ঢাকা, শুক্রবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

bangla news

সক্রিয় দালালচক্র, পুঁজি রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ

রমেন দাশগুপ্ত, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৭-০৯-১০ ৮:২৬:১৪ পিএম
বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের একাংশ

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের একাংশ

উখিয়া (কক্সবাজার) থেকে: মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আসা উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের অসহায় অবস্থাকে পুঁজি করে ব্যবসা পেতেছে স্থানীয় দালালচক্র। রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ করানো, নৌকার ভাড়া, অস্থায়ী ক্যাম্পসহ নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া, পাহাড়ে জায়গা দখল করে দেওয়াসহ বিভিন্ন খাতে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মোটা অংকের টাকা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রথমদিকে এই দালালচক্র প্রশাসনের নজর এড়িয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে সহযোগিতায় সচেষ্ট ছিল। তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকার সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ঢুকতে বাধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তারা বাড়তি নৌকা ও গাড়িভাড়া এবং ঘর তোলার জন্য জায়গা দেওয়ার বিনিময়ে টাকা আদায় করছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২৬ জন দালালের একটি তালিকা করে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে যাতে রোহিঙ্গাদের টাকার বিনিময়ে অনুপ্রবেশ করানোর তথ্য আছে। শুধুমাত্র অনুপ্রবেশের জন্য জনপ্রতি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা নেয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গোয়েন্দা প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে।

তালিকায় চার পুলিশ সদস্য এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নাম আছে। এর বাইরে বাংলাদেশে দীর্ঘসময় ধরে বসবাসরত রোহিঙ্গারাও এই কাজের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

উখিয়া উপজেলার বালুখালী এলাকায় বিস্তির্ণ পাহাড়জুড়ে অবৈধ বসতি গড়ে তুলে বসবাস শুরু করেছেন উদ্বাস্তূ হয়ে আসা রোহিঙ্গারা। সেখানে কয়েকজন শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলে টাকার বিনিময়ে অনুপ্রবেশ করে জায়গা কিনে বসতি তৈরির তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে।সেখানে যারা নতুন ঘর তুলছেন তাদের সহযোগিতা করতে দেখা গেছে বেশ কয়েকজন বাঙালি যুবককে।

পরিবারের ১১ সদস্য নিয়ে ৮০ বছরের বৃদ্ধ নাজির হোসেন এসেছেন মিয়ানমারের মংডু জেলার নাসিদং থেকে। নাজির বাংলানিউজকে জানালেন, নাফ নদী পার হওয়ার জন্য প্রত্যেকের জন্য মিয়ানমারের টাকায় ৫ হাজার টাকা করে নৌকা ভাড়া দিতে হয়েছে। নৌকা ভাড়া এসেছে ৫৫ হাজার টাকা। মাঝি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় তুলে তিনজন বাঙালির কাছে তাদের বুঝিয়ে দেয়। সেখান থেকে বাংলাদেশি টাকায় এক হাজার টাকা দিয়ে টমটম ভাড়া করে বালুখালী পাহাড়ে নেওয়া হয়। পাহাড়ের উপরে ১০ ফুট বাই ৪ ফুট মাপের দুটি জায়গা ৫ হাজার টাকা করে ১০ হাজার টাকায় তারা কিনে নিয়েছেন। এর বাইরে বাঁশ এবং ত্রিপল আলাদা কিনতে হয়েছে। সেগুলোও বিক্রি করছেন স্থানীয় কয়েকজন যুবক।

বালুখালী পাহাড়ে কওমি মাদ্রাসা ও হেফজখানার সামনে দেখা হয় রাচিদং থেকে আসা সাহেদ নামে এক যুবকের সঙ্গে।সাহেদ বাংলানিউজকে জানান, আগে থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা তার এক আত্মীয় বালুখালী এলাকায় জায়গা ঠিক করে রাখেন। শুক্রবার (০৮ সেপ্টেম্বর) নদী পার হওয়ার পর সরাসরি সাহেদ পরিবারের ১০ সদস্য নিয়ে চলে এসেছেন বালুখালীতে।

তিনি বলেন, অনেকে রাস্তার পাশে ঘর তৈরি করে থাকছে। তাদের নাকি তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু যারা পাহাড়ে থাকছে তারা থাকতে পারবে। এজন্য পাহাড়ে জায়গার দাম নেওয়া হচ্ছে।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো.আলী কবির বাংলানিউজকে বলেন, বন বিভাগের জায়গায় ঘর তুলে দিয়ে কেউ কেউ টাকা আদায় করছে বলে শুনেছি। বিষয়টি আশা করি প্রশাসন দেখবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের গোয়েন্দা প্রতিবেদন বান্দরবানের তমব্রু জলাপাইতলি, তমব্রু মধ্যপাড়া এবং তমব্র হেডম্যান পাড়া দিয়ে দালালচক্র সক্রিয় থাকার কথা উঠে এসেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, দালালের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকা থেকে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির হয়ে রোহিঙ্গারা বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে।  

প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের পাচারকারী হিসেবে বাংলাদেশী ২৬ জন দালালের মধ্যে বান্দরবানের ঘুমধুম পুলিশ ক্যাম্পের চার সদস্য রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের অনুপ্রবেশে সরাসরি জড়িত বলে বলা হয়।তিনজন স্থানীয় সরকারদলীয় নেতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের জন্য পুলিশ টাকা আদায় করেন বলে তালিকায় উল্লেখ রয়েছে। এই রাজনীতিবিদেরা দালালদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন।

এই চার পুলিশ সদস্য হলেন নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম পুলিশ তদন্ত ক্যাম্পের তিন উপ-পরিদর্শক মো. এরশাদুল হক, মো. আলমগীর ও মো. আমিনুল এবং কনস্টেবল মো. শাহিন। তিনজন স্থানীয়রাজনীতিকের সঙ্গে যোগসাজশে টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কাজ করেন।

স্থানীয় রাজনীতিকদের মধ্যে আছেন আওয়ামী লীগের মো. বারেক আজিজ, যুবলীগের সফিউল আলম ও আওয়ামী লীগের কর্মী মো. শফিক। বারেক আজিজ আবার ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের ছোট ভাই।

এই তালিকা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বান্দারবানের জেলা প্রশাসক দীলিপ কুমার বণিক। তিনি বলেন, পুলিশ হোক, বিজিবি হোক আর রাজনীতিক হোক তাদের আইনেরআওয়াতায় আনা হবে।  

জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, পুলিশ সদস্যদের যে নাম এসছে তারা বান্দরবানে কর্মরত। দালালদের বিষয়ে আমরা সজাগ আছি।

জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) সনজিত কুমার রায় দালাল চক্রের তালিকার বিষয়ে অবগত নন বলে জানান।

দালাল চক্রের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছেন তমব্রু জলপাইতলির মো. নূর হোসেন (৩৫)।এছাড়া তালিাকায় নুরুল কবির, গিয়াস উদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, বেলাল হোসেন নামে তিনজন গাড়িচালকের নাম রয়েছে।ঘুমধুম দুই নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জেল মোহাম্মদের ভাই নূর মোহাম্মদ, ওয়ার্ড বিএনপি নেতা ইইয়ুব আলী, যুবদল নেতা আবদুস শুক্কুর ও আওয়ামী লীগ নেতা জকির আহম্মদের নাম রয়েছে।

বাংলাদেশ সময়: ২০২৭ ঘণ্টা, সেপ্টেম্বর ১০,২০১৭

আরডিজি/টিসি

অন্তর্ভুক্ত বিষয়ঃ রোহিঙ্গা

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

FROM AROUND THE WEB
Alexa