আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

আদালত অবমাননা

বিচারকের মনোভাব ও প্রাসঙ্গিক কথা

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক


আঠারো শতকের প্রথম ভাগে মহামান্য বিচারপতি Lord Robertson বলেছিলেন in the absence of immunity, no man but a beggar or a fool would be a judge. কাজেই কোনো সন্দেহ নেই রাষ্ট্রের আদালত ও বিচার বিভাগ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন বিষয়ে। তবে বিচারকদের মনে রাখতে হবে, তাঁদের দায়িত্ব কোনো মামুলি দায়িত্ব নয় বরং গুরু দায়িত্ব।

বিচারকের কাজের সঙ্গে চিকিৎসকের কাজের তুলনা করলে ভুল হবে না। ২০০৭ সালে মহামান্য হাইকোর্ট আদালত অবমাননা আইনের মামলায় রায় প্রদানকালে বলেন, প্রতিটি চিকিৎসক জীবন্ত মানুষের হৃদয়ে, মস্তকে বা শরীরের অন্যান্য বিশেষ অপরিহার্য ও সংবেদনশীল অঙ্গে অপারেশন করার সময় তার সম্পূর্ণ মনোযোগ শুধু অপারেশনে নিয়োজিত করে থাকেন। কেননা তিনি জানেন তার মনোযোগের সমান্যতম বিঘ্ন ঘটলে রোগীর প্রাণহানি ঘটতে পারে।

যদি কোনো কারণে সে চিকিৎসক সমালোচনার সম্মুখীন হন কিংবা ভীত হয়ে যান তবে তার পক্ষে যেমন অপারেশন করা দুরূহ হয়ে পড়বে ঠিক তেমনি বিজ্ঞ বিচারকরা যদি বিচার বিভাগ স্বাধীনতার নামে উদাসীন হয়ে পড়েন তা হলে বিচারকার্য অবিচারে পর্যবসিত হতে পারে।

ফলাফল হিসেবে বিচারক সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলেও সুদূর প্রসারিভাবে রাষ্ট্রের আপামর জনসাধারণ অপরিসীম ক্ষতির স্বীকার হতে পারেন।

সে দিক বিবেচনায় কোনো বিচারক সম্পর্কে কোনো প্রকারের অভিযোগ সৃষ্টি হলে প্রথমে তাকে সে অভিযোগ সম্পর্কে জ্ঞাত করা অপরিহার্য। পরবর্তী সময়ে তার ঊর্ধ্বতন নিয়ন্ত্রণকারী মহামান্য বিচারক মহোদয়কে বিষয়টি জ্ঞাত করা দরকার। যদি প্রয়োজন হয় তবে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতির গোচরীভূত করা যেতে পারে। কারণ, কোনো অসৎ বিচারককে কোনো পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগে নিয়োজিত রাখা উচিত নয়।

১৯৮৫ সালে হাইকোর্ট অব কেরেলা বনাম প্রিতিশ নন্দি (ক্রিলজা-১০৬৩) মামলায় মহামান্য বিচারপতি বলেন, বিচারকের বদান্যতা এতখানি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে না যে, সে কথা ও কার্যকে উৎসাহিত করবে যা জনসাধারণের বিচার প্রণালীর প্রতি আস্থা নষ্ট করবে, কোনো রকমের অনুগ্রহ বা ভীতি ছাড়া তাদের দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে।

মুক্ত সমালোচনায় সাংবিধানিক মূল্যবোধ ও অর্পিত ভূমিকা রাষ্ট্রের স্বীকার করে নিতে হবে। মন্তব্য, সমালোচনা, তদন্ত ও গ্রহণের যুগে বিচার বিভাগ যৌক্তিক ও অনিষ্টবিহীন সমালোচনার হাত থেকে নিরঙ্কুশভাবে অব্যাহতি দাবি করতে পারে না। কিন্তু সমালোচনাটি শোভন ভাষায় নিরপেক্ষ, অনুভূতিপূর্ণ, সঠিক ও যথাযথ হতে হবে।

রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে আদালতের রায়ের গঠনমূলক সমালোচনা করার। রায়ের সমালোচনা হতে কোনো দোষ নেই কিন্তু যে বিচারক সে রায় প্রদান করেছেন তাকে তার রায়ের জন্য ব্যক্তিগতভাবে সমালোচনা বা কোনো প্রকারের আক্রমণ করা যাবে না। যদি কোনো রাষ্ট্রে সে রকমটা হতে থাকে তবে সে রাষ্ট্রের বিচার প্রতিষ্ঠান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে ও গণতান্ত্রিক ধারা হুমকির মুখে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

বিচারকরা যে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তা কখনও নয় তবে তার দায়বদ্ধতা বা সে সব সমালোচনার ধরন ও প্রকৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। বিচারকের রায়ে যদি কোনো ব্যক্তি সন্তুষ্ট না হয় এবং সে যদি মনে করে তবে সে ন্যায়বিচারের প্রাপ্তির জন্য উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবে। কাজেই আমাদের উচিত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

ভুলে গেলে চলবে না একজন বিচারক যদি তার বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভীক না হতে পারেন ও প্রদত্ত রায় সম্পর্কে যদি উদ্বিগ্ন থাকেন বা প্রচারিত কোনো সংবাদ সম্পর্কে ভীত হয়ে যান তাহলে তিনি ন্যায়বিচার কিংবা স্বাধীনভাবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে কুণ্ঠাবোধ করতে পারেন।

যদি সে রকমটা হতে থাকে তবে পরিশেষে বিচার প্রক্রিয়ায় ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্থ হবে। ফলে দেশবাসী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বিচারপতিদের সাহস থাকতে হবে, তবেই আমাদের দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাবে। পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ আরোপ সাপেক্ষে সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু ক্ষমতাশীলরা কখনই `যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধের ধার ধারে না।

নিজেদের পছন্দের ব্যত্যয় ঘটলেই বেআইনি বল প্রয়োগ করে কিংবা প্রি-সেন্সরশিপ করে কিংবা টকশোর অতিথি কারা হবে তাদের নামের ফর্দ ঝুলিয়ে দেয়; আর দোহাই টানে ৩৯ অনুচ্ছেদের ব্যতিক্রমের। কিন্তু কখনই সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে না যে, খবরটি দ্বারা রাষ্ট্র কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলো।

আরো রয়েছে একদিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অন্যদিকে আদালত অবমাননার খড়গ। বর্তমান সময়ে সংবাদকর্মীদের জন্য সবচেয়ে ভীতিকর হলো আদালত সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা বা সংবাদ প্রচার করা। কারণ কী করলে আদালত অবমাননা হয় আর কী করলে হয় না, তা একমাত্র আদালত ছাড়া আর কেউ জানে না।

১৯২৬ সালের অপূর্ণ আইন দিয়ে বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আদালত অবমাননা এক ধোঁয়াশা। অথচ নজিরহীনভাবে আপিল বিভাগের বিচারের মাধ্যমে একজন সম্পাদক এর দায়ে জেল খেটেছেন।

আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের রোষানলেই মাঝে মধ্যে পড়ে, যদি তাদের স্বার্থহানিকর (অথচ নিরেট সত্য ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট) কোনোকিছু প্রকাশিত হয়। সংবাদমাধ্যম তখন তাদের শত্রু হয়ে ওঠে এবং নানা পন্থায় (বিজ্ঞাপন বন্ধসহ) তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। সামরিক শক্তিও কখনো কখনো (বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়) এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

লেখক: সম্পাদক-প্রকাশক সাপ্তাহিক ‘সময়ের দিগন্ত’ ও আইনজীবী জজ কোর্ট, কুষ্টিয়া।

26 Nov 2012   07:40:04 PM   Monday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান