জীবনের জুয়া নাকি জুয়ার জীবন | তানিয়া চক্রবর্তী
[x]
[x]
ঢাকা, রবিবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৫, ১৯ আগস্ট ২০১৮
bangla news

জীবনের জুয়া নাকি জুয়ার জীবন | তানিয়া চক্রবর্তী

ধারাবাহিক গদ্য ~ শিল্প-সাহিত্য | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০১৮-০১-২১ ১:৫১:৫০ পিএম
জীবনের জুয়া নাকি জুয়ার জীবন | তানিয়া চক্রবর্তী

জীবনের জুয়া নাকি জুয়ার জীবন | তানিয়া চক্রবর্তী

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান মানুষের মৌলিক চাহিদা। তাহলে কী এই তিনটে পেলেই মানুষের খুশি থাকার কথা; আপাত অর্থে তাই! কিন্তু ওই যে খিদে আর খাদ্যের টান ব্যক্তির হজমশক্তির ওপর নির্ভরশীল। এই জীবন আসলে আসক্তির হাতে খেলা করলে ভ্যাবলে যাবেই। অবশ্য আসক্তির সঙ্গে খেলা করাটাও কিছু কিছু ভাবের কাছে আরও একটা খেলা! আসলে সাজানো জীবনটাও তো খেলাই! এতো এতো উন্নতি নিমিষে ছাই, মানে আপনি জিততে জিততে টুক করে হেরে গেলেন; সব জলাঞ্জলি; দু’মিনিটে ফকির!

এরকম বলে আমি জুয়ার পক্ষ নির্বাচন কখনও করছি না কারণ, আমরা মানুষ একটাই দল নই। যে এই এই অংশটাই খাবে আর মরে যাবে। আমরা একটা শেকল। আমরা পরবর্তী প্রজন্মকে টেনে আনছি তাই সুস্থ পৃথিবী গড়ার দায় আমাদের। সেটা অবশ্যই জুয়ার মতো কিছুকে সমর্থন করবে না!
 
দ্য গ্যাম্বলার উপন্যাসের লেখক বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক দস্তয়ভস্কি নিয়মিত জুয়ার টেবিলে গিয়ে বসতেন। কারণ হিসেবে যদিও তিনি তার ক্লান্তি ও একাকিত্ব বোধকে উল্লেখ করতেই পারেন। মস্কোর ইংলিশ ক্লাব ছিলো জুয়া খেলার এক ক্লাসিক জায়গা। সেখানে মূলত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরাই যেতেন। বহু সাহিত্যিক, কবি, দার্শনিক তখন সেখানে একত্রিত হতে যেতেন। দস্তয়ভস্কি অবশ্য নেশায় বুঁদ হয়ে এক একদিন তার গায়ের কোট, হ্যাট প্রায় সব হেরেও অনেকসময় ফিরতেন। যেদিন জিততেন, সেই পুঁজিটুকু দিয়ে পরদিন আবার হারতেন। তার এই উপন্যাসের পটভূমি আসলে তিনি নিজেই ছিলেন।
 
“BETTER THE ILLUSIONS THAT EXALT US THAN TEN THOUSAND TRUTHS”
...এই বক্তব্য যার তিনি হলেন রাশিয়ার অন্যতম এক প্রধান কবি আলেকজান্ডার পুশকিন। খুব অল্প বয়সে যিনি খ্যাতির চূড়ায় এসে বসেছিলেন। তিনি নিজেও এই জুয়ার কবল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি, উল্টে অনেকসময় ঘর থেকে সোনাদানাও বাইরে জুয়ার টেবিলে গিয়ে সঁপে দিতেন।
 
আর মির্জা গালিব তো তার লেখাতে বলেই দিয়েছেন, “যে সুরা পান করতে পারে না সে নাকি অজ্ঞ”! জুয়া খেলার তীব্র আসক্তির জন্য তাকে বহুবার বিপদে পড়তে হয়েছে, তার জরিমানা, কারাদণ্ড সবই হয়েছে। শেষজীবনে অবশ্য তাকে অর্থাভাবে পড়তে হয়। চিত্রশিল্পী ক্লদ নিয়মিত লটারির টিকিট কাটতেন! মহাভারতের পাশা খেলাও জুয়ারই নামান্তর! আজ থেকে প্রায় তেইশশো বছর আগে চীনের শাসকরা জুয়ার আসরে আড্ডার ছলে মিলিত হতেন। বিভিন্ন সময় বিরোধিতা ও নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জুয়ার লুকোনো প্রক্রিয়া কখনও বন্ধ হয়নি। তাই এর পরিমার্জিত রূপ নিয়ে ক্যাসিনোর আগমন শুরু হয়। যেনো সমাজের যত্রতত্র মানুষকে প্রভাবিত না করে তারা একটা অংশে আবদ্ধ থাকতে পারে! প্রথম বৈধ ক্যাসিনো ১৯৭৮ সালে নিউ জার্সিতে সৃষ্টি হয়! রাশিয়ায় জুয়ার প্রাবল্য শুরু হয় তাসকে কেন্দ্র করে। ষোড়শ শতাব্দীতে তার প্রভাব উচ্চকিত হয়ে ওঠে। এমনকি কৃষকরা তাদের চাষবাস ছেড়ে গির্জার পাশেই এসব নিয়ে  বসে পড়তেন। রাশিয়ার বিভিন্ন শাসকরা জুয়ার কবল থেকে সাধারণ মানুষকে সরানোর চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি সেভাবে। কারণ নির্মূল করা যায়নি। ১৬৩৮ সালে প্রথম ইতালিতে ক্যাসিনো তৈরি হয়।
 
এখন যেসব ক্যাসিনো বিশ্বের মধ্যে নজর কাড়ে তারা শুধু আপাত অর্থে জুয়ার ব্যবস্থা নয়, তাক করা সব বিলাসব্যাসনে সাজানো যেনো এক হাতছানির চূড়ান্ত আবেদন। লাসভেগাসের বিখ্যাত বা কুখ্যাত “এমজিএম গ্র্যান্ড ক্যাসিনো”। বিভিন্ন পানীয়, খাদ্য, হোটেল রুমসহ এই ক্যাসিনোর আয়তন প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার  বর্গফুট। মজার ব্যাপার হলো, আপনি এখানে এক ডলার টাকা বিনিয়োগ করেও খেলা শুরু করতে পারেন। মানে ফকির থেকে কুবের হওয়ার হাতছানি চরম। ২৩০০টি গেমফ্লোর আছে এখানে। আর ম্যাকাও শহরের কিছু ক্যাসিনো যার গভীরে যতো যাওয়া যায় ততোই তা নিদারুণ ও তীব্র হতে থাকে! ম্যাকাও শহরের দ্য ভ্যালেন্তিয়ান হলো এর অন্যতম। চীনের এই ক্যাসিনো আসলে একটি হোটেল। অপূর্ব তার আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের ফক্সউডস রিসোর্ট ক্যাসিনো আবার সেলিব্রিটিদের আড্ডা মারার অন্যতম জায়গা! ম্যাকাও শহরের ওয়াইন ক্যাসিনো আসলে এক অবিশ্বাস্য সুন্দর সৃষ্টি। এখানে স্পা, পার্লার, লেকভিউ, হোটেল সব কিছুকে একত্রিত করে লাসভেগাসের অনুকরণে বানানো হয়েছে। বলা যায়, ধনকুবেররাই এখানে আসেন তাদের বাড়তি টাকা উড়িয়ে দিতে। এশিয়া মহাদেশে অবশ্য এ ব্যাপারে নেপাল এগিয়ে। ক্যাসিনো ইন, ক্যাসিনো সিয়াংগ্রি, নেপাল ক্যাসিনো— এখানকার প্রত্যেকটি ক্যাসিনো সৌন্দর্যে নান্দনিক। দেশজুড়ে এই ক্যাসিনো ব্যবসা আসলে হারা-জেতা নিয়ে রহস্যের খেলা। রুলেট, তাসের বাক্কারাট, ফ্লাশ, বিট, ব্ল্যাকজ্যাক এসব রকমারি সব খেলার আয়োজনে ও আহ্বানে মানুষের উচ্চতাকামী অবসরের মন প্লাবিত হয়ে যায়! এখানে জিতে যাওয়াটা কঠিন, হারাটাই সহজ। কারণ, আসক্তি আপনাকে সাধারণত জেতার পর স্থির করায় না। সে আরও জেতার কাছে নিয়ে যেতে চায় ফলে হারের সম্ভাবনা বাড়ে। যাদের বিপুল অর্থ, মানে আক্ষরিক ভাবেই টাকা হাতের ময়লা হয়ে দেখা দিয়েছে তারা মজা করতে নেমে পড়েন অথৈ জলে। কিছু মানুষ অবশ্যই এরকম আছেন যারা তাদের দেশভ্রমণ, ছুটি, বিনোদনের জন্য দুই-একবার যান। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যাদের নিয়মিত আগমনেই এই ব্যবসা বাড়ে তারা আদতে নিজেদেরই ক্ষতি করেন কোনো একভাবে।
...“I BECAME INSANE, WITH LONG INTERVALS OF HORRIBLE SANITY”
“LORD HELP MY POOR SOUL”
 
এই সব ব্যতিক্রমী কথার বক্তা হলেন আমেরিকার বিশিষ্ট কবি-গল্পকার এডগার অ্যালান পো’র। চূড়ান্ত অভাব, খামখেয়ালিপনায় নিমজ্জিত এই প্রতিভা জুয়ার ভয়ানক নেশা থেকে শেষ মহূর্তেও বেরিয়ে আসতে পারেননি।
 
আসলে বিষয়টা হলো কর্মের প্রাসঙ্গিকতাকে বাদ দিয়ে যখন কার্যকারণ হারিয়ে জীবনের রসদ মেলার খোঁজ আসতে থাকে তা ভয়াবহতাকে প্রশ্রয় দিতে শুরু করে। যেমন কেউ একদিন মজা করে একটা খেলা খেললেন সংযম করে ফিরে আসলেন সেটা আলাদা। যিনি কর্মরহিত হয়ে গেলেন তার কাছে বিষয়টা প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতো হয়ে গেলো; সেক্ষেত্রে সমূলে বিনষ্ট হওয়ার পরিমাণ বেশী। দস্তয়ভস্কি কী চূড়ান্ত রকমের আক্রান্ত হয়েছিলেন জুয়ার নেশায় তা জানলে অদ্ভুত ভয় লাগে! কারণ, উন্নত সমাজ মানবিকতার খাতিরে একদিন-দু’দিন সাহায্য করলেও যার নিজস্ব পুঁজি নেই তাকে জৈবিক কারণেই হেরে যেতে হয় এবং দেখা যায় সামগ্রিকভাবে এটা মানসিক বৈকল্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। সাইকোলজি অনুযায়ী গ্যাম্বলারদের বেশ কয়েকভাগে ভাগ করা যায়- প্রফেশনাল, অ্যান্টিসোশ্যাল, ক্যাজুয়াল, সিরিয়াস, এসকেপ ও কমপালসিভ।
 
এই কমপালসিভরা ক্ষতিকর নিজেদের ও অন্যদের উভয়ের পক্ষে। ফলস্বরূপ যখন এটা নেশার রূপ নেয় তখন যার উৎপত্তি ঘটে সেটাও নেশাকেই বাড়িয়ে দেয়। দেখা যায়, সাধারণ স্বচ্ছ যাপনে যে মস্তিষ্ক গতি থাকে তা ব্যাহত। এক ধরনের হরমোন ডোপামিনের তারতম্য দেখা যায় যা নেশাকে সক্রিয় রাখে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ১৯৮০ সালে এই ধরনের নেশাসক্তিকে “statistical manual of mental disorders” এই নামে অভিহিত করেন।
 
ডব্লিউ এইচ অডেন বলেছিলেন, “ALL SINS TEND TO BE ADDICTIVE, AND THE TERMINAL POINT OF ADDICTION IS DAMNATION”।
 
মনে হয় না এরপর আর কিছু বলা উচিত। আসলে উপায় আর অর্জন এদের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে পার্থিব ভয়াবহ হতে পারে। তাই বোধহয় প্রকৃতি নিজেও নিয়ম মেনে নেয়। ফলে আমাদের উচিত কিছুটার পর নিজেকে কোথাও ধরে রাখা...  
 
বাংলাদেশ সময়: ১৩৪৮ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২১, ২০১৮
এসএনএস

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের সর্বোচ্চ পঠিত

Alexa