আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং দুর্গাপূজা

অ্যাডভোকেট এ.এম. জিয়া হাবীব আহ্সান


কয়েক বছর আগে ভারতের কোলকাতায় স্বপরিবারে দূর্গোৎসব দেখার সুযোগ হয়েছিল। লম্বা লাইন ধরে সু-শৃংখলভাবে পূজার্থীরা পূজো-মন্ডপ পরিদর্শন করছিলেন।

কোলকাতা নিউমার্কেটের নিকটেই দেখলাম একটা মন্ডপ। কৃত্রিম পাহাড়ের বিশাল গুহার ভেতর দেবী দূর্গার অর্চ্চনা চলছে। শারদীয় দূর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে নামী দামী কণ্ঠশিল্পীরা নতুন গান মার্কেটে ছাড়েন। যা মন্ডপ গুলোতে বাজানো হয়। আমার প্রিয় শিল্পী কিশোর ও ভূপেনের কন্ঠেও কিছু গান শুনলাম।

আমাদের দেশের সনাতনী বন্ধুদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও উৎসব আনন্দে বেশ মিল আছে। অমিল তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না। ছোটবেলা থেকে বাসার পাশে জে,এম,সেন হল, বৃন্দাবন আখড়া, হেমসেন লেন, রাজাপুর লেন, আমাদের স্কুলের পাশে হাজারী লেন, প্রভৃতি স্থানে পূজো মন্ডপ গুলোতে যে আনন্দের ঢেউ দেখেছি তা অন্য কোথাও তেমন চোখে পড়েনি।

আমার শ্রদ্ধেয় স্কুল শিক্ষক হৃদয় রঞ্জল পাল স্যার বলেছিলেন, ‘‘দূর্গাপূজা শুধু আনন্দ লাভের জন্য নয়, কর্মক্লান্ত বাঙালী হিন্দুদের ক্লান্তি ছেড়ে উদ্দীপনায় মেতে উঠার দিন।

দূর্গাপূজার কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। বৈদেশিক শক্তির শাসন ও শোষণের আমলে বাঙালী হিন্দু যখন হীনবল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন জাতীয় জীবনে উৎসাহ, প্রেরণা ও শক্তি সঞ্চয়ের জন্য মহাশক্তি দূর্গাদেবীর আরাধনা আরম্ভ করে”।

মানবাধিকার আইনজীবী এডভোকেট সুনীল সরকার বলেন, “প্রায় ৩শ বছর আগে এ অঞ্চলে দুর্গাপূজার প্রচলন হয়। একসময় কেবল দুর্গাপূজা জমিদারদের বাড়ীর অন্দর মহলে অনুষ্ঠিত হতো। প্রজারা ছাগল, নারিকেল, ইক্ষু ইত্যাদি নিয়ে জমিদারকে তুষ্ট করতে আসতো এবং দূর থেকে পূজা উপভোগ করতো। পরবর্তীকালে উক্ত পূজা সার্বজনীন রূপ নেয়। হিন্দু ভাইদের সাথে মুসলিম নর নারীরাও পূজা দেখতে আসে। সনাতনী সমাজের পূজা হলেও মুসলিম ভাইয়েরাও হিন্দু বন্ধুদের সাথে এই আনন্দে শরিক হন। তখন থেকে দূর্গাপূজা এক নতুন তাৎপর্য লাভ করে’’।

আমার শ্রদ্ধেয় ইংরেজী শিক্ষক প্রফেসর রনজিত চক্রবর্তী বলতেন, “দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনই হচ্ছে দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য”।

এটা হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব, যা এ দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি বিরাট স্থান দখল করে আছে।

পূজার রীতি নিয়ম অনুযায়ী ৩ দিন ব্যাপী উপবাস, দেবদেবীর অর্চ্চনা ও মহোৎসব চালু থাকে। পাঁচ দিন ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর দিনগুলো বিশেষ তাৎপর্যের সঙ্গে বাংলাদেশে উৎযাপিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এর প্রস্তুতি চলতে থাকে।

জনসাধারণ ঢাকের শব্দে মেতে ওঠেন উচ্ছ্বল আনন্দে। দূর্গা হচ্ছেন শক্তির দেবী আর সরস্বতী হচ্ছেন বিদ্যাদেবী এবং লক্ষ্মী হচ্ছেন ধন-সম্পত্তির দেবী।

হিন্দু ভাইবোনদের বিশ্বাস দূর্গাদেবী যদি নৌকায় চড়ে আসেন তাহলে দেশে খাদ্য শস্যের পূর্ণতা আসে, যদি দোলায় আসেন তাহলে প্রাকৃতিক দূর্যোগের সম্ভাবনা থাকে। এবার দেবী আসবেন গজে (হাতী) করে। হাতীতে চড়ে দেবী তার চার ছেলেমেয়ে যথাক্রমে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে নিয়ে বাপের বাড়ী আসবেন।

এ উপলক্ষ্যে পূজা অনুষ্ঠিত হবে বলে এসময় অনেক বাঙালী বধূ বাপের বাড়ী নাইওর যায়। সেখানে বিভিন্ন মন্ডপ ঘরে ঘুরে দেবী দর্শন করে ও আশীর্বাদ গ্রহণ করে। দূর্গাপূজা উপলক্ষে ধনী দরিদ্র সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন জামা-কাপড় পরিধান করে। পূজা উপলক্ষে নারিকেলের নাড়–, লুচি, মিষ্টি, পায়েশ, সন্দেশ, তরকারী ইত্যাদি মজাদার রান্না করা হয়।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় মন্ডপে মন্ডপে প্রসাদ নিতে ভিড় জমায় অগণিত হিন্দু নারী পুরুষ। পূজা মন্ডপের সংখ্যা বাড়ছে প্রতি বছর।

প্রতিমার কারিগর হচ্ছেন পাল সম্প্রদায়ের লোকজন। তাদের হাতের ছোঁয়ায় দেবী চমৎকার রূপ লাভ করেন।

পূজামন্ডপ গুলোতে এ সময় কাজ করতে বিক্রমপুর, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার প্রখ্যাত কারিগর ও প্রতিমা শিল্পিরা ঢাকা-চট্টগ্রামে এসে থাকেন। তাদের নিয়ে চড়ামূল্যে এ সময় এক রকম কাড়াকাড়ি হয়ে থাকে।

মন্ডপ গুলোতে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে মজবুত সাম্প্রাদিয়ক সম্প্রীতি বিরাজমান। আমরা মনে করি বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক সুন্দর সমাজ, তাকে একটি ফুলের বাগানের সাথে তুলনা করা যায়।

একটি বাগানে যেমন গোলাপ, টগর, বেলী, হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা, জবা, শিউলী, পলাশ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরণের ফুল পাশাপাশি অবস্থান করে, তেমনি এ দেশে যুগ যুগ ধরে একই বাগানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, উপজাতি, অ-উপজাতীসহ নানা ধর্ম নানা মতের লোকজনের বসবাস।

এ জাতী সবসময়েই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। যারা এ সম্প্রীতি চায় না সেই সব ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের সব সময় সতর্ক পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা তারা ধর্ম, দেশ, জাতি ও মানবতার শত্র“।

দুর্গাপূজার সূচনাতে যেমন আনন্দের বন্যা বয়ে যায় তেমনি সমাপ্তিতে শোক আর বেদনার অশ্রু বন্যায় বিসর্জিত হয় দুর্গাদেবী।

আমরা ছেলেবেলায় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী যেসব পুকুরে বিসর্জন অনুষ্ঠান দেখতে সমবেত হতাম সেগুলো আজ সবই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দেওয়ানজী পুকুর, রথের পুকুর, হাজারী দীঘি, রাজা পুকুর এর আজ কোন চিহ্নই নেই। এসব হারিয়ে গেছে ইট সুড়কির অট্টলিকার তলে।

রানীর দীঘি, আসকার দীঘি, আগ্রাবাদের ডেবায় এখন তেমন উৎসব দেখা যায় না। চট্টগ্রাম শহরের এখন প্রায় সব দেবীকে বিসর্জন দিতে হয় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে।

জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও উন্নয়নের স্বার্থে আমাদের সমাজের সাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে হবে। সকলকে শারদীয় শুভেচ্ছা।

লেখক আইনজীবী, কলামিস্ট, ও  মানবাধিকার কর্মী।

20 Oct 2012   02:09:22 AM   Saturday
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

সর্বশেষ ২৪

প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান