আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

রিমান্ডের নামই কি সুশাসন!

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক


১৯১৮ সালের ‘জোহরা’ উপন্যাসে পুলিশি তল্লাশির শিকার গ্রামের অবস্থা বর্ণনা করে লেখক মোজাম্মেল হক লিখেছিলেন ‘রমণীরা যে যেখানে ছিল, হাঁপাইতে হাঁপাইতে দৌড়াইয়া গিয়া ঘরের কোণে লুকাইল, বালক-বালিকারা খেলা ছাড়িয়া নিভৃতে পালাইল। পুরুষদের মধ্যেও কেহ কেহ ছলছুতায় অলক্ষ্যে গা ঢাকা দিল। একি বিপরীত ভাব? যাহারা শান্তি রক্ষাকর্তা, অভয়দাতা, অনিষ্ট নিবারক, তাহাদের দেখিয়া লোকে ভয়ে বিহ্বল কেন?’ লেখক মোজাম্মেল হকের প্রশ্ন; পুলিশ, ‘যাহারা শান্তিকর্তা... তাহাদের দেখিয়া লোকে বিহ্বল কেন?’

এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে বলতে হয়, ১৮৯৮ থেকে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি। এখনো পুলিশের ভয়ে অমুক গ্রামবাসী ঘরছাড়া এ রকম খবর দৈনিকগুলোতে আসে। হয়তো আপনার পাড়ার পরিচিত পড়ুয়া সুবোধ ছেলেটি একদিন দেখছেন পুলিশের হাতকড়া হাতে। পুলিশের অভিযোগ, ‘তল্লাশি চালিয়ে কিংবা ৫৪ ধারায় সন্দেহজনক গ্রেফতার করে তার কাছে অবৈধ অস্ত্র পাওয়া গেছে।’

‘ঘরছাড়া গ্রামবাসী’ এবং ‘সুবোধ ছেলেটি’ পরে ‘রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার’ আসলে পুলিশের কার্যত বেআইনি তল্লাশি ও গ্রেফতারের  শিকার ।

১৭৫৭ সালে বাংলার ক্ষমতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসীন হয়ে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন করে জমিদারি প্রথা প্রচলন করে।

জমিদাররা প্রকারান্তরে খাজনা আদায় ও তার অংশ কোম্পানিকে প্রদানের দায়িত্ব ছাড়া তার জমিদারির হর্তাকর্তা শাসক হিসেবে উদ্ভূত হন।

১৮৫৭ সালে সিপাহী যুদ্ধের পর খোদ ব্রিটিশরাজ ভারত উপমহাদেশের ক্ষমতাভার গ্রহণ করেন। অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ১৮৬২ সালে পুলিশ বাহিনী সৃষ্টি করে পুলিশের বিধি ও কার্যপ্রণালী ধারা প্রণয়ন করা হয়।

ফলে জমিদারদের ক্ষমতায় কিছুটা ভাটা পড়লেও পুলিশের সহায়তায় তাদের আধিপত্য পূর্ণ মাত্রায়ই বজায় রাখতে সক্ষম হন।

প্রজাদের স্বার্থ কিছুটা সংরক্ষণের প্রচেষ্টায় ব্রিটিশরাজ ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল টেন্যান্সী অ্যাক্ট (যা অনেকটা ‘সাদা’ বা ‘জনকল্যাণ’ আইন বলে অভিহিত হতে পারে) পাস করেন। ফলে জমিদাররা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ও ব্রিটিশরাজের কাছে তাদের অসুবিধার কথা তুলে ধরেন।

খাজনা আদায়ের এবং প্রদেয় তদাংশ ব্রিটিশরাজকে পরিশোধ করার দায়িত্ব জমিদারদের থাকলেও খাজনা অনাদায়ের কারণে কাউকে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা জমিদারদের নেই।

এ ধরনের নানা অসুবিধার কথা ভেবে এবং ঔপনিবেশিক শাসন পাকাপোক্ত ও চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরাজ ১৮৯৮ সালে ফৌজদারি আইন (অ্যাক্ট নং ৫, যা সিআরপিসি নামে পরিচিত), যা মূলত একটি কালো আইন বা আমার জানা মতে এদেশে প্রথম কালো আইন বলে অভিহিত হতে পারে, পাস করেন।

উক্ত আইনের ৫৪ ধারায় পুলিশকে ঢালাওভাবে কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া বা কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত সন্দেহবশে কাউকে আদালতগ্রাহ্য অপরাধের জন্য গ্রেফতার করতে পারে সে ক্ষমতা দেয়া হয়।

বলা বাহুল্য যে, সিআরপিসি ১৮৯৮-এর শতবর্ষ আগে জন্ম হয়েছিল জনকল্যাণে নয়, বরং নির্দয় একটি আইন হিসেবে ঔপনিবেশিকতার স্বার্থসিদ্ধির প্রেক্ষাপটে। শতবর্ষ হলেও এই নির্দয় একটি আইনের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এ পর্যায়ে খোদ যুক্তরাজ্যে সাংবিধানিক আইনের বর্তমান হাল-হকিকত সামান্য আলোচনা করা যেতে পারে। The Police and Criminal Evidence Act. (PACE) সেখানে প্রবর্তিত হয়েছে ১৯৮৪ সালে। উক্ত PACE -এর সেকশন ৫৬ অনুযায়ী পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে আটক করার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই তার আত্মীয়দের কাউকে আটকের কথা জানাবে।

শুধু গুরুতর অপরাধের জন্যই এই ৩৬ ঘণ্টার সময়সীমা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। PACE -এর সেকশন ৫৬তে একজন আটক ব্যক্তিকে যে কোনো সময়ে তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার অধিকার দিয়েছে।

তাকে আইনজীবী দেয়া সম্ভব না হলে নিজ খরচে রাষ্ট্র একজন কর্তব্যরত আইনজীবীর ব্যবস্থা করবে। উক্ত আইনের সেকশন ৭৬-এ কোনো স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যকে মামলার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের বিধান থাকলেও শর্ত রয়েছে যে, উক্ত বিবৃতি বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে এবং কোনো জুলুম করে নেয়া হয়নি, তা Prosecution-কেই প্রমাণ করতে হবে। অনুরূপভাবে PACE -এর সেকশন ৭৮ ফৌজদারি আদালতকে PACE-এর বিধানবহির্ভূত গৃহীত কোনো প্রমাণ নাকচ করে দেয়ার ক্ষমতা অর্পণ করেছে। পুলিশ কোনো আটক ব্যক্তিকে জানিয়ে দেবে যে, তার আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ বা সাক্ষাতের সুযোগ রয়েছে এবং প্রয়োজনে বিনা ব্যয়ে সরকারি আইনজীবীর সাক্ষাত ও পরামর্শ নিতে পারেন।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন অদ্যাবধি আর বাতিল হলো না। হয়নি ১৮৯৮-এর কালো আইনটির যুক্তিযুক্ত সংশোধন।

ধারাবাহিকতার ক্রমানুসারে কোনো সরকারই তেমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে জনগণের চাহিদার আলোকে গণতন্ত্র মূল্যায়িত না হয়ে কেবল ‘কাগুজে বাঘসম’ গণতন্ত্রই রয়ে গেল।

বরং রিমান্ডের চাহিদা ও তার অপব্যবহার ধারাবাহিকতায় সব সরকারের আমলেই ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। তাও আবার জ্যামিতিক অগ্রগতি হারে। অংকশাস্ত্রের অগ্রগতির হারে নয়। কমার কোনো লক্ষণ বা বালাই নেই।

‘হাওআই’তে বর্ণাক্ষরের সংখ্যা কম হওয়ায় অনেক সময় একটি শব্দ দিয়ে কাল, সময়, পরিবেশ ও উপলক্ষ অনুযায়ী বহুবিধ অর্থ বুঝিয়ে থাকে। যেমন ‘আলুহা’ দিয়ে শুভসকাল, শুভসন্ধ্যা, বিদায়, ভালোবাসা, দয়া, শুভেচ্ছা এবং শুভ বিদায় এরূপ অনেক কিছু বুঝানো সম্ভব।

আমাদের দেশে বলাবাহুল্য, ‘রিমান্ড’ দিয়ে সুশাসনের অজুহাতে প্রশাসনের দমন, নিপীড়ন, অসত্য সাক্ষ্য গ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অপব্যবহার যখন-তখন ও যত্রতত্র পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।

দেশে আজ দরিদ্র ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য নাভিশ্বাস। তারা আজ নিষ্কৃতি চান বলেই খোলা মনে নিজেদের অজান্তেই বলে ফেলেন তাহলে কি ‘রিমান্ডের নামই সুশাসন’!

লেখক: সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও অ্যাডভোকেট জজ কোর্ট, কুষ্টিয়া। E-mail: seraj.pramanik@gmail.com

07 Jan 2013   07:39:11 PM   Monday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান