Alexa
ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ আষাঢ় ১৪২৪, ২০ জুন ২০১৭

bangla news
উপকূল থেকে উপকূলে

‘বুড়ো গৌরাঙ্গ’ নদীর মাঝি

রহমান মাসুদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৬-০৮-১৯ ১০:৪৩:৩৩ এএম
 ‘বুড়ো গৌরাঙ্গ’ নদীর মাঝি

‘বুড়ো গৌরাঙ্গ’ নদীর মাঝি

উপকূল থেকে ফিরে: নাম তার শাকিল। বয়স ১৩। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে বুড়ো গৌরাঙ্গ নদীতে নৌক‍া চালাতে চালাতে গায়ের রঙটা কেমন ফ্যাকাশে করে ফেলেছে। মাথার চুল হয়েছে তামার বর্ণ। ফিনফিনে শরীরেই তার অদম্য শক্তি। সেই শক্তি দিয়েই দুর্যোগের দিনে উত্তাল নদীর বুকে বৈঠার ‘ঘাই’ মারতে মারতে শাকিল বলছিল-‘পানির আইজ মাথা গরম’।

পটুয়াখালী জেলার রাঙাবালি উপজেলার সদর ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ‘চর কাসেম’। এই চরেই বসবাস শাকিলের। মূল ভ‍ূখন্দের সঙ্গে চরের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে শাকিলের ছোট্ট খেয়া নৌকা। সকাল ৬টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত এই কাজ করে চরম নিষ্ঠার সঙ্গে।
 
যখন ‘গাঙ্গি পাড়া’ খেয়া ঘাটে গিয়ে পৌছাই, তখন সময় বিকেল সাড়ে চারটা। ঘুর্ণিঝড় পূর্বাভাস কেন্দ্র ঘোষিত তিন নম্বর সতর্ক সংকেত চলছিল। সাগর ও নদী থেকে এরইমধ্যে সকল মাছ ধরা ট্রলার ও নৌযান নিরাপদ স্থানে ফিরে এসেছে। স্থানীয় নৌযান চলাচল কর্তৃপক্ষ বন্ধ করেছে সব ধরনের নৌ পারাপার। কিন্তু বন্ধ হয়নি, শাকিলের খেয়া। টানা বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে উত্তাল নদীতে সে পারাপার অব্যাহত রেখেছে।
 
বড় ঢেউ যখন ছোট নৌকাকে বেপথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন শাকিল প্রাণপনে চেষ্টা করছিলো গতিপথ ঠিক রাখতে। এমন সময় তার দিকে তাকাতেই বিজ্ঞের মতো অভয় দিয়ে বলল- ‘ডরাইয়েন না। পানির আইজ মাথা গরম।’ ভয় পাইনি ঠিকই, তবুও ভাবতে হয়েছে কিশোর এই মাঝিকে নিয়ে। কি অসীম সাহস আর শক্তি ছোট্ট শরীরের ভেতর। চোখে মুখে সারাক্ষণ হাসির ছটা!
 
সন্ধা তখন ঘন হয়ে এসেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বৃষ্টির ছটাও। মাইল দুরের সাগর থেকে জোরে বইছে লোনা বাতাসও। এরইমধ্যে আবার ফিরে এলাম খেয়া ঘাটে। এবার আমাদের সঙ্গী আরো কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। তারা সবাই ভূমীহীন কৃষি শ্রমিক। বসবাস নদীর পাড়ের বেড়ি বাঁধে। চর কাসেমে এখন আমন চাষের ভরা মৌসুম। সে কাজেই প্রতিদিন তারা এপার ওপার হচ্ছেন।
 ‘বুড়ো গৌরাঙ্গ’ নদীর মাঝি
এদেরই একজন গোলাম হোসেন হাওলাদার। পরিচয় জেনে বলছিলেন, ‘ঢোপার দিনে (বর্ষার দিনে) চরাঞ্চলের মানুষের জীবন মৃত্যুর কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। যেমন এই ঘাটে আগে খেয়া বাইতেন বাতেন মাঝি। শাকিলের দাদা। মাস তিনেক আগে ঢেউয়ের তোড়ে তার খেয়া ভেঙ্গে তক্তা হয়ে যায়। পাওয়া যায়নি বাতেনকেও। সেই থেকে খেয়া বাওয়ার কাজ নিয়েছে শাকিল। ওর বাপেও বছর তিনেক আগে সাগরে টাংকি জাল বাইতে গিয়া তুফানে ডুইবা মরছে। এহন বুড়ো দাদী, বিধবা মা আর ছোট তিন ভাই-বোনের মুখে ভাত দেওয়ার দায় চাপছে এই নাবালকডার উপর।'

যখন এই আলাপ হচ্ছিল তখন শাকিলও মশকরায় ব্যাস্ত মৃত দাদাকে নিয়ে। বলছিল- ‘বুড়ো বোকা ছিল। সাতাঁর দিতে পারলো না!’ জানতে চাইলাম তার ভয় করেনা? তার জবাবটাও দিলো আনমনে বৈঠা ঠেলতে ঠেলতে- ‘মোরা চরের মানু, মোগো ডরাইলে চলেনা। সবই পারতে অয়’।

সহযাত্রী গোলাম হোসেন জানান, এখানকার প্রায় সবগুলো পরিবারেই ঝড়, জলোচ্ছ্বাস আর নৌকাডুবিতে দুই-চারজন করে স্বজন হারানোর স্মৃতি আছে। তাই ডরায় না কেউই। এইসব দুর্যোগ মোকাবেলা করেই চলে চরের জীবন।

গাঙ্গিপাড়া ঘাটে যখন আবার ফিরে আসলাম তখন বৃষ্টির তোড় যেমন বেড়েছে, তেমনি অন্ধকারে ঢেকেছে চারিপাশ। এরইমধ্যে শাকিল চেষ্টা করছে বাতাসের তীব্র ঝাপটাকে আড়াল করে নৌকায় সন্ধ্যাবাতি জ্বালাতে। পাশে গিয়ে জানতে চাইলাম, স্কুলে যাওনি কখনো? হারিকেনটা পাটাঁতনের নীচে সেঁধিয়ে দিয়ে ছাতা দিয়ে বৃষ্টিকে আড়ালের চেষ্টা করলো সে। গামছা দিয়ে ভেজা মুখ মুছতে মুছতে তড়িৎ উত্তরে জানালো, আমাগে চরে স্কুল নাই। তয় শুকনো কালে আমরা এপারের স্কুলে আসতাম। কিন্তু ঢেপার দিনে (বর্ষাকালে) স্কুলে কেউ আসেনা নৌকাডোবার ভয়ে। আমিও এক সময় স্কুলে আসতাম। কিন্তু দাদা মরার পর সংসার চালাতি খেয়া বাওয়া লাগে।

স্থানীয় সাংবাদিক কামরুল হাসান বলছিলেন, যাদের এপার অবস্থা সম্পন্ন আত্মীয় আছে তারা সন্তানদের এপারে রেখেই স্কুলে পড়ান। কিন্তু দেড় হাজার মানুষের বসবাস যে চর কাশেমে, সেখানে তেমন পরিবার আর কয়টি! সবাইতো ভূমিহীন মানুষ। সেখানকার শ’দেড়েক শিশুর তাই স্কুল শিক্ষা বলতে কিছু নেই।

এদিকে রাঙ্গাবালি উপজেলায় কোনো নির্বাহি কর্মকর্তা না থাকায় কথা বলতে হলো উপজেলা প্রকল্প উন্নয়ন কর্মকর্তা তপন কুমার দাসের সঙ্গে। অকপটে তিনি বলছিলেন, এখানকার মানুষ খুবই অসহায় আর ভাগ্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এরা খুবই মানবেতর জীবন যাপন করে। আধুনিক রাষ্ট্রের মৌলিক বা মানবিক অধিকার কি তা তারা জানেন না। ৪৫ বছরেও পিছিয়ে পড়া এ বিচ্ছিন্ন দ্বীপে কোনো স্কুল গড়ে ওঠেনি। এখানকার শতশত শিশু তাই শিক্ষা ছাড়াই বেড়ে উঠছে। সাগরে বা নদীতে মাছ ধরা বা নৌকা চালানোই তাদের একমাত্র নিয়তি।

বাংলাদেশ সময়: ১০৩৪ ঘণ্টা, আগস্ট ১৯, ২০১৬
আরএম/বিএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

জলবায়ু ও পরিবেশ বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

You May Like..
Alexa