আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

বিচারের বানী

যৌতুকের জন্য স্ত্রী হত্যা ও একটি মামলার ফলাফল

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক


স্বামীর সুখ কপালে জুটেনি ফুলমতির (ছদ্মনাম)। যৌতুকের জন্য অবশেষে মানুষরূপী সেই পাষণ্ড স্বামীর হাতেই প্রাণ দিতে হলো তার। ২০০৬ সালে উভয় পক্ষের পারিবারিক সন্মতিতেই বিয়ে হয়েছিল মেয়েটির। সুখের সংসারে মাত্র ৬ মাসের মাথায় নেমে আসে যৌতুকের অভিশাপ।

অতি দরিদ্র তোফাজ্জেল হোসেন মেয়ের বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে ১৫ হাজার টাকা দিলেও তাতে যৌতুকলোভী জামিরুলের (ছদ্মনাম) খায়েস মেটেনি। জামিরুল ব্যবসার নামে আরো ৫০ হাজার টাকার জন্য প্রায়ই ফুলমতির ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাত।

এ নিয়ে উভয় পরিবারের মধ্যে অশান্তি দেখা দেয়। এরই জের ধরে গত ২০০৭ সালের ২৫ এপ্রিল রাতে যৌতুকের দাবিতে স্বামী জামিরুল ফুলমতিকে মারধর করে। এ সময় জামিরুলের বাবাসহ দুই ভাই অমানবিক নির্যাতন চালায় ফুলমতির ওপর।

নির্যাতনের সময় কখন যে ফুলমতি মৃত্যুর কোলে ঢুলে পড়ে কেউ টের পায়নি।

একপর্যায়ে স্বামী জামিরুল ধারালো অস্ত্র দিয়ে যৌনাঙ্গসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে ফুলমতির মৃত্যু নিশ্চিত করে। এ ঘটনায় ফুলমতির বাবা তোফাজ্জেল হোসেন বাদী হয়ে জামিরুলসহ তার দুই ভাইকে আসামি করে কুমারখালী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

জামিরুলেরে দু`ভাইয়ের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার চার্জশিট থেকে তাদের নাম বাদ দেয়া হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের একাধিক সাক্ষীর স্বাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আসামি জামিরুলের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার রায় প্রদান করেন।

আইন পেশায় থাকার সুবাদে প্রতিনিয়ত আদালতপাড়ার বিভিন্ন মামলা ও তার ফলাফল নিয়ে পড়াশুনা করতে হয়। নানা শ্রেণী, পেশার মানুষ সহ ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলাপচারিতায় অনেক সমস্যার আইনী সমাধান দিতে হয়। সম্প্রতি এক জনাকীর্ণ আদালতে কুষ্টিয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিজ্ঞ বিচারক আকবর হোসেন মৃধা এ রায় প্রদান করেন।

দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির নাম জামিরুল ইসলাম শেখ। সে কুমারখালী উপজেলার বেড় কালুয়া ফকিরপাড়া গ্রামের নিজাম উদ্দিন শেখের ছেলে। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিল।

সন্ত্রাস যেমন আমাদের সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে, যৌতুক প্রথাও তেমনি গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ক্ষতের মধ্যে জমে আছে শত শত নির্যাতনের বীভৎস চিহ্ন। রয়েছে অসহায় নারীদের বুকফাটা আর্তনাদ ও নির্যাতনের করুণ কাহিনী।

যৌতুকের টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে পাষণ্ড স্বামী, আবার অনেক সময় পরিবারের সবাই মিলে ওই অসহায় স্ত্রীর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আবার কখনো কখনো গলাটিপে হত্যা করতেও তারা দ্বিধা করে না।

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের (সংশোধন ২০০৩) ১১(গ) ধারায় যৌতুকের কারণে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ ও অপরাধের প্রকৃতির কথা বলা হয়েছে। ১১(ক) ধারায় বলা হয়েছে, `যৌতুকের কারণে মৃত্যু ঘটানোর জন্য মৃত্যুদণ্ডে বা মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং উভয় ক্ষেত্রে উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।`

যদিও ইতিমধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট এই আইনে মৃত্যু ঘটানোর ক্ষেত্রে শুধু মৃত্যুদণ্ডর বিধানকে সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যমূলক না হওয়ায় বাতিল করে দিয়েছেন, যা রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের আদেশে স্থগিত আছে।

১১(খ) ধারায় যৌতুকের কারণে `মারাত্মক জখম করার জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১২ বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দন্ডনীয় হইবেন এবং উক্ত দণ্ডের অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন` এবং ১১(গ) ধারায় বলা হয়েছে, `যৌতুকের কারণে সাধারণ জখম করার জন্য অনধিক তিন বছর কিন্তু অন্যূন এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন এবং উক্ত দন্ডের অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।`

যৌতুক এখন আর গরিবের ঘরেই সীমাবদ্ধ নেই। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত বা ধনী পরিবারেও যৌতুকের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে। একটি বেসরকারী সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত ১০ বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ বিবাহিত নারী যৌতুকের কারণে শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়।

সমাজের নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত এমনকি শিক্ষিত পরিবারেও যৌতুক দেয়া-নেয়া চলে। অনেক শিক্ষিত পরিবার মনে করে, তাদের ছেলেকে পড়াশোনা করাতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। সুতরাং এ টাকা ছেলের বিয়েতে কন্যাপক্ষের কাছ থেকে যৌতুক হিসেবে আদায় করে নেবে। এমন আশাও করে থাকে। এটা পাত্রপক্ষের ব্যক্তিগত লোভ-লালসা ও হীনমন্যতা ছাড়া কিছুই নয়।

আবার কিছু পরিবার আছে যারা যৌতুক দাবি করে পরোক্ষভাবে। পাত্রের অভিভাবক ঘটক বা কন্যাপক্ষের লোকজনকে বলেন, ছেলে উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র, নম্র, মার্জিত যৌতুক হিসেবে কিছুই চাই না। তবে অমুক ব্যক্তি তার মেয়ের জন্য ছেলেকে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি মোটরসাইকেল, পাঁচ ভরি সোনার গহনা দিতে চেয়েছিল।

এভাবে বিভিন্নভাবে যৌতুক আদায় করার কৌশল লক্ষ্য করা যায়। কাজেই যৌতুকের জন্য নির্যাতনের মাত্রা যেমন বহুমাত্রিক তেমনি যৌতুক আদায়ের কৌশলেও ভিন্নতা রয়েছে।

ইসলামের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করেন সেখানে কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকে অবমাননাকর ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হতো। তাদের জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্দয়তাও অহরহ ঘটতো। ইসলামী সমাজ এই ঘৃণ্য প্রথার চির অবসান ঘটালেও একবিংশ শতাব্দীতে নারী হত্যার মতো ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। আল্ল‍াহ কোরআনে বলেছেন, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন (সূরা রুম, ৩০:২১)।

লেখক: আইনবিষয়ক পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘সময়ের দিগন্ত‘র সম্পাদক ও প্রকাশক ’ ও আইনজীবী জজ কোর্ট, কুষ্টিয়া। ইমেইল: seraj.pramanik@gmail.com

20 Jan 2013   06:50:27 AM   Sunday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান