণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।”
বাংলাদেশ সময়: ১৬৩৮ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১২
এমআইএইচ/এটি/সম্পাদনা: জাহাঙ্গীর আলম, নিউজরুম এডিটর; নূরনবী সিদ্দিক সুইন, অ্যাসিসট্যান্ট আউটপুট এডিটর