আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

পুলিশের কর্তব্য ও জনগণের অধিকার

অ্যাডভোকেট এ.এম. জিয়া হাবীব আহসান


যিনি গ্রেপ্তার করেন তিনি বিচার করেন না । তিনি আদালতের নিকট অভিযুক্তকে সোপর্দ করেন। গ্রেফতারকারী (পুলিশ/ র‌্যাব) কোনো  অভিযুক্তকে নির্যাতন করলে তিনিও আইনের আওতাভূক্ত।

অপরদিকে, সরকারি কর্মচারীকে তার কর্তব্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে আক্রমণ বা অপরাধমূল বলপ্রয়োগ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

সরকারি কর্মচারী কোনো কাজ করলে বা উদ্যোগ গ্রহণ করলে সে কাজের জন্য তাকে আক্রমণ বা তার ওপর বলপ্রয়োগ করলে দণ্ডবিধির ৩৫৩ ধারায় অপরাধ হয়।

এ ধারায় বলা হয়েছে, ’যে ব্যক্তি, কোন সরকারি কর্মচারীকে অনুরূপ সরকারি কর্মচারী হিসেবে তার কর্তব্য সম্পাদনের ব্যাপারে, অথবা উক্ত ব্যক্তিকে অনুরূপ সরকারি কর্মচারী হিসেবে তার কর্তব্য পালন হতে বিরত করার বা বাধা প্রদান করার অভিপ্রায়ে অথবা অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক অনুরূপ সরকারী কর্মচারী হিসাবে কৃত বা করার জন্যে উদ্যোগী কোন কিছুর কারণে তাকে আক্রমণ করে বা তার প্রতি বলপ্রয়োগ করে, সেই ব্যক্তি যেকোন বর্ণনার কারাদন্ডে- যাহার মেয়াদ তিন বৎসর পর্যন্ত হতে পারে, অথবা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দণ্ডিত হইবে।’ 

এ ধারায় দুটি মূল উপাদান আছে (১) আক্রমণ বা বলপ্রয়োগ থাকতে হবে এবং (২) এটা কোন সরকারী কর্মচারির বিরুদ্ধে নিক্ষিপ্ত হবে।

উক্ত সরকারি কর্মচারীকে আরো প্রমাণ করতে হবে যে, আক্রান্ত হওয়ার সময় তিনি সরকারি কর্মচারীরূপে কাজ করছিলেন অথবা তাকে তার কর্তব্য পালনে বাধা দেওয়ার জন্য আক্রমণ করা হয়েছিল।

সরকারি কর্মচারীকে তার কর্তব্য পালনে বাধাদান করার জন্য স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত দান করা দণ্ডবিধির ৩৩২ ও ৩৩৩ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দণ্ডবিধির ৩৩২ ধারায় বলা হয়েছে ‘‘ সরকারি কর্মচারীকে তাহার কর্তব্য পালনে বাধাদান করার জন্য স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত প্রদান করলে সেই ব্যক্তি যেকোন বর্ণনার কারাদণ্ডে- যাহার মেয়াদ তিন বৎসর পর্যন্ত হইতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হইতে পারে।’’

দন্ডবিধির ৩৩৩ ধারায় সরকারি কর্মচারীকে গুরুতর আঘাত প্রদান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীকে কর্তব্য কাজে বাধা দান করার জন্য স্বেচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর আঘাত প্রদান করলে আঘাত প্রদানকারী ব্যক্তি যে কোন বর্ণনার কারাদণ্ডে- যার মেয়াদ দশ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে এবং অর্থদণ্ডও হতে পারে।

উপরোক্ত ধারায় অপরাধ আমলযোগ্য বিধায় পুলিশ অপরাধকারী ব্যক্তিকে ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৫৪, ৫৫, ৫৭ এবং ১৫১ ধারা মতে বিনা পরোয়ানায় অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে পারে।

ফৌজদারী কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৬১ ধারা মতে গ্রেপ্তার কৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিষ্ট্রেট এর নিকট হাজির করতে হয়।

কিন্তু তার পরিবর্তে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে নির্যাতন চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। বাস্তবিক অর্থে কতজন মানুষ নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল।

নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে ১৯৮৪ সালে ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত মতে গঠিত কনভেনশনের ধারা ১ এ ‘নির্যাতন’ শব্দটি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

‘নির্যাতন’ শব্দটির অর্থ যে কোন কাজ যা দৈহিক বা মানসিক ব্যাথা বা দুর্ভোগ বৃদ্ধি করে এবং যা অন্য কোন মানুষ বা তৃতীয় কারো কাছ থেকে কোন তথ্য বের  করার কাজে বা স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়; নির্যাতিত ব্যক্তি তৃতীয় কোন ব্যক্তিকে কোন অপরাধ করে থাকলে বা করেছে বলে সন্দেহবশত শাস্তি প্রদান করা হলে; অথবা ভয় দেখানোর জন্য বা মানবিক আতংক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোন সরকারী কর্মকর্তার নির্দেশে, সম্মতিক্রমে বা অন্য কোন পন্থায় এ ধরণের যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ সৃষ্টিকারী নির্যাতন যে কোন যুক্তিতে বা যে কোন ধরণের বৈষম্যের কারণে চাপিয়ে দেয়া হয়। অবশ্য আইনগতভাবে কার্যকর কোন দণ্ডজনিত যন্ত্রণা বা দুর্ভোগ এর আওতায় পড়বে না।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন-সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- ‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্চনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না, কিংবা কারো সাথে অনুরূপ ব্যবহার যাবে না।’

কিন্তু তা সত্ত্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা শাস্তির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশে নির্যাতনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই।

দণ্ডবিধির ৩৩০ এবং ৩৩১ ধারায় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায়কালে কাউকে আঘাত বা গুরুতর আঘাত করার জন্য সর্বোচ্ছ ৭ এবং ১০ বছরের সাজা এবং অর্থদণ্ডের বিধান থাকলেও কার্যত এর কোন প্রয়োগ নেই বললেই চলে।

নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে আইন করা হয়নি বিধায় হরহামেশাই আমরা নির্যাতনের ঘটনা শুনতে পাই এবং এর বিরুদ্ধে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে দেখি না।

ফলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। ২০১২ সালে সারাদেশে ৭২ জন বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং এদের মধ্যে নির্যাতনের কারণে ৭ জন মারা গেছে।

তাদের মধ্যে পুলিশের হাতে ৫৮ জন, র‌্যাবের হাতে ৫জন, র‌্যাব-পুলিশের হাতে ৫ জন, বিজিবি’র হাতে ২ জন এবং জেল কর্তৃপক্ষের হাতে ২ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অনেকে নির্যাতনকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেন এই বলে যে, এটি এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে অপরাধ দমনের প্রয়োজনে তথ্য আদায়কে সম্ভব করে।

কিন্তু এটিও প্রতিষ্ঠিত যে, নির্যাতনের মাধ্যমে আদায়কৃত স্বীকারোক্তির কোনই আইনগত মূল্য নেই। নির্যাতন কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এভিডেন্স এ্যাক্ট অনুযায়ী জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির কোন মূল্য আদালতের কাছে না থাকার পরও নির্যাতন করা হচ্ছে।

২০০৩ সালে ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ে (৫৫ ডিএলআর, ৩৬৩) সুষ্পষ্টভাবে বলা আছে একজন ব্যক্তিকে কিভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। এরপরও বিভিন্ন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত হাইকোর্ট বিভাগের ওই নির্দেশনার বাইরে এসে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পুলিশ রিমান্ড চাওয়া মাত্রই তা পেয়ে যাচ্ছে।

ডিউটিরত অবস্থায় যদি পুলিশ অফিসার কর্তৃক কেউ নির্যাতিত হয় এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে ঝধহপঃরড়হ নিয়ে তার বিরুদ্ধে দন্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ উত্তাপন করা যেতে পারে। ডিউটি ছাড়া অবস্থায় পুলিশ অবরোধ করলে সেংশান লাগবে না। অবৈধ ভাবে অবরোধ করে রাখলে পুলিশের বিরুদ্ধেও ৩৪২ ধারা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এ ধারা মতে, বেআইনী ভাবে অবরোধ করা হলে এক বছর পর্যন্ত কারাদন্ড, ১০০০ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দণ্ডিত হতে পারে। পুলিশী নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্থ নাগরিক পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য দেওয়ানী মামলাও করতে পারে। টর্ট আইনে এর প্রতিকার থাকলেও আমাদের দেশে এর চর্চা নেই।

ফলে পাবলিক সার্ভেন্ট হয়েও সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীরা জনগণকে চাকর মনে করে। তাদের আচরণে যার বহিপ্রকাশ ঘটে। পুলিশ জনগণের সেবক, তারা কোন দলের প্রাইভেট বাহিনী নয়, এ কথা তাদের সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে। উল্লেখ্য পুলিশ অফিসার না হয়ে যদি সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা বা কনষ্টেবল পর্যায়ের হয়ে থাকে তখন ঝধহপঃরড়হ এর প্রয়োজন হয় না।

পুলিশ বা পুলিশ অফিসার কর্তৃক যে কোন ফৌজদারী অপরাধ সংগঠিত হলে তার বিরুদ্ধে একজন সাধারণ নাগরিক মামলা করতে পারে। এ ব্যাপারে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা স্বরূপ ট্রান্সফার, সাসপেন্ড, ডিমোশন (পদাবনতি), এ,সি,আর রিপোর্টে ব্ল্যাক মার্কিং প্রভৃতি শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রত্যেক নাগরিকের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আত্মরক্ষার নামে কাউকে নির্যাতন ও আঘাত করা যায় না। পুলিশ দায়িত্ব পালনের নামে কোন নিরীহ নাগরিককে নির্যাতন করতে পারে না।

বাংলাদেশের সংবিধানে তো বটেই নির্যাতন নিপীড়ন আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে নির্যাতনকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে অপরাধীকে শাস্তিদান এবং ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ পর্যন্ত প্রদান করা প্রয়োজন।

নির্যাতন বিরোধী আইন প্রণয়ন ও জাতিসংঘের কনভেনশন বা ক্যাট (CAT) নামক নির্যাতন বিষয়ে প্রথম আন্ত র্জাতিক কনভেনশন বাংলাদেশ এর ১৪ অনুচ্ছেদ এর ব্যাপারে আপত্তি দিয়ে ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর একে অনুসমর্থন করে।

১৪ অনুচ্ছেদ নির্যাতিতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ উক্ত কনভেনশন এর অনুসমর্থনকারী হিসেবে এখনও পর্যন্ত নির্যাতন বন্ধে আইনী বাধ্যবাধকতা অনুসরণে কোন সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়নি। এ ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকার জন্য জাতীয় সংসদ সদস্যদের নিকট উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

২৬ জুন আন্তর্জাতিক নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস দেশব্যাপী গুরুত্বের সাথে পালন করা জরুরী। কেননা নির্যাতন বন্ধে জনসচেতনতা একটি বড় শক্তি।

মানবাধিকার কে সমুন্নত রাখতে সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, এনজিও, মানবাধিকারকর্মী এবং মিডিয়া কর্মীদের সমন্বয় থাকা দরকার। মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন তথা সকল প্রকার নির্যাতন বন্ধে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকেও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

আসুন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে সবাই যার যার অবস্থান থেকে জোড়ালো ভূমিকা রাখি।

লেখক‍ঃ আইনজীবী, কলামিষ্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী।          

17 Feb 2013   07:28:26 AM   Sunday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান