আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

সাক্ষীর নিরাপত্তায় আইন জরুরি

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক


দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলায় খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। কারণ তাদের মামলায় সাক্ষীরা ভয়ে আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছে না। সাক্ষ্যর অভাবে রাষ্ট্রপক্ষও আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারছে না।

সাক্ষীর নিরাপত্তা না থাকায় তারা আদালতে আসেন না, কোনো সাক্ষ্যও প্রদান করেন না। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের কোনো মাথা ব্যাথাও নেই। সাক্ষ্য আইনের কোথাও সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিষয়ক কোনো আইন লেখা নেই। অথচ কোনো সাক্ষী মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে তার জন্য স্বতন্ত্র্যভাবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা যায়।

রিয়াজ সাহেব (ছদ্মনাম) নামে জনৈক ব্যক্তি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন। তিনি মামলার বাদী। ২০০৮ সালের ফেব্রয়ারী মাসে ভাই বাবুল আক্তার (ছদ্মনাম) খুন হন তার ব্যবসায়ী প্রতিপক্ষ মিরাজ হোসেনের (ছদ্মনাম) হাতে। থানায় তিনি এ হত্যা মামলাটি করেছিলেন।

রিয়াজ সাহেব ভাই হত্যার বিচারের দাবিতে আদালতের কাঠগড়ায় সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত। বিচারক কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সাক্ষীকে উদ্দেশ করে বললেন, `এত দিন কেন আসেননি? আপনাকে তো আদালতে আসার জন্য বারবার সমন দেওয়া হয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেওয়ার পরে আপনি এলেন কেন?` বাদী রিয়াজ বললেন, `স্যার, আমি তো কোনো সমন পাইনি।` বিচারক ধমক দিয়ে বললেন, ‘ভাই হত্যার বিচার চাইতে আদালতের সমন লাগে নাকি? নিজেই তো মামলার কী হলো তা জানার জন্য আদালতের বারান্দায় ঘুরঘুর করবেন।’ ধমক খেয়ে চুপ করে রইলেন রিয়াজ। আদালতের কাছে ক্ষমা চাইলেন। পরে তাঁর সাক্ষ্য নেয়া হয়।

সাক্ষ্য দেওয়া শেষ হলে রিয়াজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, এ মামলা দায়ের করায় আসামি একদিন দলবল নিয়ে তাঁর বাসায় গিয়ে হুমকি দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করতে বলেন। ভয়ে রিয়াজ কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন। আসামীদের অব্যাহত প্রাণনাশের হুমকিতে মামলা চলাকালে বাদী রিয়াজ আর আদালতে আসেননি কোন খোঁজ খবর নিতে।

জনৈক রমজান হোসেন (ছদ্মনাম) ২০০৭ সালে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতে সাক্ষ্য দিতে এসে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ২০০৫ সালের মার্চে একটি সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। একটি বাড়ি থেকে তখন পুলিশ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে।

পুলিশ তাকে ডেকে জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর নেয়। তিনি হয়ে গেলেন ওই মামলার সাক্ষী। মামলাটি দায়রা আদালতে বিচারের জন্য স্থানান্তরিত হওয়ার পর তাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালত থেকে তার কাছে সমন আসে। আবার আসামির পক্ষ থেকে লোকজন এসে তাদের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে বলে। আসামিরা খুব প্রভাবশালী। তাদের পক্ষে সাক্ষ্য না দিলে বিপদে পড়তে হতে পারে। এ কারণে তিনি সিদ্ধান্ত নেন মামলায় সাক্ষ্য দেবেন না। তাই তিনি আদালতে যাননি।

একসময় আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যায়। তখন তিনি আদালতে না গিয়ে পারেননি। তিনি জানান, ভয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেননি। আদালতকে তিনি বলেছেন, ওই দিন কী ঘটেছিল তা তিনি জানেন না। তিনি কিছু উদ্ধার হতে দেখেননি। তার সাক্ষ্যের কারণে হয়তো আসামিরা খালাস পেয়ে গেছে। ফৌজদারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধানে `সাক্ষী নিরাপত্তা আইন` প্রণয়নের প্রয়োজন থাকলেও এ ধরনের আইন প্রণীত হচ্ছে না। ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে।

২০০২ সালে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ এম হাসান আরিফ এ ধরনের আইন প্রণয়নের জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। প্রস্তাব পেয়ে মন্ত্রণালয় অন্য দেশে বলবৎ এ ধরনের আইন ও দেশের সংশ্লিষ্ট আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছিলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে চলতে একসময় স্থগিত হয়ে যায় এ আইন প্রণয়নের চিন্তাভাবনা। পরে আর এ আইনের কথা ভেবে দেখেনি কর্তৃপক্ষ।

ফৌজদারি মামলা বিচারের অন্যতম উপাদান হচ্ছে `সাক্ষী` ও `সাক্ষ্য`। সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় বিচারে বিলম্ব হয়। অন্যদিকে সাক্ষীর অভাবে সন্ত্রাসী আসামিরা মামলা থেকে খালাস পেয়ে যায়। বর্তমানে সাক্ষীর অভাবে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়সম মামলার স্তূপ জমেছে দেশের বিচারিক আদালতগুলোতে। সাক্ষীদের অনুপস্থিতি এবং আদালতে সাক্ষ্য না দেওয়ায় অনেক ফৌজদারি মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। আইনজীবীরা বলেছেন, ভয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অনেক সাক্ষী সাক্ষ্য দেন না। এ কারণেও সন্ত্রাসীরা খালাস পেয়ে যায়।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে ১১ পরিচ্ছেদে মিথ্যা সাক্ষ্য সংক্রান্ত অপরাধ বিষয়ে দণ্ডের বিধান রয়েছে। তাতে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান, সাক্ষ্য বিকৃতি বা গোপন করার সাজার বিধান থাকলেও সাক্ষী ও সাক্ষ্যের নিরাপত্তার কোনো বিধান নেই। সাক্ষীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাক্ষ্য গোপন করতে তথা আদালতে সাক্ষ্য না দিতে এবং সাক্ষ্য বিকৃত করতে বা সত্য সাক্ষ্য না দিতে বাধ্য হন। যে ব্যক্তি কোনো বিচার বিভাগীয় মামলার কোনো পর্যায়ে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, সেই ব্যক্তি যে কোনো বর্ণনার কারাদ-ে যার মেয়াদ সাত বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং অর্থদ-েও দন্ডিত হবে।

দণ্ডবিধিতে সাক্ষ্য গোপন বা বিকৃতির সাজা থাকলেও এতে বাধ্যকারীদের ব্যাপারে কোনো বিধান নেই। সূত্র জানায়, আইন মন্ত্রণালয় সাক্ষীদের নিরাপত্তার জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও তা আর অগ্রসর হয়নি। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের আইন রয়েছে। সেসব আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে কেন এ আইন প্রণয়ন হয়নি তা সংশ্লিষ্ট কেউ বলতে পারেননি। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ আইন প্রণয়ন করা হলে সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। আদালতে সাক্ষীদের হাজির করারও দায়িত্ব দিতে হবে তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষকে।

এসব বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সাজার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তা না হলে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হলেও সুফল পাওয়া যাবে না। বর্তমানে অপরাধের ধরন পাল্টে গেছে। চিহ্নিত ও পেশাদার সন্ত্রাসীরা এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এদের বিরুদ্ধে সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। তাই সাক্ষী নিরাপত্তা আইন করা জরুরি। সাক্ষ্য দেওয়ার পর একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই সাক্ষীর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের থাকা উচিত। অন্তত নিরাপদে সাক্ষ্য দিয়ে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা পেলে সাক্ষীরা আদালতে হাজির হতে পারবেন।

লেখকঃ সাপ্তাহিক ‘সময়ের দিগন্ত’ পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক ও আইনজীবী জজ কোর্ট, কুষ্টিয়া।

30 Jul 2012   09:47:30 PM   Monday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান