অ্যাডভোকেট এ.এম. জিয়া হাবীব আহসান " />

আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

ভাষার অধিকার

আইন-আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার

অ্যাডভোকেট এ.এম. জিয়া হাবীব আহসান


প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি আসলে সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর সোচ্চার আওয়াজ শোনা যায়। কিন্তু ফেব্রয়ারি চলে গেলে সে আওয়াজ আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে যায়।

আইনের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আইন-আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলনের বিষয়ে আজ কয়েকটি কথা বলতে চাই। আমাদের আইন আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনে কোন আইনগত বাঁধা না থাকা সত্বেও এ কাজে আমরা এখনও পিছিয়ে আছি কেন? জার্মান, জাপান, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ড, চীন, রাশিয়া, সুইডেনসহ নানা দেশে তাদের মাতৃভাষায় বিদেশীদেরও কথা বলতে হয়।

তাদের ভাষা শিখে সেখানে যেতে হয় অথবা শেখার জন্য নির্দিষ্ট সময় দেয়া হয়। কিন্তু আমরা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েও সে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারলাম না। ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৫৭ ধারায় আদালতে সাক্ষীর জেরা, জবানবন্দী ইংরেজি ভাষায় অথবা ‘আদালতের ভাষায়’ লিপিবদ্ধ করতে সরকার নির্দেশ দিতে পারেন।

বৃটিশের গোলামী যুগে বাংলার প্রাদেশিক সরকার উক্ত ধারা মূলে ম্যাজিষ্ট্রেট ও দায়রা জজ আদালত সমূহে জেরা জবানবন্দী ইংরেজি ভাষায় লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলো। পাকিস্তান আমলেও তা বলবৎ থাকে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর বর্তমানেও এ ব্যাপারে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা বা বাধ্যবাধকতা না থাকায় আমাদের মাতৃভাষা বহু ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৩৫৭ ধারায় ফৌজদারী আদালতের রায় ‘আদালতের ভাষায়’ অথবা ইংরেজীতে লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ রয়েছে। হাইকোর্ট ব্যতীত অন্যান্য আদালতের ভাষা কী হবে তা ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৫৫৮ ধারা মতে সরকার নির্ধারণ করতে পারেন।

হাইকোর্টে সাক্ষীদের সাক্ষ্য কীভাবে গৃহীত হবে সে বিষয়ে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৬৫ ধারা মোতাবেক হাইকোর্টকে দেয়া হয়েছে। এ প্রকার বিধি প্রণয়নের জন্য হাইকোর্টের চুড়ান্ত এখতিয়ার রয়েছে (সূত্রঃ সিলেক্ট কমিটি রিপোর্ট, ১৯৬১)। ১৯০৮ সনে প্রণীত দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের ১৩৭ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যে পর্যন্ত সরকার অন্য নির্দেশ প্রদান না করেন সে পর্যন্ত হাইকোর্টের অধীনস্থ যে আদালতে যে ভাষা প্রচলিত আছে সে আদালতে সে ভাষাই প্রচলিত থাকবে।’’

সিভিল রুল্স এন্ড অর্ডারস (১ম খন্ড) এর ১১নং বিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মামলার পক্ষগণ আরজি, বর্ণনা, দরখাস্ত ইত্যাদি এবং এফিডেভিট ইংরেজি ভাষায় দাখিল করিবেন।’’ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচলন করতে হলে উক্ত আইন সমূহের পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন এবং প্রয়োজন মত নতুন আইন, বিধি ও বিজ্ঞপ্তি জারি করা আবশ্যক।

এরশাদ সরকারের আমলে বাংলায় আইন প্রণয়ন শুরু হয়। বর্তমানে পার্লামেন্টের আইন সমূহ বাংলায় পাশ হয়। সাথে সাথে এগুলোর ইংরেজি ভার্সনও প্রকাশ করা যেতে পারে। মহান ভাষাদিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করেন বিচারপতি এবাদুল হক।

এর পর বিচারপতি আব্দুস সালাম ও বিচারপতি খায়রুল হক বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করে উচ্চ আদালতে বাংলাভাষার মর্যাদাকে সু-উচ্চে তুলে ধরেন। উচ্চ আদালতে সর্বাধিক বাংলাভাষায় রায় দিয়ে অমর হয়ে আছেন চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান শ্রদ্ধেয় বিচারপতি আব্দুস সালাম মামুন। অন্যান্য বিচারপতিরা এ ধারাকে শাণিত করতে বিরাট অবদান রাখতে পারেন।

বর্তমানে আইন মন্ত্রনালয় বাংলাদেশ কোড এ ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় যুগপৎ আইন প্রকাশ করে মাতৃভাষায় আইন চর্চার পথকে অনেক সুগম করেছে। কিন্তু ‘ল জার্নাল সমূহ (ডি,এল,আর/ বি,এল,ডি/ ল ক্রনিক/ এম,এল,আর/ বি,এল,সি/ বি,এল,টি প্রভৃতি) এখনও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভার্সন পুরোপুরি চালু করতে পারে নি। ফলে মাতৃভাষায় আইন চর্চা চরমভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। বাংলা ভাষায় সকল আইন রচনা ও প্রকাশ করতে হবে।

ভালো ইংরেজি জানা অনেক সিনিয়র আইনজীবীকে দেখেছি যারা সুন্দর বাংলায় আর্জি/ জবাব লিখতে পারেন না। এটা বাংলার প্রতি অবহেলা ও উদাসিনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। অনেকে পাণ্ডিত্য জাহির করতে ইংরেজীর পাশাপাশি বাংলাকে গ্রহণ বা ইংরেজীর অধিক গুরুত্ব দিতে পারছেন না।

সাধু চলিতের মিশ্রনে লেখা আর্জি- জবাব দেখলে মাতৃভাষার প্রতি এত অবজ্ঞার কষ্ঠ সহ্য করা যায় না। বাংলা ভাষাকে বিশ্বের দরবারে সঠিক ভাবে তুলে ধরতে ইংরেজি জানা দরকার কিন্তু সর্বস্তরে মাতৃভাষাকে চালু করতে না পারলে বিশ্ববাসীরা এ ভাষাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে এগিয়ে আসবে না।

এখন থেকে বাংলায় গেজেট, রায়, রাষ্ট্রপতির আদেশ ইত্যাদি সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় প্রকাশ করে সাথে ইংরেজী ভার্সন প্রকাশ করা যেতে পারে। অতীতের সমস্ত গেজেট, রায় ও দেশি বিদেশি আইন বইয়ের বাংলা অনুবাদে আইন অঙ্গন সমৃদ্ধ করে দিতে হবে। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর নির্দেশ সম্বলিত এক বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়েছিল। এর পর অফিস আদালতে ব্যাপক সাড়া জাগে।

বর্তমানে নিম্ন আদালত সমূহে আরজি, বর্ণনা, দরখাস্ত, এফিডেফিট, হাজিরা ইত্যাদিতে বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। বিচারকরা অনেকেই বাংলায় আদেশ ও রায় প্রদান করছেন।

জেলা ও মহানগর আদালত সমূহও কিছু কিছু রায়, ডিক্রি, আদেশ বাংলায় দিচ্ছেন, যাদের সাধুবাদ জানানো যায়। বাংলা সাঁট লিপি বা ষ্টেনোর অভাবে এক সময় আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারে প্রধান বাঁধা ছিল। বর্তমানে সে বাধা দূর হওয়া সত্বেও মাতৃভাষায় উচ্চ আদালতে ব্যাপক রায় দেয়া হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধান বিচারপতির সুদৃষ্টি প্রত্যাশা করছি। আদালতে ব্যবহৃত ও বহুল প্রচলিত ফারসি ও ইংরেজি শব্দ সমূহের উদ্ভট বাংলা না করে সে গুলোকে চালু রেখে বাংলা অনুবাদ করা যেতে পারে। যেমন- এজাহার এজলাশ, পেশকার, সোলেনামা, নামজারী, জামিন, তলবানা, তপশীল, রিভিশন, হাজিরা, মুসাবিদা, এওয়াজ, মুনসী, সুরতহাল, আলামত ইত্যাদি শব্দ।

যেহেতু দীর্ঘ দিন ইংরেজি ভাষায় সবকিছু চালু ছিল, তাই আইন আদালতে দ্রুত বাংলা চালু এতো সহজ নয়। আইনজীবী, বিচারক, আদালত কর্মচারী, আইন শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষকগণের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠার মাধ্যমে আইন আদালতে মাতৃভাষা বাংলা চালু করা সম্ভব।

এজন্যে গত ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন পাশ হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বিচারক, আইনজীবী ও ভাষাবিদদের সমন্বয়ে এ ব্যাপারে একটি শক্তিশালী কমিটি করে আইন আদালতে বাংলা ভাষা চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলা চালু হোক ভাষার মাসে এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখকঃ আইনজীবী, কলামিষ্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।

12 Feb 2013   06:40:37 AM   Tuesday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান