আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

রিমান্ড

রিমান্ড মঞ্জুর, না-মঞ্জুর ও ম্যাজিষ্ট্রেটদের অবস্থান

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক


মফস্বলে সাংবাদিকতা করার সুবাদে বিভিন্ন শ্রেণী, পেশার মানুষসহ ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলাপচারিতায় অপজিশনের অনেক রাজনীতিককে বলতে শুনেছি, মামলায় তারা ভয় পান না। এমনকি কারাবরণেও। ভয় শুধু রিমান্ড নিয়ে। আবার তারা এমনও বলেন, আল্লাহ কোনোদিন ক্ষমতায় নিলে রিমান্ডের নামে এ পুলিশি বর্বরতার অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেবেন।

বাস্তবে অপজিশনের এ রাজনীতিকরা পজিশনে গিয়ে আগের কথা ভুলে যান। ভীতিকর রিমান্ডই তখন তাদের খুব ডিমান্ড। প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দিতে তারাই মামলার খেলায় নামেন। গ্রেফতার করান। গ্রেফতারের পর রিমান্ড নিশ্চিত করান। রিমান্ডে পাঠানোর পর খবর নেন ঠিকভাবে থেরাপি দেয়া হচ্ছে কি না!

মামলায় কি হবে না হবে সেটি পরের ব্যাপার। রিমান্ডে নিয়ে ধোলাই দেওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য। কোনো সরকারই আজ পর্যন্ত রিমান্ড বা এ ধরনের পুলিশি নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। বিরোধী দলে থাকাকালে রাজনীতিবিদরা এ নিয়ে নীতি-নৈতিকতাপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ অনেক কথা বললেও সরকারে যাওয়ার পর নির্যাতনের পক্ষেই অবস্থান নেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ আপদ থেকে মুক্তি মেলার কোনো সম্ভাবনা নেই।

দোষ স্বীকারোক্তি বলতে অপরাধকারী কর্তৃক স্বেচ্ছায় প্রণোদিতভাবে নিজের অপরাধের স্বীকার করাকে বোঝায়। দেশে প্রচলিত কোনো আইন দ্বারা যে কর্মকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এরূপ অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি যদি সংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে অপরাধ সংঘটন সম্পর্কে বিনা প্ররোচনায়, কোনোরূপ প্রলোভন ছাড়া নির্ভয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্র্রেটের নিকট স্বেচ্ছায় সত্য বক্তব্য পেশ করেন তাকে স্বীকারোক্তি বলে।

স্বীকারোক্তি লিখে রাখার সময় ম্যাজিস্ট্র্রেটকে সন্তুষ্ট হতে হবে যে এটা স্বেচ্ছামূলক। শুধু অপরাধীর বক্তব্যই নয় বরং তার আচরণের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। দোষ স্বীকারোক্তি লেখার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা, ৩৬৪ ধারা, সাক্ষ্য আইনের ২৪ থেকে ৩০ ধারা ও হাইকোর্ট জেনারেল রুলস অ্যান্ড সার্কুলার অর্ডারসের (ক্রিমিনাল) ২৩ ও ২৪ নং রুলস প্রযোজ্য।

এ বিধানগুলোর মধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায়ই দোষ স্বীকারোক্তি সম্পর্কে বিশদ বিবরণ আছে। স্বীকারোক্তি লেখার শেষে স্বীকারোক্তির নিম্নে তিনি একটি প্রত্যয়নপত্র দেবেন।

“আমি (নাম) এর নিকট ব্যাখ্যা করেছি যে, তিনি স্বীকারোক্তি করতে বাধ্য নন এবং যদি তিনি স্বীকারোক্তি করেন, তাহলে উক্ত স্বীকারোক্তি তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে এবং আমি বিশ্বাস করি যে, এ স্বীকারোক্তি স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে দেয়া হয়েছে। এ স্বীকারোক্তি আমার উপস্থিতিতে এবং আমার শ্রতি গোচরে গৃহীত হয়েছে।

এটা স্বীকারোক্তি প্রদানকারী ব্যক্তিকে পড়ে শোনানো হয়েছে এবং তিনি তা সঠিক বলে স্বীকার করেছেন এবং এ লিখিত স্বীকারোক্তিতে তার প্রদত্ত বিবৃতির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বিবরণ রয়েছে।”

আসামির স্বীকারোক্তি রেকর্ডের ক্ষেত্রে তার শপথ গ্রহণের কোনো আইনগত বিধান নেই। কোনো অপরাধজনক ঘটনার পুলিশি তদন্ত চলাকালে ঘটনার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বীকারোক্তির জন্য নিয়ে আসলে বা উক্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আসলে ম্যাজিস্ট্রেট প্রথমে ওই ব্যক্তিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে জানবেন উক্ত ব্যক্তি স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য ইচ্ছুক কি না?

পুলিশ কর্তৃক গ্রেপ্তার হলে অভিযুক্তকে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হবে কখন, কোথায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং কোথা থেকে সে পুলিশের হেফাজতে আছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে যদি ম্যাজিস্ট্র্রেট মনে করেন ওই ব্যক্তি স্বীকারোক্তি প্রদান করতে আগ্রহী তাহলে তাকে এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনার জন্য যুক্তিযুক্ত সময় প্রদান করবেন। সাধারণত ন্যূনতম তিন ঘণ্টা সময় দেয়ার প্রচলন রয়েছে। এ সময়ে উক্ত ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবেন।

এ সময় উক্ত ব্যক্তিকে পুলিশের সঙ্গে বা অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ বা পরামর্শ করার সুযোগ দেয়া যাবে না এবং এ সময়ে তিনি যাতে কারো দ্বারা কোনোভাবেই প্রভাবিত না হতে পারেন, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যুক্তিযুক্ত সময় শেষে উক্ত ব্যক্তি যে স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে বিবেকের তাড়নায় পরিণতি সম্পর্কে অবহিত হয়েও স্বীকারোক্তি করছেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্ন করবেন এবং তার উত্তর লিখে রাখবেন।

এরপর ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৪ ধারা অনুসরণে উক্ত ব্যক্তির স্বীকারোক্তি লিখে তা তাকে পড়ে শোনাবেন। পড়ে শোনানোর পর উক্ত ব্যক্তি তা সঠিকভাবে লেখা হয়েছে বলে স্বীকার করলে তাতে তার স্বাক্ষর নেবেন এবং ১৬৪ ধারার বিধান মতে প্রত্যয়নপত্র দিয়ে ম্যাজিস্ট্র্রেট তাতে স্বাক্ষর করবেন। লিখিত স্বীকারোক্তি পড়ে শোনানোর পর যদি স্বীকারোক্তি প্রদানকারী ব্যক্তি তাতে কোনো সংশোধনের কথা বলেন তবে তা সেভাবে সংশোধন করতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য, স্বীকারোক্তি প্রদানকালীন সময়ের যে কোনো পর্যায়ে স্বীকারোক্তি প্রদানকারী ব্যক্তি স্বীকারোক্তি দেয়ার ব্যাপারে মনোভাব পরিবর্তন করে স্বীকারোক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানালে উক্ত স্বীকারোক্তি আর লেখা যাবে না বা স্বীকারোক্তি দিতে তাকে আর বাধ্য করা যাবে না। এমনকি স্বীকারোক্তি লেখার পরও যদি উক্ত ব্যক্তি তাতে স্বাক্ষর করতে রাজি না হন তবে তাকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা যাবে না এবং এ ক্ষেত্রে তার এটি স্বীকারোক্তি হিসেবেও গণ্য করা যাবে না।

সুতরাং হেফাজতের তোড়ে কোনো আসামি যেসব স্বীকারোক্তি দেয় সেগুলোর আইনগত ভিত্তি নেই। আদালতে সেগুলো সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে এ ধরনের স্বীকারোক্তির অর্থ কী? অর্থাৎ নির্যাতনই সার কথা। রিমান্ড মঞ্জুরকারী ম্যাজিস্টেটেরও না জানার কথা নয় হেফাজতকালে পুলিশ গ্রেফতারকৃতকে কী করে, তার সঙ্গে কী আচরণ করে। পুলিশী হেফাজতের প্রায়ই মানুষ মরছে। মৃত্যুগুলোর খবর নিশ্চয়ই রিমান্ড মঞ্জুরকারী ম্যাজিস্ট্রেটরাও জানছেন। এরপরও পুলিশ বা সরকারের ডিমান্ড মতো রিমান্ড মঞ্জুর চলছেই।

রিমান্ডের ব্যাপকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা হচ্ছে। রিমান্ড মঞ্জুর প্রশ্নে সমালোচনা হচ্ছে ম্যাজিস্ট্রেটদেরও। পুলিশের ডিমান্ড অনুযায়ী বা পুলিশ চাহিবা মাত্র ম্যাজিস্ট্রেটরা কেন রিমান্ড মঞ্জুর করেন এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার অন্ত নেই। মামুলি, সাজানো বা সন্দেহজনক (৫৪ ধারার) মামলায়ও পুলিশ রিমান্ড ডিমান্ড করে বসছে। ম্যাজিস্ট্রেটরা তা মঞ্জুর করছেন। এ ধরনের রিমান্ড মঞ্জুরের ঘটনা বিচার ব্যবস্থা এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্মানে আঘাত হানছে। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রচলিত আইনে ম্যাজিস্ট্রেটদের রিমান্ড দেওয়ার যতো ক্ষমতা আছে, না দেওয়ার ততো ক্ষমতা কার্যত নেই।

অপরাধের অধিকতর তদন্তের জন্য গ্রেফতারকৃতের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশ আদালতের কাছে রিমান্ড ডিমান্ড করে। মামলার ডায়রি উপস্থাপনসহ পুলিশ এমন কিছু কারণ উপস্থাপন করে তখন ম্যাজিস্ট্রেটদের রিমান্ড মঞ্জুর করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। মূলা চুরি, থালাবাসন ভাঙচুরের মতো মামলায়ও পুলিশ শক্ত মতো গ্রাউন্ড সাজিয়ে বা আরো এক বা একাধিক মামলা সাজিয়ে কেস ডায়েরি উপস্থাপন করলে ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড মঞ্জুর করতে অনেকটা বাধ্য হয়। কেস ডায়েরি ও রিমান্ডের আবেদনের বাইরে ম্যাজিস্ট্রেটদের আর বেশি কিছু দেখার অবকাশও নেই। মামলাটি সাজানো না প্রকৃত সেটিও রিমান্ডের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। মোট কথা রিমান্ডের বিষয়টি বলতে গেলে প্রায় পুরোটাই পুলিশের এখতিয়ারে।

লেখক: সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও অ্যাডভোকেট জজ কোর্ট, কুষ্টিয়া।

03 Jan 2013   10:08:58 PM   Thursday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান