আইন ও মানবাধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং কোন রকমের বৈষম্য ছাড়াই সকলে আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার বিশেষ প্রতিবেদন বই পরিচিতি সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
আইন ও মানবাধিকার সম্পর্কিত যেকোন বিষয় নিয়ে আপনার মতামত, মন্তব্য ও প্রশ্ন পাঠিয়ে দিন-

মানবাধিকার ডেস্ক
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ humanrights@banglanews24.com

আপনার মতামত দিন

নাম:
ইমেইল:
মন্তব্য:

নারীর আত্মহত্যার চেষ্টা, প্ররোচনা এবং শাস্তি

অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক


যখন কোনো ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত অবৈধ কর্মের কারণে কোনো নারী তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ সতীত্ব হারিয়ে আত্মহত্যা করে, তখন নিশ্চয়ই দায়ী হয় সমাজের ওই অপরাধী ব্যক্তিটি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ এর ক ধারায় ওই ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।

সাংবাদিকতার সুবাদে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসারত আত্মহত্যার চেষ্টাকারী অনেকের সাথে কথা হয়। এরকম আরো কথা হয়েছে আদালত আর পুলিশের কার্যালয়ে। তাদের কথা শুনে মনে হয়েছে, শুধু পুলিশ যদি একটু সহানুভূতির সঙ্গে অভিযোগকারীদের কথা শুনে আইনগত ব্যবস্থা নেয়, তাহলে এ দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক কমে যাবে।

একটি বেসরকারী সংস্থার জরীপে জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন সহস্রাধিক নারী ও পুরুষ আত্মহত্যার অপচেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তাদের অধিকাংশ আবার ছাত্রী ও গৃহবধূ। এসব আত্মহত্যার নেপথ্যে থাকে জীবনসঙ্গীর পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া, পারিবারিক শাসন, প্রেমের ক্ষেত্রে পরস্পরের সম্পর্কের অবনতি ইত্যাদি কারণ।

চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আনা হলে এই আত্মহত্যা চেষ্টার প্রতিটি ঘটনাই জরুরি বিভাগের বিশেষ নথিতে (পুলিশ কেস খাতা) লিপিবদ্ধ হয়। আবার আইনেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, আত্মহত্যার চেষ্টা করা দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারামতে ধর্তব্য অপরাধ এবং শাস্তিযোগ্য। তবে বাস্তব অর্থে এই অপরাধে কারো গ্রেপ্তার হওয়া দূরে থাক, আজ পযর্ন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ এ খাতার লেখা ধরে কোনো ঘটনারই তদন্ত করেনি। আসলে মারা না গেলে কারো ব্যাপারেই পুলিশের কোনো তদন্ত হয় না। পুলিশ, হাসপাতাল ও কয়েকটি এনজিও সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তবে পুলিশের ভাষ্য ভিন্ন। তারা জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পুলিশ কেস খাতা আছে। কিন্তু হাসপাতাল থেকে আত্মহত্যার অপচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার কোনো খবর কেউ তাদের দেয় না। ফলে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটে না। তবে খবর দিলে পুলিশ অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয় বলে তারা জানান।

কয়েকটি এনজিও সূত্রে জানা গেছে, এসব আত্মহত্যার পেছনে তারা যেসব কারণ চিহ্নিত করেছে সেগুলো হচ্ছে, ইভ টিজিং, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন, যৌতুক, প্রেমে ব্যর্থতা, পরকীয়া, পরীক্ষায় ফেল করা, ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, সামাজিক বৈষম্য, অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য।

বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অপরাধে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে এমন অভিযোগ এনে দায়ের করা মামলায় শাস্তিদানের ঘটনা বিরল।

আইনজীবীরা মনে করেন, আইনে আত্মহত্যার প্ররোচনার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকার কারণেই আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সাধারণত নারীরাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। কিন্তু প্ররোচনার আইনগত সংজ্ঞা না থাকায় নির্যাতনকারীদের শাস্তি হয় না। আর নির্যাতনকারীরা কঠিন শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় বর্তমানে আত্মহত্যার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আত্মহত্যার চেষ্টা করাও আইনে অপরাধ। কিন্তু সে  ক্ষেত্রে মামলাই হয় না।

বহুল আলোচিত সিমি আত্মহত্যার ঘটনার প্রায় ১০ বছর হয়ে গেলেও সিমির আত্মহননে প্ররোচনা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। নিম্ন আদালত এ মামলায় অভিযুক্ত ছয়জনের পাঁচজনকে এক বছর করে কারাদ- ও এক হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন। ওই আদালত যুক্তি দেন, দ-বিধিতে উল্লিখিত ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনা বলতে যা বোঝানো হয়েছে তা হচ্ছে সতীদাহ প্রথার মতো। যদি কেউ আত্মহত্যার জন্য কাউকে বাধ্য করে তবেই সেটা আত্মহত্যার প্ররোচনা হবে। এর বিরুদ্ধে সিমির বাবা জজ আদালতে আপিল করেন। আসামি পক্ষ সিমির বাবার আপিলকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন। আবেদন খারিজ হলে তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগে যায়। আপিল বিভাগ শুনানির জন্য এটি তালিকাভুক্ত করে এবং বিষয়টি এখনও শুনানির অপেক্ষায়।

আত্মহত্যার প্ররোচনা বিষয়ে আইন কী বলে?
বাংলাদেশে প্রচলিত দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যা প্ররোচনার শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে অনুরূপ আত্মহত্যা অনুষ্ঠানে সহায়তাকারী ব্যক্তির ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। ৩০৫ ধারায় বলা হয়েছে, শিশু বা পাগল বা মাতাল ব্যক্তির আত্মহত্যার প্ররোচনাদানকারীকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে।

দণ্ডবিধির এ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনা কী সে সম্পর্কে কিছু বলা নেই। অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৯ক ধারায় নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনার শাস্তির বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তির ইচ্ছাকৃত কোনো কার্য দ্বারা সম্ভ্রমহানি হওয়ার প্রত্যক্ষ কারণে কোনো নারী আত্মহত্যা করলে ওই নারীকে অনুরূপ কার্য দ্বারা আত্মহত্যা করতে প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে বলা হবে। এ আইনেও ১০ বছর শাস্তির বিধান করা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে আত্মহত্যার যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, এতে স্বামীর বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এ ধারায় আনা যায় না। এখানেও আত্মহত্যার প্ররোচনার সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়।

আইনে প্ররোচনার বিষয়টি সুস্পষ্ট নয় বলেই আসামিরা সহজেই অব্যহতি পেয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনও যুগোপযোগী করতে হবে। সাক্ষ্য আইনেও ত্রুটি রয়েছে যা সংশোধন করা দরকার। আত্মহত্যার প্ররোচনায় শাস্তি না পাওয়ায় আত্মহত্যার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

আইনের চোখে নৃশংসতা
কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, শুধু মা-ই আত্মহত্যা করছে না; তারা সন্তানদের মেরে তারপর নিজে আত্মহত্যা করছে। আইনের চোখে এটি নৃশংসতা। নিজের সন্তানকে হত্যা করা দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধারায় অপরাধীর মৃত্যুদ- দেওয়ার বিধান রয়েছে। আত্মহত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে সন্তান হত্যার অভিযোগে তার মৃত্যুদ- হতে পারে। তবে সন্তানদের হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করায় আর সন্তান হত্যার বিচারের বিধান নেই। কারণ মৃত ব্যক্তি সব বিচারের ঊর্ধ্বে বলে আইনে কথা আছে।

আত্মহত্যায় ব্যর্থ হলেই শাস্তি
আমাদের দেশে আত্মহত্যার চেষ্টার অভিযোগে মামলা করা হয়, এমনটি শোনা যায় না। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে আত্মহত্যাকে কোনো অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে আত্মহত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আত্মহত্যাকে নিরুৎসাহিত করতে এ আইন করা হয়েছে।

দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টা করলে শাস্তির বিধানের কথা বলা হয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করার উদ্যোগ নেয় বা আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করে, সে ব্যক্তি এক বছরের কারাদণ্ড ভোগ করবে।

লেখকঃ সাপ্তাহিক ‘সময়ের দিগন্ত’ পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক ও আইনজীবী জজ কোর্ট, কুষ্টিয়া।

20 Jul 2012   12:03:04 PM   Friday
প্রচ্ছদ মতামত মানবাধিকার আইন-উপদেশ বিশেষ প্রতিবেদন বিচারের বানী বই পরিচিতি পাঠক ফোরাম সপ্তাহের আইন নোটিস বোর্ড
মানবাধিকার ডেস্ক বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ইমেইল: humanrights@banglanews24.com
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম      এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
© 2014 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত      একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান