| |||||||||||||
গৃহশ্রমিকের অধিকারঃ আইন ও বাস্তবতাঅ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম সৈকত গৃহশ্রমিক, যার দিন শুরু হয় ভোরের পাখি ডাকার সাথে সাথে আর দিন শেষ হয় পৃথিবীর সব কোলাহল স্তব্ধ হলে; যে বাড়ীর সবার আগে ঘুম থেকে ওঠে, আবার সবার পড়ে ঘুমাতে যায়; যে সবার জন্য খাবার ব্যবস্থা করে, কিন্তু সবার খাওয়া শেষে অবশিষ্ট খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে। তার পরও আছে বকা-ঝকা, মারপিট এবং যৌন নির্যাতন। কিন্তু প্রতিকারের কেউ নেই, সবই যেন এদের নিয়তি। আইন, আদালত, সমাজ, রাষ্ট্র সব দেখে, শোনে কিন্তু নিশ্চুপ। বর্তমান আর্থ-সামাজিক বিবেচনায় গৃহশ্রমিকদের জন্য আইন, নীতিমালা, আচরণবিধি প্রণয়নের সময় হয়েছে। ফলশ্রুতিতে সারা বিশ্বের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমখাতের এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কাজকে শোভনীয় করার লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায়, গত ১৬ জুন ২০১১ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর সাধারণ সম্মেলনের শততম অধিবেশনে গৃহশ্রমিকদের শোভন কাজ সংক্রান্ত কনভেনশন [কনভেনশন ১৮৯, গৃহশ্রমিক কনভেনশন ২০১১] গৃহীত হয়েছে। আইএলও কভেনশন ১৮৯ এর অনুচ্ছেদ ৩ এ বলা হয়েছেঃ ১। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র এই কনভেনশনে বর্ণিত সকল গৃহশ্রমিকের মানবাধিকারের কার্যকর সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ২। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র গৃহশ্রমিক সম্পর্কিত এই কনভেনশনে বর্ণিত কর্মেক্ষেত্রের মৌলিক নীতি ও অধিকারসমূহকে মেনে চলা, উন্নীত করা ও স্বীকৃতি দানের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, যেমনঃ -সংগঠনের স্বাধীনতা এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকারের কার্যকর স্বীকৃতি; –সকল প্রকার জবরদস্তিমূলক ও বাধ্যতামূলক শ্রম নির্মূল করা; -শিশুশ্রমকে কার্যকরভাবে নিরসন করা; –চাকরি ও পেশার সাথে সম্পর্কিত সকল প্রকার বৈষম্য দূর করা। ৩। গৃহশ্রমিক ও গৃহশ্রমিক নিয়োগকারীদের সংগঠনের স্বাধীনতা এবং যৌথ দর কষাকষির অধিকারের কার্যকর স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে, সদস্য রাষ্ট্রসমূহ গৃহশ্রমিক ও গৃহশ্রমিক নিয়োগকারী সংগঠন প্রতিষ্ঠা, এবং সংগঠনের বিধান অনুয়ায়ী সংগঠন, ফেডারেশন এবং কনভেনশনে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী যোগদান করার অধিকার সুরক্ষিত করবে। কভেনশনের অনুচ্ছেদ ৪ এ বলা হয়েছেঃ ১। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র ন্যূনতম বয়স সংক্রান্ত কনভেনশন, ১৯৭৩ (নং ১৩৮), এবং অত্যন্ত খারাপ ধরনের শিশু শ্রম সংক্রান্ত কনভেনশন, ১৯৯৯ (নং ১৮২) এর সাথে সঙ্গতি রেখে গৃহশ্রমিকদের জন্য একটি ন্যূনতম বয়সসীমা নির্ধারণ করবে; এবং এই ন্যূনতম বয়স সাধারণভাবে শ্রমিক সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আইন ও বিধিবিধানে বর্ণিত বয়সের চেয়ে কম হবে না। ২। প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা বিশ্চিত করবে যেন অনুর্ধ্ব ১৮ বছরের গৃহশ্রমিক এবং ন্যূনতম বয়সের চেয়ে বেশি বয়সি গৃহশ্রমিকদের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, অথবা উচ্চশিক্ষা বা বৃত্তিমূলক (ভকেশনাল) প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়। অনুচ্ছেদ ৫ এ রয়েছেঃ প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র গৃহশ্রমিকদের সকল প্রকার নিপীড়ন, হয়রানি ও সহিংসতা থেকে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করবে। অনুচ্ছেদ ৬ এ উল্লেখ করা হয়েছেঃ প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র অন্যান্য সাধারণ শ্রমিকের ন্যায় গৃহশ্রমিকেরাও যেন চাকরির ন্যায়সঙ্গত শর্তাদি ও শোভন কার্মপরিবেশ ভোগ করতে পারে, এবং যদি তাদেরকে নিয়োগকারীর গৃহে বসবাস করেত হয় তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে শোভন পরিবেশে থাকতে পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। ইতোমধ্যেই আইএলও কনভেনশন ১৮৯ এর আলোকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গৃহশ্রমিকদের অধিকার আইন প্রণীত হয়েছে এবং হচ্ছে। আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারত কেন্দ্রীয়ভাবে গৃহশ্রমিক অধিকার (সুরক্ষা) আইন ২০০৮ প্রণয়ন করেছে। সিঙ্গাপুরে আইন ছাড়াও সম্প্রতি গৃহশ্রমিকদের জন্য সপ্তাহে এক দিন ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রেক্ষিত বাংলাদেশঃ বাংলাদেশের গৃহশ্রমিকদের অধিকার ও সুরার বিষয়টি অনেকবার আলোচনায় উঠে আসলেও তা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক মানবাধিকার এমনকি শ্রমিক আন্দোলনেও যথাযথভাবে প্রাধান্য পায়নি। তাই বিষয়টি নীতিনির্ধারণী মহলে কার্যকর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি, ফলে তারা অধিকার বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। যদিও আমাদের সংবিধানের ১৪, ১৫, ১৭, ২৮, ৩৪ ও ৩৬ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে গৃহশ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত আছে। কিন্তু শুধু গৃহশ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট কোন আইন বা নীতিমালা নেই। শ্রমিকদের অধিকার বিষয়ক শ্রম আইন, যা ২০০৬ সালে প্রনীত হযেছে, সেখানেও গৃহশ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। এমন কি গৃহশ্রমিকদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়নি। ফলে তারা কর্মক্ষেত্রে নানা রকম অনিয়ম, নিপীড়ন, নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার হলেও তার কোন সঠিক প্রতিকার পায় না। ১৯৬১ সালে গৃহশ্রমিকদের রেজিষ্ট্রেশন সংক্রান্ত একটি অর্ডিন্যান্স প্রনীত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে এবং সরকারের উদ্যোগের অভাবে তার সুফল থেকে গৃহশ্রমিকেরা বঞ্চিত হয়েছে। তাছাড়া, সরকার ২০১০ সালে গৃহশ্রমিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালার খসড়া প্রনয়ন করলেও এখন তা চুড়ান্ত করেনি। তাই যত দ্রুত সম্ভব গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের জন্য প্রণীত খসড়া নীতিমালার অনুমোদন এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। গৃহশ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে আইএলও কনভেনশন ১৮৯ একটি আন্তর্জাতিক দলিল। এ কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের এটা অনুমোদন ও অনুসরণ এবং নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। শুধু অনুমোদন আর প্রনয়ন নয়, এই কনভেনশনে গৃহশ্রমিকদের যে সকল অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে তা নিশ্চিত করতে সরকারের অতি সত্ত্বর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। লেখকঃ প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব, জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ 20 Nov 2012 06:21:22 AM Tuesday
|
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com সর্বশেষ ২৪
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খবর
|
||||||||||||
| |||||||||||||
| |||||||||||||