আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

নারী নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই

অ্যাডভোকেট শেখ সালাহ্উদ্দিন আহমেদ


দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে খুন-ধর্ষণের ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই খবরের কাগজে আসছে একাধিক ধর্ষণের ঘটনা। বাড়ছে গুম-খুনের ঘটনাও। সম্প্রতি দেশের কয়েকটি জায়গায় ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ঘটনা ঘটেছে।

শিশু থেকে শুরু করে নানা বয়সী নারী এ পাশবিকতার শিকার হয়েছেন। ঘটনার শিকারদের কেউ কেউ চিকিসাধীন। অপরাধীদের কয়েকজনকে আটকও করেছে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পাশবিকতার শিকার কয়েকজনের স্বজন গণমাধ্যমে যে আর্তি প্রকাশ করেছেন তা পাষাণ হৃদয়ের মানুষকেও নাড়া দেবার জন্য যথেষ্ট। বিকৃত রুচিসম্পন্ন মানুষ এ ধরণের জঘন্য ঘটনার সাথে জড়িত। জনাকয়েক মানুষের আচরণের জন্য দেশ ও জাতির সম্মানহানি মেনে নেয়া যায় না।

দিল্লিতে বাসে একটি গণধর্ষণের ঘটনায় সারা ভারতে তোলপাড় হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশের মানিকগঞ্জে বাসে ধর্ষণের ঘটনায় তেমন প্রতিবাদ কই? তাহলে আমাদের চেতনা কি ভোঁতা হয়ে গেছে? কিংবা আমাদের নৈতিকতাবোধ কি হারিয়ে গেছে? আমরা কি পারি না ভারতের মতো অপরাধীদের ধরে ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে?

শুধু ধর্ষণ নয়, একই সঙ্গে ধর্ষণ ও হত্যার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে এরই মধ্যে। টাঙ্গাইল, মধুপুর, রাজবাড়ী, পিরোজপুর, গাজীপুরের কাপাসিয়া কিংবা ঢাকার সেগুনবাগিচায় স্থানীয়ভাবে কিছু মানুষ প্রতিবাদে নেমেছিল।

কিন্তু কোনো ঘটনায়ই জাতীয়ভাবে বড় কোনো প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি। আর বড় ধরনের প্রতিবাদ গড়ে ওঠেনি বলেই পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে টালবাহানা করে, অপরাধীদের বাঁচিয়ে প্রতিবেদন দেয় কিংবা অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের দেখতে পায় না।

কাপাসিয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত ধর্ষক ক্ষমতাসীন দলের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় পুলিশ এখনো তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি বা করেনি। এমনকি মামলা নিতেও গড়িমসি করেছিল।

মানিকগঞ্জের ঘটনায়ও পুলিশ এর মধ্যেই দু-তিন রকমের কথা বলতে শুরু করেছে। বহুল আলোচিত বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন পেতে হাইকোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। এগুলোই কি দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির প্রধান কারণ নয়?

অপরাধ বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়িত্বে অবহেলা, অদক্ষতা ও অনৈতিক আচরণের কারণেই দেশে খুন-ধর্ষণসহ নানা অপরাধ দ্রুত বেড়ে চলেছে।

সেই সঙ্গে আছে বিচারকদের দীর্ঘসূত্রীতা এবং নানা উপায়ে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া। অপরাধ বৃদ্ধির এই গতি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে এই সমাজে মানুষ বাস করবে কিভাবে?

সাধারণত দরিদ্র ও দুর্বল ঘরের মেয়েরাই ধর্ষণের শিকার হয়। বেঁচে থাকাটাই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে দীর্ঘ মেয়াদে মামলা চালানোর মতো অর্থ ও সময় তারা দিতে পারে না। সামাজিকভাবেও তাদের কণ্ঠ শক্তিশালী নয়। তার পরও তারা বেঁচে থাকতে পারে, যদি রাষ্ট্রে সুশাসন থাকে এবং সমাজে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ থাকে।

রাষ্ট্রে সুশাসনের অভাব যে কতটা তীব্র, তা তো আমরা প্রতিনিয়ত দেখতেই পাচ্ছি। অপরাধীরা এখানে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় প্রবল প্রতাপে ঘুরে বেড়ায়। দুষ্টের দমনে নয়, পুলিশ এখানে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাকি থাকে সামাজিক প্রতিরোধ। কিন্তু তাও যেন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা মোটেও কাম্য নয়।

মানিকগঞ্জে বাসে ধর্ষণের শিকার মেয়েটি একজন গার্মেন্টকর্মী। তার বা তার পরিবারের পক্ষে দিনের পর দিন মামলা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, রাষ্ট্রকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যেসব সংগঠন কাজ করছে, তাদেরও মেয়েটির সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে। আর সমাজ থেকে এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ দূর করার জন্য দ্রুত অভিযুক্তদের বিচার নিশ্চিত করে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

সম্প্রতি সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ২০১২ সালে ৮০৫ নারী ও শিশু ধর্ষণ। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭০ জনকে। যৌতুকের শিকার ৮২২ জন। যৌতুকজনিত কারণে খুন হয়েছেন আরও ২৭৩ জন। এসব উদ্বেগজনক খবরের মধ্যেই নতুন বছরের ১৩ জানুয়ারি রোববার রাজবাড়ী জেলার সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামে খুন হয়েছে ৫ বছর বয়সের একটি শিশু।

গত বছরের জুন মাসে এই শিশুটিকেই ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল রইচ শেখ নামের এক তরুণ। মামলায় জামিন পাওয়ার কয়েকদিন পরেই এই পাষণ্ড প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে খুন করে নিষ্পাপ শিশুটিকে। রাজবাড়ী সদর থানার ওসির ধারণা, শ্বাসরোধ করে হত্যার আগে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে।

গত শুক্রবার উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী জেলা সদরে ধর্ষিত হয়েছে চতুর্থ শ্রেণীর এক ছাত্রী। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মেয়েটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার বাবা বাকপ্রতিবন্ধী। কোনো রকম সংসার চালান।

প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সমাজ যদি তার পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে এ নিষ্ঠুর অমানবিকতার বিচারের নিশ্চয়তা কোথায়?

নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে দিকে দিকে। শহর ও গ্রাম সর্বত্র ধর্ষণ ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করা হচ্ছে।

কেবল নারী সংগঠন নয়, সর্বস্তরের মানুষ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবীদের সংগঠনগুলো নারীর প্রতি সহিংসতায় প্রতিবাদী। সংবাদপত্র এবং বেতার-টেলিভিশন এ বিষয়ে জনমত গঠনে সদা সক্রিয়।

এ ইস্যুতে সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকারেও কোনো ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হয় না।

কিন্তু কেন এ অভিশাপ থেকে নিস্তার মিলছে না, সে প্রশ্ন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের সবাইকে।

গত মাসে রাজধানীর দুই গার্মেন্ট কর্মীকে ধর্ষণ ও একজনকে হত্যার দায়ে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এর বিচারক দু`জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আরও নজির রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন যারা করছে, তাদের কাছে আদালতের কঠোর মনোভাবের বার্তা পৌঁছায় না সেটা বলা চলে না।

তারপরও প্রতিদিন দেশের অনেক স্থানে নির্যাতিত হচ্ছে নারী ও শিশুরা। এ জন্য দায়ী সবাইকেই দ্রুত চিহ্নিত ও বিচার করে শাস্তি প্রদান করা জরুরি।

ধর্ষণ ও এ ধরনের সহিংসতার খবর আমরা দেখতে চাই না, বিচারের জন্য অসহায় মানুষের আর্তিও আর শুনতে চাই না।

জনাকয়েক মানুষের বিকৃত আচরণের কারণে দেশ-জাতির সম্মানহানি রোধে প্রধানমন্ত্রী কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন সে প্রত্যাশাও সবার।

বিশেষ করে ধর্ষণের মতো পাশবিকতা রোধে এর সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও তার রায় যত জলদি সম্ভব কার্যকর করে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে দ্রুততম সময়ে নতুন কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ শুরু করতে হবে।

এ ধরণের মামলার অগ্রগতির খবর এবং রায় কার্যকরের ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করতে হবে, যাতে করে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।

অতীতকে পিছনে ফেলে অনেক  দূর এগিয়েছে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা। পৃথিবীর ইতিহাসে নজির সৃষ্টি করে এ দেশে কয়েকবার প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন নারী। তাই তাদের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা-ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিচার অতি দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।

লেখকঃঅ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ও সভাপতি, সাউথ এশিয়ান ল’ ইয়ার্স ফোরাম; ইমেইল:advssahmed@yahoo.com

09 Feb 2013   05:11:49 AM   Saturday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান