আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বৈধতা কি চ্যালেঞ্জযোগ্য ?

ইমরান আজাদ


সম্প্রতি বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় দ- মওকুফ পাওয়া এক ব্যক্তিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ প্রদানের মধ্য দিয়ে নিঃসন্দেহে একটি নতুন আইনি সম্ভাবনার দ¦ার উন্মোচন করেছেন । সাংবিধানিক আইনের খুঁটি-নাটি নিয়ে যারা এতদিন বিশাল বিশাল গবেষণা কর্মযজ্ঞে লিপ্ত ছিলেন, তাঁদেরও দৃষ্টিগোচর হয়নি এতবড় শুভঙ্করের ফাঁকি!

তাই তো বলি আমাদের একটা সুপ্রিম কোর্ট ছিল বলে রক্ষা, নচেৎ আরো কী কী যে হত (আর ভবিষ্যতে যে কী কী হবে)- উপরওয়ালাই ভালো জানেন । 

বলা হচ্ছে, এটাই সম্ভবত প্রথম যুগান্তকারী রায়, যেখানে প্রমাণিত হয়েছে যে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তে আদালতের নজরদারি আর রহিত করা যাবে না । অর্থ্যাৎ গত ৪০ বছর ধরে আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে ঘোর অমানিশায় আবদ্ধ করে একটা ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে ৪৯ অনুচ্ছেদের আওতায় নেওয়া সিদ্ধান্ত মহামান্য আদালতের ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

কিন্তু যদি এটা সত্য হয় বা অন্য কথায় সম্প্রতি আদালতের দেওয়া রায় যুগান্তকারী হয়, তবে সুপ্রিম ’ল অব দ্যা ল্যান্ড- যাকে আমরা বলি সংবিধান, তার ভাষ্যটাই বা কী ? সেটাও তো জানা ও বুঝা দরকার ।

সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি কোন আদালত, ট্রাইবুনাল বা অন্য কোন কতর্ৃৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যে-কোন দ-ের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর এবং যে-কোন দ- মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করতে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। 

আর এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯ বছর আগে ক´বাজারের কোন এক ফৌজদারি মামলায় দ-িত এক ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন, যেমনটা ইদানিং করেছিলেন আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি লক্ষ্মীপুরের আওয়ামী লীগের নেতা তাহের তনয়ের ক্ষেত্রে বা বিএনপি আমলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ফাঁসির আসামি ঝিন্টুকে ক্ষমা প্রদর্শন করে। 

লক্ষণীয় বিষয় হলো, ক´বাজারের ওই দ-িত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দ- মওকুফের সময় আইনের দৃষ্টিতে পলাতক ছিলেন এবং একই সাথে রাষ্ট্রপতির কাছে সেই তথ্য গোপন করা হয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি মহানুভব রাষ্ট্রপতির এক পশলা ক্ষমার পরশ পান !

যদিও ৪৯ অনুচ্ছেদে দ-িত ব্যক্তির রাষ্ট্রপতি কর্তৃক দ- মওকুফের সময় পলাতক থাকা বা না থাকার ব্যাপারে কোন কিছু বলা নাই, তবুও যেহেতু রাষ্ট্রপতির কাছে তথ্য গোপন করে দন্ড মওকুফ করা হয়েছিল- তা থেকে অবশ্যই এটা অনুমান করা যায় যে আসামি নিজেকে পলাতক হিসেবে প্রমাণ করে রাষ্ট্রপতির কাছে তথ্য গোপন করে পরখ করে দেখতে চেয়েছিল যে, রাষ্ট্রপতি আসলেই তার দ- মওকুফ করে কি না । 

এর মাধ্যমে যা প্রমাণিত হলো, তা হলো ৪৯ অনুচ্ছেদ সত্যিকার অর্থেই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়- এর কিছু ফাঁকফোঁকড় আছে । 
আজ দীর্ঘ ১৯ বছর পর তা ধরা পড়লো, আর এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার।

এ তো গেল ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের অধিকারের আইনি ও বাস্তবিক আলোচনা । এবার সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে একটু চোখ বুলানো যাক। 

৫১ অনুচ্ছেদ মূলত কয়েকটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তির বিষয়টি স্পষ্ট করে। কিন্তু যখন ৪৯ অনুচ্ছেদ এবং ৫১ অনুচ্ছেদ আমরা একসাথে মানতে যাই তখনই একটা সাংবিধানিক সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। 

৫১(১) অনুচ্ছেদ বলছে যে, রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব পালনকালে বা অনুরূপ বিবেচনায় কোন কার্য করে থাকলে বা না করে থাকলে সেইজন্য তাঁকে কোন আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। এর মানে কী এটা দাঁড়ায় যে, দায়িত্বে থাকাবস্থায় রাষ্ট্রপতি কোন কিছু করে থাকলে বা না করে থাকলে, দায়িত্বে থাকাবস্থায় তাঁর বিরূদ্ধে আদালতে জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলা যাবে না, না কী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব অবসানে সেই প্রশ্ন তুলতে হবে অথবা এর বিপরীতটা?এরূপ হওয়ার কারণ কী ? এটার কারণ মূলত ৫১ অনুচ্ছেদের ২য় ধারা, যার ভাষ্য হলো রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাঁর বিরূদ্ধে কোন আদালতে কোন প্রকার ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাবে না এবং তাঁর গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য কোন আদালত হতে পরোয়ানা জারি করা যাবে না। 

এই ৫১(২) অনুচ্ছেদ নিয়ে দুটি বিখ্যাত মামলায় (খন্দকার মোস্তাক আহমেদ বনাম বাংলাদেশ, ১৯৮১, বি.এল.ডি. এইচ.সি.ডি. পৃ. ৩৩৩ এবং এইচ এম এরশাদ বনাম বাংলাদেশ, ১৯৯১, বি.এল.ডি. এ.ডি. পৃ. ৫৫)- বলা হয় যে রাষ্ট্রপতির এই দায়মুক্তির বিষয়টি শুধু তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে প্রযোজ্য, দায়িত্ব অবসানে এই দায়মুক্তির সুযোগ আর চলমান থাকে না।

মূলত ৫১(২) অনুচ্ছেদকে এই বিষয়টিই ৫১(১) অনুচ্ছেদ থেকে ভিন্ন রূপ দিয়েছে । অর্থ্যাৎ ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে দায়িত্বে থাকাবস্থায় হোক আর দায়িত্ব অবসানে হোক, কখনোই দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রপতি কী করেছে বা কী করে নাই-  তা সম্পর্কে কোন আদালতে তিনি জবাবদিহি করতে বাধ্য নয় । কিন্তু যাঁরা বলছেন আর বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বৈধতা সংক্রান্ত রায়টি যুগান্তকারী, এক বিরাট বিচারিক অগ্রগতি অথবা ফাঁসির আসামি ঝিন্টু এবং লক্ষ্মীপুরের আওয়ামী লীগের নেতা আবু তাহেরের ছেলের দ- মওকুফের বৈধতা সন্দেহাতীতভাবে আদালতে এখন চ্যালেঞ্জযোগ্য- তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই কীভাবে চ্যালেঞ্জ করবেন, ৫১(১) অনুচ্ছেদে তো সুস্পষ্ট বাঁধা-নিষেধ আছে।

আর সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বৈধতা সংক্রান্ত রায়টির প্রেক্ষাপট, ঝিন্টু ও তাহেরের ছেলের দ- মওকুফের প্রেক্ষাপট থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সহজ ভাষায় সাংবিধানিক দিক থেকেও সমাধানের দ্বার রুদ্ধ, তবে তা আপেক্ষিক, আর রাজনৈতিক দিক থেকে তা চিরকালের জন্য রুদ্ধ। এমন এক সাংবিধানিক সংকট কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চিত তীব্র  সংকট থেকে অবশ্যই আশু পরিত্রাণ জরুরি ।  

এবার বিশ্বের অন্যান্য কয়েকটি দেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির এই দ- মওকুফের ক্ষমতার কী অবস্থা তা পর্যালোচনা করা যাক। জামার্নির সংবিধানের ৬০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতা অন্য কোন কতর্ৃৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন ।

অর্থ্যাৎ রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতা প্রয়োগে একক ব্যক্তি নন । আবার ভারতীয় সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদে যদিও রাষ্ট্রপতিকে দ- মওকুফের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা প্রয়োগ করার ক্ষেত্র সুনির্দিষ্ট এবং এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে অন্যান্য কতর্ৃৃপক্ষের (যেমন: কোর্ট মার্শাল ও গভর্নর) সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে ।

একইভাবে আরজেন্টিনায় এই ক্ষমতার প্রয়োগ কিছু কতর্ৃৃপক্ষের এখতিয়ার সাপেক্ষ ব্যাপার, বেশিরভাগ দেশে রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো অবারিত নয়।

বাংলাদেশেও কিন্তু রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর একক কোন অধিকার নয়, যদি আমরা ভালো করে ৪৮(৩) অনুচ্ছেদটি বিশ্লেষণ করি। সেখানেই স্পষ্ট করে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি কেবল দুটি ক্ষেত্র ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে (এই দ- মওকুফের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও) তাঁর দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুসারে কাজ করতে বাধ্য।

আবার এই একই অনুচ্ছেদ আদালতের ক্ষমতা এই বলে সীমিত করছে যে, প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আদৌ কোন পরামর্শদান করেছেন কিনা এবং করে থাকলে কি পরামর্শদান করেছেন- সেই প্রশ্নের তদন্ত আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত। এ যেন ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থা !

ইদানিং রাষ্ট্রপতির ক্ষমার এখতিয়ারের অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে । আর এমনি এক প্রেক্ষাপটে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি শেখ মো: জাকির হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৫ এপ্রিল রায়ে ১৯ বছর আগে তথ্য গোপন করে রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে পাওয়া ক্ষমা বাতিল করে দিয়ে দ-িতকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো ৪৯ অনুচ্ছেদকে যথেচ্ছা ব্যবহার করা যায় না এবং করা উচিতও না। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রপতির ওপর বর্তায়, তেমনি সাংবিধানিক অন্তর্নিহিত শক্তিকেও সদর্পে উচ্চাসীন করাও তাঁর কর্তব্য। যখনই এর ব্যত্যয় ঘটে তখনই আমাদের শেষ ভরসাস্থল মহামান্য আদালত।  

সবশেষে গত ৪০ বছরে এরূপ কতজন ক্ষমা পেয়েছেন এবং তার নথি ব্যবস্থাপনার কী হাল, তা সরকারের কাছে দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে জানতে চাইতেই পারি- তাই না ?

লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ।

15 May 2012   06:17:37 PM   Tuesday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান