বেআইনিভাবে বঞ্চিত শিশুর পারিবারিক পরিচয় পুন:প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব
ওলি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ চৌধুরী
অনেকেই হয়তো পত্রিকার পাতায় ডিআইজি এবং তার স্ত্রীর আদালত কর্তৃক শাস্তির দণ্ড ঘোষণার বিষয়টি দেখে থাকবেন। বাংলানিউজে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ”শিশুপাচার মামলায় বহুল আলোচিত সাত যমজ সন্তানের মা-বাবা বলে দাবিদার পুলিশের সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমান ও তার স্ত্রী আনোয়ারা রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত”।
এ রায়ের মাধ্যমে বিষয়টির আপাত: মীমাংসা হলেও শিশুদের পারিবারিক পরিচয় প্রতিষ্ঠাসহ বিষয়টির পুরো মীমাংসা এখনো বাকি।
প্রথমত: দণ্ডিত আসামী যে কি-না একসময় পুলিশের ডিআইজি ছিলেন, তিনি পলাতক। আদালত থেকে জামিন নিয়ে তিনি পালিয়ে যান। আদালত থেকে তিনি জামিন নিয়ে কীভাবে পালিয়ে গেলেন তারও তদন্ত হওয়া দরকার। এ বিচার শেষ হতে যথেষ্ট সময় লেগেছে এবং পুলিশের ভূমিকাও প্রশ্নের উর্ধেŸ নয়।
ইতোপূর্বে, পুলিশ কর্তৃক প্রদত্ত রিপোর্টে আসামীদের অব্যাহতি দানের সুপারিশ করা হয়। এ বিষয়টি মামলার সাথে সম্পর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি সন্দেহকে ঘনীভুত করে। বাংলানিউজের রিপোর্ট থেকে জানা যায় ২০০৬ সালেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে আসামীদের অব্যাহতির আবেদন করেন।
মামলার বাদী এডভোকেট এলিনা খান প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করলে আদালত তা গ্রহণ করে।
আমলযোগ্য কোন অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পুলিশ অফিসার (যাকে আইও বলা হয়) কর্তৃক তদšত শেষে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট আইও উক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদেরকে অভিযোগের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ফরমে বিজ্ঞ আদালতের কাছে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭৩ ধারার বিধান অনুসারে যে রিপোর্ট দাখিল করেন, তাকে পুলিশ রিপোর্ট বা ফাইনাল রিপোর্ট বলা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার মতো আধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার না হলে এ অপরাধের রহস্য হয়তো উদঘাটিত হতোনা । এতো বড় অপরাধ করেও হয়তো প্রমাণের অভিযোগে ছাড়া পেয়ে যেতেন প্রভাবশালী অপরাধীরা।
শিশুর পিতা-মাতার পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার অধিকার তার মানবাধিকার। শিশু অধিকার সনদ অনুসমর্থনকারী বিশ্বের প্রথম ২২ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থাকায়, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব অনেক বেশি। তদুপরি পারিবারিক পরিবেশের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে শিশু রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ সুরক্ষা ও সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ২০ এ বলা হয়েছে, ”কোনো শিশু সাময়িকভাবে কিংবা স্থায়ীভাবে তার পারিবারিক পরিবেশের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে কিংবা তার সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় ঐ পরিবেশে তাকে রাখা সমীচীন না হলে সে রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশেষ সুরক্ষা ও সহযোগীতা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে ”।
শিশু অধিকার সনদের অনুচ্চেদ ৭ এ বলা হয়েছে, ”জন্মের পরেই শিশুর জন্ম নিবন্ধিকরণ করতে হবে। জন্ম থেকেই শিশু একটি নাম, একটি জাতীয়তা এবং, যতদূর সম্ভব, তার পিতামাতা কারা তা জানার এবং মাতা-পিতার পরিচর্যা পাওয়ার অধিকার লাভ করবে”। আদালতের রায় থেকে এটা প্রমানিত আসামী আনিস এবং তার স্ত্রী মিলে শিশুদের অধিকার বেআইনীভাবে হরণ করেছেন।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে অনুচ্ছেদ ৮(২) এ। ”যেখানে একটি শিশু বেআইনিভাবে তার পরিচয়ের আংশিক কিংবা সমুদয় উপাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সেখানে দ্রুততার সঙ্গে তার পরিচয় পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য শরিক রাষ্ট্র যথাযথ সহায়তা ও সুরক্ষা দেবে”- শিশু অধিকার সনদে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এভাবেই বর্ণিত হয়েছে।
প্রাক্তন ডিআইজি আনিস এবং তার স্ত্রীর শাস্তির রায় ঘোষণা হলেও বঞ্চনার শিকার শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেক কাজ বাকি ! রাষ্টসহ অন্যান্য দায়িত্ববাহকদের আদালতের পাশাপাশি তাদের নিজেদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। জবাবদিহিতার জায়গা থেকে দায়িত্বশীলরা এগিয়ে আসলেই কেবল শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ওলি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ চৌধুরী একজন মানবাধিকার কর্মী
তথ্যসূত্র:
১. শিশু পাচার: ডিআইজি আনিস ও স্ত্রীর যাবজ্জীবন; http://www.banglanews24.com/detailsnews.php?nssl=a4a5491636ed3f755ba89540b372e9ed&nttl=104838
২. জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ
23 Apr 2012 07:38:53 PM Monday