বাংলাদেশের যুবকরা এক বুক আশা নিয়ে আজকের আওয়ামীলীগ সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলো, আজ থেকে চার বছর আগে। তাদের কাছে একাত্তুর এক গল্পের মতো। যেন রূপকথা। চারদিকে গুলির শব্দ। শিশু-বৃদ্ধরা ছুটছে। চলছে অসহায় মানুষের মিছিল। যেন গ্রাস করছে কোনো পাকিস্তানি অজগর। জ্বালাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। ধর্ষণ-উল্লাসে মেতে উঠেছে পাকিস্তানি হানাদার তাদের দোসর আর স্থানীয় রাজাকাররা। বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মত মানুষের ঢল ছুটছে এতটুকু আশ্রয়ের সন্ধানে, কোথায় সে আশ্রয় কেউ জানে না। শুধু তরুণী জানতেন তাকে পিশাচদের হাত থেকে বাঁচতে হবে। মা জানতেন তার শিশুকে বাঁচাতে হবে। যুবক তার স্পর্ধা থেকে জানতেন, এ দেশকে বাঁচাতে হবে। শ্রমিক-চাষী-মজুর-ছাত্র তাইতো পিছু ফিরে তাকায়নি। তাইতো একজন পিতা জানতেন, তার ছেলে যুদ্ধে গেছে। সেই তরুণরা রাজনীতির ধূর্ত মানুষদের মতো ভারতের হোটেলগুলোর স্বপ্ন দেখেনি। এরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো শেখ মুজিবের সেই অগ্নিঝরা কবিতায় ’এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।‘
সেই সংগ্রামের কাহিনী আজকের প্রজন্মের কাছে সত্যিই এক রূপকথা। শোকগাথা সারা জাতির। তবুও আমরা বিজয়ী। মাত্র ন’মাসের সংগ্রামে, সশস্ত্র যুদ্ধে জিতে যাওয়া একটা জাতি। একটা দেশ।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। আমরা ৪১টি বছর পেরিয়ে এসেছি আমাদের স্বাধীনতার। হিসেবের দিক থেকে সে-তো অনেক দিন অনেক বছর। এখন টগবগে যৌবন নয় আমাদের বিজয়ের। এখন আবেগ নয় আর এই দেশ নিয়ে। ৪২ বছরের বাংলাদেশ এখন যেন পরিপক্ক যুবক। অথচ পরিপক্কতার এই যৌবনবেলায় বাংলাদেশ যেন নতুন করে দেখছে পরাজিত প্রেতাত্মাদের। রাজনীতির পরাজিত প্রেতাত্মারা যারা স্বাধীনতার এমনকি কনসেপ্টে পর্যন্ত বিশ্বাস করে না, কী নির্মম-নিষ্ঠুর আমাদের রাজনীতি সেই প্রেতাত্মারা বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসে তাদের গাড়িতে উড়িয়েছে রক্তলাল পতাকা। নিষ্ঠুর পরিহাসে এরা ব্যঙ্গ করেছে স্বাধীনতাকে। পবিত্র ধর্মের নাম নিয়ে এরা লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছে, ধর্ষণে উন্মত্ত হয়েছে। জ্বালিয়েছে ভিন্ন ধর্মের স্থাপনা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পদতলে মাড়িয়ে এরাই এই বাংলাদেশকে নতুন করে তৈরি করতে চেয়েছে এক ঘৃণ্য মৌলবাদী-দেশে, যেন পাকিস্তানের সোয়াত। যেখানে মালালারা নির্মমতার শিকার হয়। সেজন্যেই একে একে এই বাংলাদেশে নির্মমতার শিকার হয়েছেন শামসুর রাহমান, হুমায়ুন আজাদদের মতো বাংলাদেশের বিবেক। সেই ঘৃণ্য মইত্যা-মুজাহিদ-সাঈদীদের কারণেই সারা বাংলাদেশ প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিলো মৌলবাদী বোমায়। স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুদের এক একটি বোমা হামলা সারা পৃথিবীতেই যেন জানিয়ে দিচ্ছিলো, এই বাংলাদেশ ধর্ম নিরপেক্ষতার নয়, এদেশ সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে ভরা।
কিন্তু জনগণ ভুল করেনি। বলতে গেলে স্বাধীনতাবিরোধী সেই শক্তিকে পরাজিত করতেই যেন গত নির্বাচনে আওয়ামীলীগের জয়। কিন্তু আওয়ামীলীগ! অধিকাংশ এমপি-মন্ত্রী, ছাত্রলীগ-যুবলীগ জেলায় জেলায় যেন মূর্তিমান আতংকের নাম। টেন্ডার-চাঁদাবাজি এখন এদের নিত্য সহচর। দেশের সর্বোচ্চ জায়গায় ভিত বসিয়েছে দুর্নীতি। একজন সৈয়দ আবুলকে সামাল দিতে পারছে না গোটা দেশ, গোটা প্রশাসন। সিলেটের এমসি কলেজের হোস্টেল পোড়ানো কিংবা রামুর সাম্প্রদায়িক আগুন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে রাজনীতির সহিংসতা। কিংবা এই যে ৯ ডিসেম্বরে বিএনপি-জামায়াতের অবরোধকে কেন্দ্র করে সরকার দলীয় তরুণ-তুর্কীদের আক্রমণে নিরীহ বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ড--এর জবাবে সরকার কী বলবে? কী জবাব দেবেন আমাদের নেতা-নেত্রীরা বিশ্বজিতের মা কল্পনা দাস কিংবা জন্মদাতা পিতা অনন্ত দাশকে? সহিংসতার রক্তাক্ত এই ধারার শেষটা কোথায়? কিন্তু তবুও একটা আশাবাদ নিয়েই বলতে হয়, কিছু খুনি কিংবা কিছু ভাড়াটে দুর্বৃত্ত কখনো একটা দেশের সামগ্রিক চিত্র হতে পারে না। আমাদের আশাবাদী হতেই হবে। ষোল কোটি মানুষের এই বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে শিক্ষায় ঘটেছে বিপ্লব, কৃষিতে এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন, সাধারণ মানুষের জীবনমানে আসছে ভালো করে বেঁচে থাকার প্রত্যয় নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন।
নিশ্চিন্তপুরে আগুন জ্বলেছে। অঙ্গার হয়েছে মানুষ। শোকবিহবল জাতির মানবিক এগিয়ে আসা আমাদের আশান্বিত করে। এভাবেই তো এগিয়ে যায় একটা সমাজ, একটা দেশ। চাপ-দাবি গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় আমাদের করতেই হয়। আমরা হয়তো শিখছি। নিশ্চিন্তপুর আমাদের শেখাচ্ছে, রামু এমসি কলেজের হোস্টেল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করছে, অন্তত সাধারণ মানুষ ওদের জেনেছে-চিনেছে। জনগণ কিন্তু এ থেকেই প্রস্তুত হচ্ছে আগামীর দিনগুলোর জন্যে।
সাহসিকতা দেখিয়েছে এই সরকার। কাঁধ বাঁকা করে যে মুজাহিদ ব্যঙ্গ করতেন সারা জাতিকে ঐ ক’বছর আগেও, সেই রাজাকারকে হাজতে পুরেছে বাংলাদেশের আইন। রাজনীতির নষ্ট-নোংরা-সাম্প্রদায়িক শক্তি আযম-মইত্যা-আলীম-সাঈদীদের হাজত-বাস এই বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত হলেও তা ছিলো তারুণ্যের কাছে গোটা জাতির কাছে চিন চিন বেদনার,অর্থাৎ এদের বিচার যেন ছিলো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নিয়ে গাল-গল্প আমাদের শিউরে দিতো। বলা হতো: খুনি-লম্পটদের কিছু করতে গেলেই বাংলাদেশ বিশ্বে একঘরে হয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে লাখ লাখ মানুষ ফিরে আসবে দেশে। যেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের পিতার কিংবা পিতামহের। কূটনীতিতে কখনো কখনো নতজানু মনোভাব আসে। আসতেই পারে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে উন্নত দেশগুলোর সাথে মেপে মেপেই চলতে হয়। সেকারণে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও সে ধারার বাইরে নয়। সৌদিআরবের কূটনীতিক হত্যা নিয়ে বাংলাদেশ ছিলো বিব্রত। কিন্তু উতরে এসেছে। এভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন শুধু মৌলবাদীদের বাপ-দাদার যে দেশ নয়, তা প্রমাণ হচ্ছে। কূটনৈতিক তৎপরতা প্রভাব ফেলে, তা কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্র প্রমাণ করছে বারবার। যদিও বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোর ব্যর্থতা অনেক সময়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।
আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সারা বাংলাদেশে চলছে যেন শাসরুদ্ধকর অবস্থা। একদিকে এদের বাঁচানোর চেষ্টা। অন্যদিকে জাতিকে রাহুমুক্ত-পাপমুক্ত করার এক পদক্ষেপ। এই ডিসেম্বরে মানুষ বুক বেঁধে আছে বিচারের রায় শুনবে বলে। মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া একাত্তুরের সেই অপরাধীদের বিচার হবে। কিন্তু কেন জানি সেই অপরাধীদের দোসররা এখন মরণকামড় বসাচ্ছে। সারা বাংলাদেশ এখন চোরা-গোপ্তা হামলার অভয়ারণ্য যেন। রাস্তায় পুলিশকে পেটাচ্ছে জামাত-শিবির। প্রতিদিন। বিএনপি‘র হরতাল অবরোধ দেখেছি। প্রকাশ্যে পুলিশ পেটানোর উদাহরণ খুব অল্পই আছে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের দোসররা। পৃথিবীর দেশে দেশে ‘বাংলাদেশ বাঁচাও’ নাম নিয়ে যুদ্ধাপরাধী বাঁচানোর আন্দোলন চোখে পড়ার মতো। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট স্কোয়ারে পর্যন্ত হয়েছে এই বাঁচানোর আন্দোলন। ব্রিটেন সরকারের কাছে নতজানু হয়ে দাবি তুলছে তারা যুদ্ধাপরাধী বাঁচানোর। এই এরাই হরতালে আমরিঁকান অ্যাম্বেসির গাড়ি পোড়ায়, আবার মুহূর্তেই ক্ষমা চায়। ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যে আবদার করে। এরা এখন তাদের ভাষায় ‘বিধর্মী’দের ছায়াতলে শান্তির সুবাতাস চাইছে।
ধর্মের নাম নিয়ে পাকিস্তান টিকিয়ে রাখার জন্যে হত্যা-ধর্ষণ-আগুন দিয়ে যারা মনে করেছিলো পার পেয়ে যাবে, সেই ঘাতকরা এখন অন্তিম দিন গুনছে। দেশ তাকিয়ে আছে এদের বিচার দেখতে। আর ব্রিটনে-আমেরিকার দিকে চেয়ে আছে এখন সেই অপরাধীরা। এখন পিতা-পিতামহের কিবলা যেন ফিরে গেছে। কিন্তু আমরা আশাবাদি দায়মুক্তি ঘটছে একটি দেশের, আমাদের বাংলাদেশের। দুর্নীতি আছে এই দেশে। এই দেশে আবুলরা আছে, এই দেশে ছাত্রলীগ আছে, আছে ছাত্রদল। জনগণ তাদের দুঃশাসন চায় না, চায় না রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন। একথাগুলো বার বার উচ্চারিত হয়। উচ্চারিত হবে। আমরা আশাবাদী এই উচ্চারণ বৃথা যেতে পারেই না। তারুণ্যের জাগরণে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এই জাগরণকে আরও শক্তিশালী করতেই হবে। কিন্তু তার আগে রাষ্ট্রীয় যে জাগরণ সারা দেশটাকে আনন্দে ভাসিয়ে দিতে পারবে তাহলো ঐ অপরাধীদের বিচার। ডিসেম্বর মাসটা জেগে উঠুক নতুন জাগরণে, নতুন বছরের শুভ সূচনা হোক বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের দায়মুক্তির মধ্যি দিয়ে। এ দায় যুদ্ধাপরাধীদের অপরাধ বয়ে বেড়ানোর দায় থেকে মুক্তির।
ফারুক যোশী: যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাংবাদিক ও কলাম লেখক
faruk.joshi@gmail.com