আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

সন্তান জন্মদানের অক্ষমতা ও পারিবারিক নির্যাতন

মোঃ জাহিদ হোসেন


বিয়ের প্রথম দুই বছর স্বামীর সংসারে ভালই যাচ্ছিল গৃহিণী বৃষ্টির (ছদ্ম নাম)। কিন্তু তার জীবন আজ চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। যখন সে চট্রগ্রাম কলেজে অনার্সে ভর্তি হল তখন তার সাথে পরিচয় হয় একই কলেজের মেঘ (ছদ্মনাম) নামের একটি  ছেলের সাথে। মেঘ তখন অনার্স ৩য় বর্ষে পড়ত। কলেজে একই পথে আসা-যাওয়া করতে করতে কোন একদিন মেঘের সাথে বৃষ্টির পরিচয় হয়। এর পর বন্ধুত্ব।

এই ক্ষেত্রে প্রায় সময় যেটা হয় তা হল একটি ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয়। মেঘ ও বৃষ্টির ক্ষেত্রেও তাই হল। তাদের এই ভালবাসার সম্পর্কে ছোটখাটো বাধাবিপত্তি থাকলেও ভালভাবে অতিবাহিত হতে থাকে।

মেঘ তার মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করার পর একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরী নেয়। আর এর মধ্যে মেঘ বৃষ্টিকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করে। তবে মেঘের পরিবার এই বিয়েতে খুব একটা খুশি ছিলনা। যদিও মেঘ বৃষ্টিকে বিয়ের পর আগের মত ভালবাসত তার পরেও হঠাৎ বৃষ্টির সুখময় জীবন আস্তে আস্তে বিষাদময় হয়ে উঠে। কারণ বৃষ্টি কোনভাবে জানতে পারে যে সে কখনো মা হতে পারবেনা।

অনেক চিন্তা ভাবনা করে সে এই ব্যাপারটা তার স্বামীর সাথে শেয়ার করে। পরবর্তীতে মেঘের পরিবার এই কথা জানতে পারে। কিন্তু তারা বৃষ্টিকে সান্ত্বনা দেওয়া তো দূরের কথা বরং বৃষ্টির এই অক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা রকম নোংরা ও বাজে কথা বলতে থাকে যা এক প্রকারের মানসিক নির্যাতন। কিন্তু প্রথম প্রথম বৃষ্টির স্বামী সব সময় তার পাশে থাকায় ও তাকে সমর্থন দেওয়ায় এসব নোংরা ও বাজে কথা তাকে তেমন প্রভাবিত করতে পারেনি।

এরপর মেঘ বৃষ্টিকে নিয়ে বেশ কয়েকজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। আর এই দিকে অমাবস্যার অন্ধকার বৃষ্টির জীবনকে যেন পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। কারণ মেঘের পরিবারের লোকদের বিভিন্ন নোংরা ও বাজে কথা বৃষ্টিকে প্রভাবিত না করলেও একটা সময় মেঘকে ঠিকই প্রভাবিত করে ফেলে। মেঘের পরিবারের লোকরা মেঘ ও বৃষ্টিকে জড়িয়ে বানান সব কথা বলতে থাকে যেটা থেকে পরোক্ষ ভাবে বুঝায় যে মেঘেরও কোন অক্ষমতা রয়েছে।

পরিবার থেকে এমন সব বাজে কথা শুনার পর মেঘ এক সময় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে যে অক্ষম নয় তার পরিচয় দিতে চায় দ্বিতীয় বিয়ে করে। আর এর মধ্যে বৃষ্টির প্রতি মেঘের যে ভালবাসা ছিল তার কিছুই অবশিষ্ট থাকল না। সে সম্পূর্ণ অন্য রকম হয়ে যায় এবং বৃষ্টিকে এড়িয়ে চলতে থাকে। বৃষ্টি মেঘকে বাচ্চা দত্তক কিংবা পালক নিতে বলে। কিন্তু মেঘ তাতে রাজী হয়নি। বরং সে অক্ষমতার অপবাদ দিয়ে তার উপর মানসিক নির্যাতন শুরু করে।

ইতিমধ্যে মেঘ অন্য একটি মেয়ের সাথে পরকীয়া প্রেমে লিপ্ত হয়। এর কিছু দিন পরেই মেঘ তার স্ত্রী বৃষ্টিকে না জানিয়ে ঐ মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলে আনে যেটা প্রচলিত আইনে অনুমিত নয়। বৃষ্টি এই কথা জেনে হতবিহব্বল হয়ে পড়ে। বৃষ্টি যখন এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেল তখন তার স্বামী ও পরিবারের লোকেরা মিলে তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করতে লাগল। অথচ যে মেঘ বৃষ্টিকে জীবন দিয়ে ভালবাসত বলে সে জানত আজ সেই মেঘই সন্তান জন্মদানের অক্ষমতা নিয়ে কোন কথা উঠলে বৃষ্টিকে মানসিক নির্যাতন থেকে শারীরিক নির্যাতন করে। এতো সব মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের পরেও সে তার স্বামীর ঘরে থাকতে চায়।

এখন সমাজের কাছে বৃষ্টির প্রশ্ন - এর কি কোন সমাধান নেই? শুধু সেই কি এর জন্য একা দায়ী? তার স্বামী কি পারত না তাকে উন্নত কোন চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে? তার কি স্বামীর ঘরে থাকার অধিকার নেই? কত দিন ধরে চলবে তার উপর এমন মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন? আর কিভাবে তার স্বামী তার অনুমতি না নিয়ে ২য় বিয়ে করেছে?

পাঠক, এখানে বৃষ্টি যে মানসিক নির্যাতনের শিকার তা পারিবারিক নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন,২০১০ অনুযায়ী পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন কোন নারী বা শিশু সদস্যের উপর কোন প্রকার শারীরিক,মানসিক ও যৌন নির্যাতন করা যাবে না। এই ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পর্ক বলতে রক্তের সম্পর্কের কারণে বা বিয়ের মাধ্যমে বা দত্তকের মাধ্যমে বা যৌথ পরিবারের সদস্য হবার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত কোন সম্পর্ককে বুঝাবে। কেউ এসব অপরাধ করলে তিনি অনধিক ছয় মাস কারাদন্ড বা অনধিক দশ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং অপরাধ পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে তিনি অনধিক দুই বৎসর কারাদন্ড বা এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।

মেঘ তার প্রথম স্ত্রী বৃষ্টিকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করে। কিন্তু মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী কোন পুরুষ একটি বিবাহ বলবৎ থাকা অবস্থায় ১ম স্ত্রী বা সালিসি পরিষদের অনুমতি না নিয়ে ২য় বিয়ে করতে পারবেন না। যদি অনুমতি ছাড়া বিয়ে করেন তাহলে ঐ ব্যক্তি এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় প্রকারে দণ্ডনীয় হবেন এবং ঐ বিবাহ মুসলিম বিবাহ ও তালাক আইন ১৯৭৪ অনুসারে নিবন্ধিত হতে পারবে না।

এক সময় মেঘ ও তার পরিবার বৃষ্টিকে তাদের ঘর থেকে বের হয়ে  যেতে বাধ্য করতে থাকে। কিন্তু এক জন বিবাহিত মহিলার বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় তার স্বামীর ঘরে থাকার অধিকার অবশ্যই আছে যদি বিয়েটি আইনসিদ্ধ হয়। কোন কারণ ছাড়া স্বামী বা স্বামীর পরিবারের অন্য কেউ স্ত্রীকে বাসগৃহে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেনা। এই ধরণের বেআইনি কাজ করার জন্য বৃষ্টি আইনের আশ্রয়ও নিতে পারে।

পাঠক, বর্তমান পৃথিবীতে এমন অনেক উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে যেখানে সন্তান জন্মদানের অক্ষমতা দূর করা সম্ভব। সমস্যা শুধু বৃষ্টির না হয়ে মেঘেরও থাকতে পারে। তাই উভয়ের যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া উচিত। তারপর কি করা যায় সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। এই ক্ষেত্রে আইনের কোন আশ্রয় নেওয়ার চেয়ে সামাজিকভাবে নিজেদের মধ্যে আপোষ করে নেওয়া ভাল।

লেখকঃ  সভাপতি, হিউম্যান রাইটস স্টুডেন্ট কাউন্সিল, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (বি.এইচ.আর .এফ), চট্রগ্রাম শাখা

24 Dec 2012   12:49:38 AM   Monday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান