ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

bangla news

ওপারের এক লাখ এপারে তিন হাজার

রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০৯-১৩ ৬:৪১:২৪ পিএম
ওপারের এক লাখ এপারে তিন হাজার

ওপারের এক লাখ এপারে তিন হাজার

উখিয়া (কক্সবাজার) থেকে: মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার হয়ে যারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন তাদের অধিকাংশই একেবারে নি:স্ব অবস্থায় এসেছেন। টাকাপয়সা দূরের কথা, ঘর থেকে খুঁটিনাটি গৃহস্থালী পণ্য ছাড়া তেমন কিছুই আনতে পারেননি।অনেকেই এক কাপড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে নিজের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

তবে বিভিন্ন অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান নেয়া শরণার্থীদের কেউ কেউ মিয়ানমার থেকে পকেটভর্তি টাকা এনে বাংলাদেশে পড়েছেন আরেক বিপত্তিতে। নাফ নদীর দক্ষিণ পাড়ের দেশ মিয়ানমারের মুদ্রায় এক লাখ কিয়াট এনে বাংলাদেশে তারা পাচ্ছেন মাত্র তিন হাজার টাকা।

কেউ কেউ এক, দুই কিংবা পাঁচ লাখ কিয়াট নিয়ে এলেও সেই অর্থ বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তরের পর নৌকা ভাড়া আর ঘর তোলার জন্য বাঁশ-ত্রিপল কিনতেই শেষ হয়ে গেছে।এর ফলে মিয়ানমারে যারা লাখ লাখ কিয়াটের মালিক তারা বাংলাদেশে এসে পথের ফকির। ত্রাণের জন্য ছুটে, ভিক্ষার আশায় ঘুরে আর পরিবারের নারী সদস্যদের হাতে-গলায় থাকা সামান্য স্বর্ণালংকার বেচে দিয়ে তাদের দিন পার করতে হচ্ছে। তবে যারা একেবারে নি:স্ব অবস্থায় এসেছেন তাদের অবস্থা আরও করুণ।

বুধবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতপালং ও বালুখালীর মাঝামাঝিতে আমতল অস্থায়ী ক্যাম্পের সামনে গিয়ে মিয়ানমারের টাকা কেনার একটি চিত্র দেখা গেছে। একটি অটোরিকশায় তিনজন মধ্যবয়সী লোক এসে শরণার্থীদের কাছে জানতে চাইছেন কারও কাছে মিয়ানমারের টাকা (কিয়াট) আছে কি না ? কেউ মিয়ানমারের টাকা বিক্রি করবেন কি না।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে একজন শরণার্থী এক লাখ কিয়েট তাদের হাতে তুলে দেন। বিনিময়ে তারা দেন তিন হাজার বাংলাদেশি টাকা। এরপর দ্রুত অটোরিকশাটি চলে যায়।বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা

মিয়ানমারের মংডু জেলার বালুখালী থেকে এক সপ্তাহ আগে আসা সোনা মিয়া নামের ওই শরণার্থী বাংলানিউজকে জানান, তিনি মোট তিন লাখ টাকা (কিয়াট) নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। টেকনাফে ঢুকেই দুই লাখ কিয়েট বিক্রি করে ছয় হাজার টাকা পেয়েছেন। সেই টাকার মধ্যে তিন হাজার টাকা দিয়ে বালুখালী পাহাড়ে অস্থায়ী ঘর করার জন্য একটি জায়গা নিয়েছেন। ঘর তোলার জন্য বাঁশ ও ত্রিপল কিনতে এবং প্রথম কয়েকদিনের খাবার কিনতে সেই টাকা শেষ হয়ে গেছে।

‘কয়েকটা পুরনো কাপড় ছাড়া তেমন কিছু পাইনি। একদিন কিছু চিড়া আর বিস্কুট পেয়েছিলাম। ঘরের জন্য বাজার লাগবে। সেজন্য শেষ এক লাখ টাকা (কিয়াট) ভাঙিয়ে ফেললাম।’ বলেন স্ত্রী ও ৯ সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে আসা সোনা মিয়া।

মংডুর ঘরাখালী থেকে আসা আলী শাহ এক লাখ কিয়াট নিয়ে এসেছিলেন।তিন হাজার টাকা পেয়ে ঘর তুলতেই সব টাকা খরচ হয়ে গেছে।

আলী শাহ বাংলানিউজকে বলেন, তিন লাখ টাকা এনেছিলাম।দুই লাখ টাকা নাও (নৌকা) ভাড়া দিতে হয়েছে। এক লাখ টাকাও শেষ হয়ে গেছে। আমার বৌয়ের একটা নাকফুল ছিল, তিন পয়সা (আনা) ওজনের। টেকনাফে সেটা দেড় হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করেছি।

কুতপালংয়ে অস্থায়ী ঘর তুলে বসবাসকারী মিয়ানমারের মংডুর সফরদিঘী থেকে আসা ইদ্রিস বাংলানিউজকে বলেন, পাঁচ লাখ টাকা (কিয়াট) আনছিলাম। লাভ কি হল ? এখানে ১৫ হাজার টাকা পেয়েছি। ঘরের জন্য ৫ হাজার টাকা দিয়ে জায়গা নিয়েছি। সব টাকা এখন শেষ হয়ে গেছে।

তবে মিয়ানমারের তমব্রু সীমান্তের নূর হাশিম, ঘরাখালীর রেহানা বেগম এবং ভুচিদংয়ের আব্দুল মালেক জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদরে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। ঘরে টাকাপয়সা, আসবাবপত্র যা ছিল সব্ই পুড়ে গেছে। সেজন্য এক কাপড়েই তার চলে এসেছেন কোন টাকাপয়সা আনতে পারেননি।

তবে মিয়ানমার থেকে কিয়াট এনে বাংলাদেশে সেটা টাকায় রূপান্তর করতে গিয়েও ঠকতে হচ্ছে এই অসহায় শরণার্থীদের।

চট্টগ্রাম নগরীর কয়েকজন মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মায়ানমারের কিয়াটের ব্যবহার বাংলাদেশে নেই। শুধুমাত্র কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর এলাকায় ব্যবসায়িক কারণে কিছু কিয়াট ব্যবহার হয়।সেজন্য কিয়াটের কোন মূল্যমানও বাংলাদেশের মানি একচেঞ্জ ব্যবসায়ীদের কাছে নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও কিয়াটের কোন দর নেই।

তবে সেন্ট্রাল ব্যাংক অব মিয়ানমারের ১৩ সেপ্টেম্বরের দর অনুযায়ী বাংলাদেশের এক টাকা সমান মিয়ানমারের ১৬ দশমিক ৫০ কিয়াট। আবার এক মার্কিন ডলার সমান ১৩৫৪ কিয়াট।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ সেপ্টেম্বরের দর অনুযায়ী এক মার্কিন ডলার সমান ৮০ টাকা ৭০ পয়সা। সেই হিসেবে বাংলাদেশের এক টাকা সমান ১৬ দশমিক ৭৭ কিয়াট।

এক টাকায় ১৬ দশমিক ৫০ কিয়াট ধরলে এক লাখ কিয়াটে ৫ হাজার ৯৬৩ টাকা দেওয়ার কথা। আর এক টাকায় ১৬ দশমিক ৫০ কিয়াট ধরলে এক লাখ কিয়াটে আসবে ৬ হাজার ৬০ টাকা।

উভয় হিসেবেই দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারের শরণার্থীদের কাছ থেকে এক লাখ কিয়াট নিয়ে তাদের যা প্রাপ্য তার অর্ধেক টাকা দেওয়া হচ্ছে।

বুধবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো পরিদর্শনে আসা মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশে সাবেক কূটনীতিক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, এত মানুষ একসঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে প্রবেশ করছে, বাংলাদেশ তো এই পরিস্থিতি অতীতে কখনও সামাল দেয়নি। তাই কিছুটা হয়তো মিসম্যানেজমেন্ট আছে। তবে সারাদেশের মানুষ যেভাবে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই যেভাবে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এটা বিশ্বের কাছে একটা অনন্য দৃষ্টান্ত। ছোটখাট অসঙ্গতি বাদ দিলে রোহিঙ্গাদের পাশে পুরো বাংলাদেশ দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৮৪০ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৭

আরডিজি/টিসি

হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করছে গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গারা

ধানখেতে পড়ে ছিলেন তসলিমা, বুকে দুই সন্তানের নিথর দেহ

‘আবার যুদ্ধে যাব’

এত রোহিঙ্গা শিশুর ভবিষ্যৎ কি ?

মিয়ানমারে ফিরতে রাজি নন নির্যাতিত রোহিঙ্গারা

পথে পথে তল্লাশি, রোহিঙ্গাদের সতর্কে মাইকিং

ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে শিশু

রোহিঙ্গাঢলে হুমকির মুখে পর্যটন শিল্প

কত রোহিঙ্গা এসেছে, সঠিক হিসেব নেই কারো কাছে

সক্রিয় দালালচক্র, পুঁজি রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ

রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ৪ চেকপোস্ট

পাহাড়-বন দখল করে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের বসতি

‘ওপারে বাদশা ছিলাম, এপারে ফকির হলাম’

মঙ্গলবারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের মায়ানমার ছাড়ার আলটিমেটাম

স্ত্রীদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে স্বামীরা

গাড়ি দেখলেই রোহিঙ্গাদের আর্তি ‘খাবার দিন’

মাকে কাঁধে নিয়ে ২৯ মাইল হেঁটে এপারে সাইফুল্লাহ

অন্তর্ভুক্ত বিষয়ঃ রোহিঙ্গা

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

FROM AROUND THE WEB
Loading...
Alexa