ছোট্ট এই সিঁড়ি ঘরটায় আর কয়জনেরইবা জায়গা হবে! আলতাফ সাহেবের উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। যদিও মেহেরুন্নেসা বলেছেন, অসুবিধা নেই। সবাই একটু কষ্ট করে বসলেই আরো দুই তিনটা পরিবারের জায়গা হয়ে যাবে কোনো রকমে। আজ রাতে তো কেউ আর ঘুমুবে না। সকাল নাগাদ খেলা শেষ হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। কেবল ভালোয় ভালোয় রাতটা পার হলেই হয়। আলতাফ সাহেবের উৎকন্ঠা তবুও কমে না। আর কি কেউ আসবে?
শিরীন আপা আর মফিজ স্যারের ফ্যামিলি আসবে নিশ্চয়ই। আজ রাতে এই সিঁড়ি ঘরের চেয়ে নিরাপদ জায়গাতো আর কোথাও নেই। উনারা হয়তো নামাজে দাঁড়িয়েছেন। একটু পরেই এসে পড়বেন, রাতের খাওয়াটা অগ্রিম সেরে নিয়ে। দুই পরিবার মিলে তো সাত জন মাত্র। তুমি ভেবোনা। সবাই মিলে যে যার ছোট বাচ্চাগুলোকে কোলে নিয়ে রাখলেই হয়ে যাবে। ময়নার মা, ফ্লাস্কে চা এনেছো? তোমার দুলাভাইকে এক কাপ চা দাও।
হ আফা, দিতাছি। আপনেরেও দেই এক কাপ?
আচ্ছা দাও, লতিফ স্যার, মাজেদা আপা আর রফিক দুলাভাইকেও দিও। মনে হচ্ছে সারা রাত জাগতে হবে। চা খেলে একটু চাঙ্গা থাকা যাবে। আহা বাচ্চাগুলো যদি একটু ঘুমাতে পারতো! এখনি হয়তো শুরু হয়ে যাবে। ভয়ে ওদের যে কী হবে! আহারে!
লতিফ সাহেব এতোক্ষন চুপচাপ বসেছিলেন। তার স্ত্রী পাশে বসে আছেন বড় একটা ঘোমটা দিয়ে। কোলে নয় মাসের ছেলে বিপ্লব। মার্চ মাসে জন্ম। চারিদিকে তখন শ্লোগান আর মশাল মিছিল। ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা’। ‘বীর বঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। সে এক বিপ্লবের সময়। ছেলের নাম তাই বিপ্লব। কিন্তু পঁচিশের রাতে শহরে মিলিটারি নামার পর থেকেই ডাক নামে আর ডাকা হচ্ছে না। এখন ওকে আসল নামেই ডাকা হয়। লিয়াকত। কেউ জিজ্ঞেস করলেই লতিফ সাহেব বলেন ‘লিয়াকত আলী খানের নাম অনুসারে রেখেছি। ভালো হয়েছে না?’
আসলে বিপ্লবের জন্মের পর জামিলা বলেছিলেন ছেলের আসল নামটা তোমার নামের সাথে মিলিয়ে রাখো। লতিফের ছেলে লিয়াকত। কেমন হয়? দু’জনেরই পছন্দ হয়েছিল। এখন অবশ্য কাজে লাগছে। আপাতত সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকেই রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে পাকিস্তানি সোলজারগুলো যা গাধামার্কা! আদৌ কি লিয়াকত আলী খানের নাম শুনেছে? কত বছর আগের কথা। এসব কথা ভাবতে ভাবতে লতিফ সাহেব নড়ে চড়ে উঠলেন।
কী যে বলেন বড় আপা! কিছু একটা শুরু হয়ে গেলে বাঁচা মরারই ঠিক নেই। বোমা যদি এখানে পড়ে তাহলে কি সত্যি আমরা বাঁচতে পারবো? আগে বাঁচলে তারপর তো ভয়।
আরো কয়েকজন মাথা নাড়ে। জামিলা ঘোমটার ভিতর থেকে নিচু স্বরে বলেন, তোমরা একটু কথা কম বলে দোয়া দুরুদ পড়ো। বাঁচানোর মালিক তো আল্লাহ। ছেলেটা সেই বিকেল থেকেই একটু পর পর কাঁদছে। বমিও করেছে দু’বার। পেট একটু বেশি ভরা ভরা মনে হচ্ছে। পেট ফাঁপলো কিনা কে জানে! জামিলা কোলের মধ্যে দোল দিয়ে বিপ্লবকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করেন। না, বিপ্লব না। আজ রাতেও সে লিয়াকত আলী। এমনও হতে পারে কাল সকাল থেকেই বহুদিন পর ওকে বিপ্লব নামে ডাকা হবে। হে আল্লাহ! তুমি এই বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করো। জামিলা মনে মনে একটা খাসি মানত করে ফেলেন।
মাজেদা আপার স্বামী রফিক সাহেব বললেন, ভাবী ঠিকই বলেছেন, হায়াত মউতের মালিক আল্লাহ্। আমরা শুধু সাবধানে থাকার চেষ্টা করতে পারি। ভাগ্যিস বড় আপা বুদ্ধি করে সিঁড়ি ঘরের সামনে রাজমিস্ত্রী দিয়ে একটা দেয়াল তুলিয়ে ছিলেন। উনিতো সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিংয়ের সময় এসব জেনে নিয়েছিলেন। কী বলেন আপা?
মেহেরুন্নেসা মাথা নাড়েন। সত্যি তো, মার্চে আওয়ামী লীগের পরিচালনায় শহরে যে সব সিভিল ডিফেন্স এবং ফার্স্ট এইড ক্যাম্প পরিচালিত হতো তিনি তার সুপারভাইজার হিসাবে ট্রেনিং তদারক করতেন। ওই সময়ই জেনেছেন বোমা বর্ষণের সময় মাটির নিচে পরিখা বা বাংকার আর বহুতল ভবনের সিঁড়ি ঘরের সামনে দেয়াল তোলা থাকেলে তা অন্য যে কোনো জায়গার চেয়ে বেশি নিরাপদ। অবশ্য নিরাপদ বলে যুদ্ধের সময় যদি কোনো কিছু থাকে। তবু ডুবন্ত মানুষ খড়-কুটো যা পায় তাই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। অক্টোবরের শেষ দিকে যুদ্ধ যখন আস্তে আস্তে শহরের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করেছে তখন ম্যানেজিং কমিটিকে দিয়ে অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন স্কুলের দোতলা দালানের সিঁড়ি ঘরের সামনে এই প্রতিরক্ষা দেয়ালটা তোলার। ভাগ্যিস ওরা সম্মতি দিয়েছিল। সে জন্যই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ আশেপাশের আট দশটা পরিবার আশ্রয় নিতে পেরেছে। আজ সবাই মেহেরুন্নেসার কাছে কৃতজ্ঞ। বিপদ আসুক বা না আসুক, কিছুটা হলেওতো নিরাপত্তা বোধ আছে।
এরই মধ্যে শিরীন আপা আর মফিজ স্যার তাদের পরিবার নিয়ে চলে এসেছেন। মফিজ স্যারকে একটু বিরক্ত মনে হলো। ‘কোথায় আপা, শহরতো চুপচাপ মনে হচ্ছে। একবার ভাবছিলাম আসবো না। বাঁচি-মরি নিজের বাসায়ই থাকি। কিন্তু শাহেদের মা রাজি হচ্ছিল না। বললো, ঝুঁকি নিয়ে লাভ কী! তাই চলে এলাম। আমার কিন্তু মনে হচ্ছে না কিছু হবে বলে। হবে কীভাবে! পাকিস্তানি সোলজাররা হচ্ছে পৃথিবীর সেরা যোদ্ধা। শুনেননি, আইউব খান বলেছিলেন, যদি পাকিস্তানি সোলজার আর ইন্ডিয়ান
আর্মি অফিসারদের এক করতে পারতেন তবে তিনি বিশ্ব জয় করতে পারতেন।
মফিজ সাহেব আপনি থামবেন? আল্লাহ আল্লাহ্ করুন। মেহেরুন্নেসার চোখে-মুখে ভয় আর বিরক্তি।
সাধে কী বলছি বড় আপা। কোথাওতো একটা টু শব্দও শুনতে পাচ্ছিনা।
শুনবেন তো বটেই। আজ রাতে না শুনলে কাল রাতে। না হয় পরশু। ওদের আর বেশিদিন নেই। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, আকাশবাণী, স্বাধীন বাংলা বেতার এসব কিছু শুনছেন না?
আপা কতো কিছুইতো শুনি। যুদ্ধের সময় বাতাসে গুজব ভেসে বেড়ায়। কোনটা সত্যি, কোনটা গুজব বুঝবো কী করে!
ধুর! কোথায় তোমাদের স্বাধীন বাংলা আর আকাশবাণী! কিছুই ধরা যাচ্ছেনা ঠিক মতো। আলতাফ সাহেব মেহেরুন্নেসার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকালেন। ছোট দু’ছেলে সজীব আর শান্তকে দু’পাশে বসিয়ে বড় ছেলে শিবলীকে নিয়ে রেডিওর নব ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। শিবলীর কাছে রেডিওটা দিয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে মেয়েকে এনে কোলে নিলেন। বাবার কোলে এসে রোকেয়া ভীষন খুশি। হাততালি দিয়ে উঠলো নিজে নিজেই। শিবলীর হাত থেকে নিয়ে রফিক সাহেব রেডিওর নব ঘোরাতে লাগলেন। সিঁড়ির নিচে রেডিওর রিসিপশন ভালো না। স্বাধীন বাংলা বেতারতো দূরের কথা আকাশবাণীর কথাও অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তার ওপর এখন সংবাদ বুলেটিন বাদ দিয়ে কে যেনো উচ্চাঙ্গ সংগীর গেয়ে চলেছে অনেক্ষণ যাবত। অসহ্য। বিবিসির খবর পৌনে আটটায়। এখনো ঘণ্টাখানেক বাকি। আর ভয়েস অব আমেরিকা তো সেই রাত ১০টায়। ততক্ষণে কী হবে কে জানে! সিঁড়ি ঘরের নিচে আশ্রয় নেয়া লোকগুলো বেঁচে থাকবে তো! রফিক সাহেব মনে মনে আয়াতুল কুরসী পড়তে থাকেন আর রেডিওর নব ঘোরাতে থাকেন। যদি কোনো রকমে স্বাধীন বাংলা বেতার ধরা যায়। অন্তত জানা যেতো দুপুর থেকে যা শোনা যাচ্ছে তার কোনটা সত্যি আর কোনটা গুজব।
মফিজ সাহেব এবারে অধৈর্য হয়ে উঠলেন। বললেন, ভাই স্বাধীন বাংলা বেতার যা বলবে সেটাই যে সত্যি বুঝবেন কী করে?
তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন স্বাধীন বাংলা বেতার মিথ্যা কথা বলে? গুজব ছড়ায়?
ভাই রাগ করছেন কেন? আমি কি তাই বলেছি নাকি! ওরাতো আর বিবিসি ভয়েস অব আমেরিকা না যে যুদ্ধের ময়দানে বিদেশি সাংবাদিক পাঠিয়ে খবর নেবে। মুক্তিবাহিনী যা খবর দেয় ওরাতো সেই খবরই প্রচার করে। যুদ্ধের সময়তো কতো রকম খবরই রটে। কোনটা সত্যি। কোনটা গুজব, প্রোপাগান্ডা।
সবাই ভাবে মফিজ সাহেবের কথাটা একেবারে ফেল না নয়। আজ দুপুর থেকেই সারা শহর পরিণত হয়েছে গুজবের শহরে। এরকম বিভিন্ন গুজবের ভিত্তিতেই সবাই এখানে আশ্রয় নিয়েছে। মুক্তিবাহিনী আর ভারতীয়রা আজ আদৌ শহর আক্রমণ করবে কিনা কে জানে! আলতাফ সাহেব সকালে স্বাধীন বাংলা বেতার আর আকাশবাণীর খবরে শুনেছেন গত রাতে মুক্তিবাহিনী আর ভারতীয় বাহিনীর যৌথ আক্রমণের মুখে যশোহরের পতন হয়েছে। পরে বিবিসিও তাই বলেছে। দুপুরেই খবর ছড়িয়ে পড়েছে আজ রাতেই কুমিল্লা আক্রমণ করা হবে। সত্যি না কি গুজব কে জানে! কিন্তু ঝুঁকি নেয়ার সাহস হয়নি কারোই। তারা সবাই থাকেন স্কুলের আশেপাশে। সেখান থেকে কুমিল্লা বিমান বন্দরের দূরত্ব মাত্র আড়াই মাইল। যদি আসলেই বিমান আক্রমণ হয় তাহলে রাতের আঁধারে দু’একটা বোমা যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এদিক ওদিক পড়বেনা সেই নিশ্চয়তাই বা কে দেবে! আর বিমান বন্দরে থাকা পাকিস্তানী অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গানগুলোওতো আর বসে থাকবে না।
তবে আক্রমণ না হলেও ক্ষতি নেই। সারারাত সবাই মিলে আড্ডা দিয়ে ভোরে যে যার বাসায় ফিরে যাবেন। একটা মিনি পিকনিক আর কী! শুধু যে যার বাসা থেকে সন্ধ্যা না হতেই রাতের খাবার খেয়ে এসেছে এই যা। তবে মেহেরুন্নেসা সবার জন্য মুড়ি, চানাচুর আর টোস্ট বিস্কুটের ব্যবস্থা করেছেন। ময়নার মা কয়েক ফ্লাস্ক চা এনে রেখেছে। রাতটা আতংকে কাটলেও ক্ষুধায় কষ্ট হবেনা।
দুপুরের আগেই শহরময় রটে গিয়েছিলো আজই মুক্তিবাহিনী কুমিল্লায় ঢুকবে। একদল সালদা নদী দিয়ে আরেক দল বিবিরবাজার সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়েছে। এগারোটা নাগাদ একদল গোমতী নদীর উত্তর দিকে আরেক দল চৌয়ারা বাজারের কাছে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক তাদের নিয়ন্ত্রণে। কেউ কেউ বললো ওরা দুপুরের পরেই শহরে আক্রমণ চালাবে। আবার কেউ বললো ওরা রাতের অন্ধকারে ভারতীয় বিমান বাহিনীর এয়ার রেইডের কাভারে শহর আক্রমণ করবে। শোনা গেল, শহরের দক্ষিণ দিকে পদুয়ার বাজারের কাছে কুমিল্লা লাকসাম সড়কও মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে গেছে। একমাত্র পশ্চিমে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের দিকে পালানো ছাড়া হানাদার পাকিস্তানিদের আর উপায় নেই। তাইতো! ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট তো শহর থেকে খুব বেশি দূরে না। মুক্তিবাহিনী যদি ক্যান্টনমেন্ট একই সাথে দখল না করতে পারে তবে কি শহরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে? মানুষ এতো দূরের ভাবনা ভাবতে পারেনা। আতংকে আর উত্তেজনায় তাদের রক্ত হিম হয়ে আসছে। সবাই কেবল আজ রাতের চিন্তায়ই মগ্ন।
সবচেয়ে উত্তেজনাকর খবরটা নিয়ে এলেন আমিনুল বিএসসি। ভদ্রলোক আসলে ইন্টারমেডিয়েট পাশ। স্কুলের জন্য যোগ্য কোনো গ্র্যাজুয়েট করা বিজ্ঞান আর গণিত শিক্ষক না পাওয়ায় তাকেই বিষয়গুলো পড়াতে হয়। সে জন্যই তার পদবী বিএসসি। তিনিও নামের চেয়ে পদবীতে পরিচয় দিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। দুপুরে কি একটা কাজে গিয়েছিলেন স্টেশন রোডে চাচাতো ভাইয়ের বাসায়। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ফিরলেন। মেহেরুন্নেসা তখন মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছেন। পাশের চেয়ারে বসে শিবলী ডা. লুৎফুর রহমানের ‘উন্নত জীবন’ পড়ার চেষ্টা করছে। ছেলেটার এই বয়সেই কত কিছু পড়ার সখ। কোনো কোনো বই বুঝতে পারে, কোনো কোনোটা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনা। তবুও চেষ্টার কমতি নেই। আলতাফ সাহেব রেডিওতে কান পেতে আকাশবাণী শোনার চেষ্টা করছেন লো ভলিউমে। পাছে শব্দ ঘরের বাইরে চলে যায়!
বিএসসি সাহেব বললেন, দুলাভাই রেডিও বন্ধ করুন। খবর আমার কাছে শুনুন।
কেন, কি হয়েছে?
মেজর বোখারীতো পালিয়েছে।
‘আপনাকে কে বললো? নাকি গুজব?’ এবারে মেহেরুন্নেসা যোগ দিলেন।
কারো বলতে হবে না। নিজের চোখে দেখে এসেছি।
মানে?
আপা, আমি গিয়েছিলাম সাত্তার ভাইয়ের বাসায়, স্টেশন রোডে। ফেরার পথে রাণীরবাজারের সামনে দিয়ে ফিরছিলাম রিক্সায়। ওখানেইতো মেজর বোখারীর অফিস আর ক্যাম্প। রিক্সাওয়ালা চুপিচুপি বললো একটু আগেই নাকি মেজর বোখারী তার দলবল নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে চলে গেছে তিনটি জীপ আর চারটি ট্রাক নিয়ে। শুনলাম এক জীপ আর এক ট্রাক ভরা নাকি শুধু মেয়ে মানুষ। বাকিগুলোতে সোলজার আর অফিসার। আহারে! আজ রাতে যে মেয়েগুলোর কী হবে! আল্লাহ তুমি রহম করো। তুমি ইজ্জত বাঁচানের মালিক।
আপনি থামুনতো আমিনুল সাহেব। এই বর্ণনা আর শুনতে চাইনা। আপনিনা বললেন নিজের চোখে দেখে এসেছেন। এখন বলছেন রিক্সাওয়ালার কাছে শুনেছেন।
ওই একইতো কথা। রিক্সাওয়ালা নিজের চোখে দেখেছে। আমি তার কাছ থেকে নিজের কানে শুনেছি। এর মধ্যেতো কোন ভায়া মিডিয়া নেই।
বুঝলাম। কিন্তু রিক্সাওয়ালা কী করে বুঝলো যে তারা পালিয়ে যাচ্ছে? পশ্চিম দিকে যাওয়া মানেই কি ক্যান্টনমেন্টে রিট্রিট করা নাকি? ওরা তো শাসনগাছায় শান্তি কমিটির কারো বাসায় দাওয়াত খেতেও যেতে পারে।
বড় আপা কী যে বলেন! ভাবগতিক দেখলে বোঝা যায় না? আমার খবর দেয়ার, দিয়ে গেলাম। সামাদের মা আর বাচ্চাদের নিয়ে আমি এখনি চলে যাচ্ছি রামপুর। আজ রাতটা এয়ারপোর্টের এতো কাছে থাকা নিরাপদ মনে হচ্ছেনা। রিক্সা দু’টি বসে আছে। যাই বড় আপা। সাবধানে থাকবেন। যদি বেঁচে থাকি কাল না হোক পরশু দেখা হবে। যদি দেখা না হয় ভুল ত্রুটি মাফ করে দেবেন।
আমিনুল বিএসসি চলে যান। আলতাফ সাহেব দরজা বন্ধ করেন। মেহেরুন্নেসা আনমনে তার চলে যাওয়া দেখেন। মেয়েটি কোলে। ছেলে তিনটি পাশে ঘুরঘুর করছে। শিবলী দু’বছর আগেও এই ‘বড় আপা’ বিষয়টা বুঝতে পারতো না। বুঝবেই বা কি ভাবে! ওর বয়স এখন নয়। এখনই এতো জটিল বিষয় বোঝার কথা নয়। আর দু’বছর আগে তো প্রশ্নই ছিল না। ভাবতো অন্য অনেক স্যার আর খালাম্মাদের তো ওর মায়ের চেয়ে বুড়ো মনে হয় দেখলে। স্কুলের শিক্ষিকাদের সে খালাম্মা ডেকেই অভ্যস্ত। মায়ের সহকর্মী বলে কথা। তারা সবাই মায়ের চেয়েও লম্বাও। কিন্তু সবাই কেন মাকেই বড় আপা বলে? আলতাফ সাহেব বুঝিয়ে বলেছেন, তোমার মা উনাদের সবার চেয়ে বেশি পড়াশুনা করেছেন। অন্যরা সবাই বেশি বয়সের হলেও তোমার মা’ই সবার হেড। তোমাদের স্কুলের হেড স্যারের মতো। মেয়েদের স্কুলের হেড যদি মহিলা হন তবে সবাই তাকে বড় আপা বলে। শিবলী মাথা নেড়েছে।
মেহেরুন্নেসা ছিলেন চট্টগ্রামের পাহাড়তলী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। দু’বছর আগে কুমিল্লায় লুৎফুন্নেসা গার্লস স্কুলে প্রধান শিক্ষিকার খালি পদে চাকরির অফার পেয়ে গেলেন। ইংরেজির শিক্ষিকা, বিএড এ প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে হারাতে চাইলোনা। স্কুলের কোন স্টাফ কোয়ার্টার ছিল না। ওরা জানালো মেহেরুন্নেসা যদি যোগ দিতে রাজি থাকেন তাইলে স্কুলের ভেতরে বাসার ব্যবস্থা করা হবে। আলতাফ সাহেব প্রথম দিকে নিমরাজি ছিলেন। রেলওয়ের এমন আকর্ষণীয় চাকরিটা ছেড়ে আসতে মন চাইছিলোনা। অনেক সুযোগ-সুবিধা। তিনি রেলওয়ের অ্যাকাউন্টেন্ট। তাই কুমিল্লায় বদলি হবার সুযোগ নেই। নতুন চাকরি জোগাড় করতে হবে। মেহেরুন্নেসা তাকে বোঝালেন। নিজেদের গ্রামের বাড়ির কাছাকাছি থাকার এই সুযোগ ছেড়ে দেয়া ঠিক হবেনা। আলতাফ সাহেব যে দূরে থাকার কারণে বাবা মায়ের মৃতদেহও দেখতে পারেননি, তা মনে করিয়ে দিলেন। খবর পেয়ে চট্টগ্রাম থেকে আসতে আসতেই দাফন সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। কুমিল্লার এসডিও হাফিজউদ্দিন সাহেব তাদের পূর্ব পরিচিত। উনাকে বললে নিশ্চয়ই একটা কিছু জোগাড় হয়ে যাবে। মেহেরুন্নেসা এক রাতে স্বপ্নে দেখলেন তারা জাহাজে করে হজে যাচ্ছেন। শোনা মাত্র আলতাফ সাহেব রাজি হয়ে গেলেন। এই স্বপ্নের অর্থ হচ্ছে তারা মঙ্গলের পথে যাত্রা করছেন। অনিষ্টের পথ ছেড়ে যাচ্ছেন। এসডিও সাহবের চেষ্টায় আলতাফ সাহেবের চাকরি হলো কুমিল্লা পৌরসভায় প্রাশাসনিক কর্মকর্তা হিসাবে। মেহেরুন্নেসার চাকরির সুবাদে স্কুল বিল্ডিংয়ের তিন রুম খালি করে আর বাথরুম টয়লেট সংযোজন করে প্রধান শিক্ষিকার বাসভবনে রূপান্তর করা হলো।
কুমিল্লায় এসে মেহেরুন্নেসা অনেক বেশি সজীব আর কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠেন। চট্টত্রামে তার মন তেমন বসেনি। নিজের শহরে মন পড়ে থাকতো সবসময়। এখন ইচ্ছে হলেই শ্বশুড়বাড়ি যেতে পারেন। আগের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নতুন করে যোগাযোগ হচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনদের সাথে নিয়মিত দেখা হচ্ছে। আলতাফ সাহেবও খুশি। স্কুলের দায়িত্বের পাশাপাশি মেহেরুন্নেসা জড়িয়ে পড়লেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কাজে। ভীষণ উদ্যমী, বিচক্ষণ আর সুবক্তা। সবাই নিজেদের কাজে ডাকেন। দেশের রাজনীতিও তখন নতুন মোড় নিচ্ছে। সবাই শেখ সাহেবের পেছনে ঐক্যবদ্ধ। ছয় দফা আদায় করেই ছাড়বে সবাই। মেহেরুন্নেসা ভাবলেন, শুধু স্কুলকে দিলেই চলবেনা, দেশকে দেয়ারও তার অনেক কিছুই আছে। স্বামী ও শুভাকাংখীদের সাথে পরামর্শ করে একদিন আওয়ামী লীগে নাম লেখালেন। ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে কুমিল্লা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা নির্বাচিত হবার পর থেকে তার বাসা একটি রাজনৈতিক আখড়ায় পরিণত হয়। বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা, শলা-পরামর্শ আর পরের দিনের কর্মসূচির পরিকল্পনা চলতে থাকে। বাসায় মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হয়। শিবলী তখন ক্লাস থ্রি’র ছাত্র। তার স্থান হলো মডার্ন স্কুলের হোস্টেলে।
মেহেরুন্নেসা সারাদিন স্কুলের চাকরি আর বিকেলে ফিরে গভীর রাত অবধি সভা, সমাবেশ আর আসন্ন সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। সজীব, শান্ত আর কয়েক মাস বয়সী রোকেয়া বড় হচ্ছে কাজের মানুষের কাছে। নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি অনিশ্চিত হওয়ার আশংকায় এক সময় শিবলীকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলো। নির্বাচনের রাতের কথা বেশ মনে পড়ে শিবলীর। রেডিওতে সরকার কবির উদ্দিন একের পর এক নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয়ের সংবাদ দিয়ে যাচ্ছেন। বাড়িময় নেতা-কর্মীদের হৈচৈ। চট্টগ্রামে ফকা’ চৌধুরীর পরাজয় নিশ্চিত মনে হওয়ায় মিষ্টি বিতরণ করা হলো। সবাই রাত জেগে বুলেটিন শুনছে। মা বললেন ঘুমাতে যেতে। কিন্তু শিবলী রেডিওর সামনে ঠাঁয় বসে রইলো।
নির্বাচনের পর থেকেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে লাগলো। সবাই বলাবলি করতে লাগলো ইয়াহিয়া খান আপনা আপনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেনা। সবাই ভীষণ একটা `গণ্ডগোল` লাগার আশংকা করতে লাগলো। কোনো আক্রমণ হলে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে আর কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হবে সেই ভাবনায় ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগের সবাই মিলে ফার্স্ট এইড আর সিভিল ডিফেন্সের ট্রেনিং নেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সারা শহরে এরকম চব্বিশটি সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হলো। মেহেরুন্নেসাকে সেই সব ক্যাম্প পরিচালনা আর সুপারভিশনের দায়িত্ব দেয়া হলো। তিনি সারা সন্ধ্যা সেই সব ক্যাম্প ঘুরে বেড়ান রিক্সায় করে। শিবলী প্রায়ই সঙ্গে যাওয়ার জন্য গোঁ ধরে। পড়ালেখা শিকেয় উঠে। ২৫ মার্চ রাত ১০টায় তিনি ফিরলেন সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং ক্যাম্পগুলো তদারকি সেরে।
মেহেরুন্নেসার একটা ছুটা কাজের মহিলা ছিল। বুড়ির মা। খুব সকালে সবার ঘুম ভাঙ্গলো তার অস্থির দরজা ধাক্কানোয়। খুব কাছেই বিভিন্ন রকম শব্দ শোনা গেল। জীবনে সেই প্রথম গুলির শব্দ শোনা।
আফা, পাকিস্তানি মেলেটারিরা আইয়া পড়ছে। গুল্লি কইরা মানুষ মারতাছে কইতরের লাহান।
আলতাফ সাহেব দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দিলেন। ভয়ে সবার মুখ শুকিয়ে গেল। বাসার ছাদে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে ভোরের বাতাসে। চারিদিকে গুলির আওয়াজের মধ্যে তিনি ছাদে উঠে পতাকা নামিয়ে আনলেন। সারাদিন দরজা জানালা বন্ধ অবস্থায় ঘরের মধ্যে উৎকণ্ঠায় দিন কাটলো সবার। ঘরে তেমন কিছুই মজুদ ছিল না। এক সের গরুর মাংশ দিয়ে স্বামী ও বাচ্চাদের নিয়ে চার দিন কাটিয়েছিলেন মেহেরুন্নেসা। গৃহবন্দি জীবন কাটতে লাগলো আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায়। দরজা জানালা বন্ধ। সারাদিন গভীর রাত অবধি বিবিসি, আকাশ বাণী, ভয়েস অব আমেরিকা আর স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র শোনা হয় লেপ মুড়ি দিয়ে। শীতকাল না। তবুও লেপ মুড়ি দিতে হয়। পাছে রেডিওর শব্দ বাইরে যায়। রাস্তায় মিলিটারির গাড়ির শব্দ। মেহেরুন্নেসা কুমিল্লা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী। তার বয়স বড়জোড় সাতাশ। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে। আলতাফ সাহেব নির্বাক।
২৯ তারিখ দুপুরের দিকে কারফিউ উঠানো হলো এক ঘণ্টার জন্য। পালিয়ে কুমিল্লা শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় নয়। পরদিন ৩০শে মার্চ কারফিউ উঠানো হলো দুই ঘণ্টার জন্য। আর দেরি করা চলে না। সবাই বেরিয়ে পড়লো। উদ্দেশ্য গ্রামের বাড়ি, চান্দিনা থানায়। কুমিল্লা-ঢাকা মহাসড়কের বাঁ দিক দিয়ে মাধাইয়া বাজার থেকে আরো ৮ মাইল ভেতরে। কুমিল্লা শহর থেকে ২৪ মাইল। রাস্তায় নামলো কিশোর বয়সী কাজের ছেলে সুলতানসহ ওরা ৭জন। রাস্তায় মানুষের কাফেলা। সবাই চলেছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। একটু পরেই আবার কারফিউ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনোরকমে শহরের পশ্চিম সীমানা পেরিয়ে এলো মেহেরুন্নেসার পরিবার।
কুমিল্লা-ঢাকা মহাসড়কটি ময়নামতির উপর দিয়েই যাওয়ায় গ্রামের বাড়িতে সড়ক পথে যেতে হলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা বাইপাসের কোন পথ নেই। কিন্তু সেই পথ কেউই নিরাপদ মনে করলেন না। তারা শাসনগাছা পেরিয়ে মেঠো পথ ধরে গ্রামের রাস্তা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে হাঁটতে লাগলো মানুষের কাফেলা অনুসরণ করে। উদ্দেশ্য ক্যান্টনমেন্টকে নিরাপদে দূরত্বে হাতের ডানে রেখে পার হয়ে যাওয়া। কয়েক ঘন্টা হেঁটে মোহাম্মদপুর গ্রাম। একটা ছোট নদী বা খাল পার হতে হবে। খেয়াঘাটে মানুষ দল বেঁধে উঠছে বিভিন্ন নৌকায়। আলতাফ সাহেব পরিবার নিয়ে উঠলেন একটায়। সূর্য গড়িয়ে তখন বিকেল। কয়েকটি নৌকা এক সাথে অপর পাড়ে ভিড়ল। সবাই এক সাথে নামাতে আবার গড়ে উঠলো মানুষের কাফেলা।
কাফেলার ঠিক কাছেই হঠাৎ বিকটা একটা শব্দ হলো। পাশেই আগুনের লেলিহান শিখা। বোমা! বোমা! বলে সবাই দিকভ্রান্তের মত এদিক সেদিক ভোঁ দৌড়। সবাই দৌড়াচ্ছে আর ভয়ে চিৎকার করছে। শিবলীর এই প্রথম বোমা ফুটতে দেখা। শুধু শিবলীর কেন! আলতাফ সাহেব, মেহেরুন্নেসা, সবার। এই কাফেলার মানুষ গুলোর দেখা প্রথম যুদ্ধ ক্ষেত্র এটি। গোলাগুলির শব্দ আগে শুনলেও এই প্রথম বোমার লেলিহান আগুন দেখা। তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা...
সবাই দৌড়াচ্ছেন। সবচেয়ে ছোট ছেলে শান্ত কাজের ছেলে সুলতানের কোলে আর কয়েকমাস বয়সী রোকেয়া তার বাবার কোলে গামছা দিয়ে বাঁধা। পাছে ফসকে পড়ে যায়। সবাই ক্ষেতের আইল ধরে দৌড়াচ্ছে। কখনো ক্ষেতের ওপর দিয়েই কোনাকুনি পার হচ্ছে। চারিদিকে এলোপাতাড়ি বোমা ফুটছে। কাফেলার সবারই হয়তো এই প্রথম বোমা ফুটতে দেখা। কোনটা কোন ধরনের মর্টারের শেল কে বুঝবে! কেউ বললো যেদিক থেকে বোমা ফুটছে সেদিকেই দৌড়াতে হবে কারণ বোমা নাকি উলটো দিক থেকে ছোঁড়া হয়। আবার কেউ বললো, পাগল হয়েছেন! বাঁচতে চাইলে উলটা দিকে দৌড়ান। দৌড়ে হাঁপিয়ে উঠলে থেমে দুই তিন বার শ্বাস নেয়া। আবার দৌড়। পিপাসায় প্রাণ বের হয়ে যাবার জোগাড়। শিবলীর নয় বছরের শরীর আর চলে না। চারদিকে আগুনের গোলার মতো বোমা ফুটছে। ক্ষেতের ফসল পুড়ে বড় বড় গর্ত হচ্ছে।
একসময় বাবার কোলে বাঁধা গামছার গিঁট শিথিল হয়ে রোকেয়া প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। পাশের একজন ধরে ফেললেন। বললেন– ভাই মেয়েটাকে আমার কোলে দিন। আপনিতো আর পারাছেননা। সবাই আবার দৌড়। কিছুদূর দৌড়ানোর পর ভদ্রলোক রোকেয়াকে একটা ক্ষেতের আইলে নামিয়ে বললেন– ভাই আপনি মেয়েকে নেন। আমি ওই দিকে যাবো না, বলেই উল্টো দিকে ভোঁ দৌড়।
এক পর্যায়ে শিবলীর স্পঞ্জের স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে গেল। সে স্যান্ডেল ফেলে খালি পায়ে দৌড়াতে লাগলো। আলুক্ষেতের আইলে পায়ে কাঁটা বিঁধলো। ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো সে। টান দিয়ে কাঁটা খুলেই আবার দৌড়। একটু দূর গিয়ে হঠাৎ মনে হলো স্যান্ডেল খোয়ানোর জন্য হয়তো পরে বকা খেতে পারে। চারিদিকে এই বোমা ফোটার মধ্যেই আবার ফিরে গেল স্যান্ডেল নিতে। ফিতা ছেঁড়া স্যান্ডেল তুলে নিয়ে কয়েক গজ সামনে আসতেই দেখে স্যান্ডেল জোড়া যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই একটা বোমা ফেটেছে। একটা ছাগল সেখানে ঘাস খাচ্ছিল। সেই ছাগলটা মুহুর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। মৃত্যু থেকে শিবলীর দূরত্ব এক মিনিটেরও কম। মেহেরুন্নেসা ফিরে এসে ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে আবারো দৌড় শুরু করলেন। এ মুহূর্তে সবাই মানবিক বোধহীন কিছু দৌড়ের যন্ত্র যেন। চারিদিকে বোমা ফাটছে। কিন্তু সবগুলোই অলৌকি ভাবে তাদের মিস করছে। মৃত্যু তাদের চারপাশে ভীতিকর কিন্তু নিরাপদ (!) দূরত্বে। এতোগুলো মানুষ কিভাবে এই মুহুর্মুহু বোমার আঘাত পাশ কাটিয়ে অক্ষত ছিল তা সত্যি অলৌকিক। আর যদি কেউ মারা গিয়ে থাকে তাহলে আলতাফ সাহেবরা দেখেননি। তখন আসলে অন্য কোনোদিকে ফিরে তাকাবার অবকাশ ছিল না।
দেখতে দেখতে বোমা বর্ষণ কমে এলো। শিবলীরা এক গ্রামের একটি বাড়ির আঙ্গিনায় এসে হাজির হলো। সাথে আরো দু’তিনটি পরিবার। বাকিরা কে কোথায় গেছে কে জানে! কিন্তু এই বাড়িতে কোনো মানুষজন নেই। দরজা গুলো বন্ধ। কোনো শব্দ নেই। বাড়ি তো নয় যেন মৃত্যুপুরী।
ভাই, বাড়িতে কেউ আছেন? আমাদের একটু আশ্রয় দেবেন? বড়ো বিপদে পড়েছি।
বাড়ির পেছনে চলে আসুন।
নিচু কণ্ঠের উত্তর। বাড়ির পেছনে যেতেই টিনের চালার ওপর গাছ গাছড়ার ডাল-পালা ও পাতা দিয়ে ঢাকা একটি গর্তের ভেতর থেকে মুখ বাড়িয়ে মধ্য বয়স্ক এক ভদ্রলোক সবাইকে ডাকছেন। দূরে তখন আবারো বোমার শব্দ শোনা গেল। সেই গর্তের ভেতরে ঢুকতেই সবাই অবাক। ইংরেজি ‘ডব্লিউ’ আকৃতির একটি বিরাট গর্তে বেশ কিছু পরিবার। জীবনে এই প্রথম বাংকার দেখা। বাংকারের ভেতর থাকা। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সবাই গুটিশুটি মেরে বসে রইলো পরিখার ভেতর। কয়েকজন মহিলা সেই বোমার শব্দের মধ্যেই বাংকার থেকে বেরিয়ে গেলেন রান্না করতে। বোমার তীব্রতা তখন অনেকটাই কমে এসেছে। সবাই সেই গর্তের মধ্যে হ্যারিকেনের আলো জ্বালিয়ে রাতের খাবার সারলো। রাতের বাকি অংশ কাটলো সেই বাড়িতে। বড়রা কয়েকটি খাটে শেয়ার করে। আর ছোটরা মেঝেতে পাটি আর মাদুর বিছিয়ে। অনেকে আবার ভয়ে বাংকারেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে রাতের খাবারের পর আর বোমার শব্দ শোনা যায়নি। একবার ক্লান্তি আর ঘুমে চোখ বুঁজে আসে আবার ভয়ে ঘুম ভেঙ্গে যায়। জানা গেল, তাদের বাড়ি ক্যান্টনমেন্টের খুব কাছে বলে ২৭শে মার্চের দিকেই এই বাড়ির লোকেরা বাংকারটি খনন করেছেন।
পরে শোনা গেছে যে, পাকি বাহিনী সংবাদ পেয়েছিল ৩০শে মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত মেজর খালেদ মোশাররফ তার ট্রুপস নিয়ে ছদ্মবেশে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট আক্রমন করবেন। এতো বড় একটা মানুষের কাফেলা এক সাথে ফেরি পার হতে দেখে হানাদার বাহিনী হয়তো ভেবেছিল এরাই বুঝি খালেদ মোশাররফের ছদ্মবেশি বাহিনী। এই তথ্যের সূত্র বা সত্যতা অবশ্য কেউ জানেনা।
পরদিন ৩১শে মার্চ সকালে পরিস্থিতি শান্ত মনে হলো। সারাদিনে কিছু পথ হেঁটে, কিছু পথ রিক্সায় করে বিকেল নাগাদ চান্দিনা থানা সদরের কাছে মেহেরুন্নেসা সপরিবারে তার এক বোনের বাড়িতে হাজির হলেন। পরদিন সেখানে সকালের নাস্তা সেরে আবার পথে নামা। কিছু পথ হেঁটে, কিছু রিক্সায়, কিছু নৌকায় ১ এপ্রিল বিকেলে গ্রামের বাড়ি পৌঁছলেন ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, ভয়ার্ত কিন্তু জীবন্ত কয়েকটি মানুষ। অবরুদ্ধ কুমিল্লা শহর থেকে মুক্ত গ্রামের বাড়িতে। পুরো পরিবারের সবার তখনো অডিটরি আর ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন। মনে হচ্ছে চারিদিকে বোমা ফুটছে। তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা…
বেশ কিছুদিন পর আবার কুমিল্লায় ফেরা। আলতাফ সাহেব আর মেহেরুন্নেসা দু’জনেই নিজেদের চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। আলতাফ সাহেব মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেননি। হয়তো যুদ্ধে যাওয়ার সাহসের অভাব, সন্তানদের মায়া আর যুদ্ধে গেলে স্ত্রী-সন্তানদের বিপদ হতে পারে এই ভাবনার সমন্বয় তাকে যুদ্ধ থেকে দূরে রেখেছিল। বাকি সময়টুকু কাটলো কুমিল্লা শহরে। অবরুদ্ধ, আতংকিত। মৃত্যুকে কোনোরকমে পাশ কাটিয়ে চলা। অনেক রাত জেগে স্বাধীন বাংলা বেতার, আকাশবাণী, বিবিসি আর ভয়েস অব আমেরিকা শোনা। মাঝে মাঝে উড়ো খবর আসে পাকিস্তানিরা শহরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তান বিরোধীদের তালিকা করেছে হত্যা করার জন্য। রাতে তাদের ধরে নিয়ে যাবে। খবর আসলো মেহেরুন্নেসার নাম সেই তালিকায় আছে। হয়তো গুজব। কিন্তু ঝুঁকি নেবে কে! সন্ধ্যা হলেই ছেলে মেয়েদের ভাগ করে স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যান অন্যদের বাসায় রাত যাপনের জন্য। সকালে আবার ফিরে আসা। এভাবেই চলে আসছে গত কয়েক মাস। কিন্তু আজ রাতটা ব্যতিক্রম। আজ অন্য কোনো বাসাও নিরাপদ নয়। ভারতীয় বাহিনী যদি সত্যি বিমান হামলা করে তবে তা লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে যে কোনো জায়গায়ই পড়তে পারে। এই সিঁড়ি ঘরটাই কিছুটা নিরাপদ। বোমা পড়লেও ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কম হবে। আর সামনে পড়লে প্রতিরক্ষা দেয়ালতো আছেই। হয়তো স্প্রিন্টার গুলো দেয়াল ভেদ করে আসবে। কিন্তু তখন সেগুলো অনেকটাই কমজোর হয়ে পড়বে। এখন পরাজয়ের মুখে হানাদার বাহিনী বা রাজাকার-আলবদররা ঘরে ঘরে এসে ধরে নিয়ে না গেলেই হয়। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন আজ রাতটা কোনোভাবে পার করে দাও। মেহেরুন্নেসা পালাক্রমে আয়াতুল কুরসী, সুরা ইয়াসিন আর দোয়া ইউনুস পড়তে থাকেন। পড়ছেন আর স্বামী সন্তানদের গায়ে ফুঁ’ দিয়ে যাচ্ছেন। তার এখন কিছুটা ভয় হচ্ছে। সত্যিইতো তিনি তেমন করে ভাবেননি। শয়তানগুলো যদি পরাজয়ের মুখে পাগলা কুকুরের মতো হয়ে যায়? যদি তারা খুঁজতে আসে?
স্কুলের আয়া ময়নার মা বলেছিল খবর এনে দেবে। পারেনি। বলেছে সে তসলিমকে জিজ্ঞেস করেছিল, কিন্তু তসলিম জানিয়েছে সে কিছুই জানেনা। রাজাকার তাজুল কমান্ডার এ ব্যাপারে তাদের কিছুই জানায়নি। বলেছে, এসব পরিকল্পনা মেজর বোখারী আর ক্যাপ্টেন সিদ্দিক ছাড়া আড় কেউই জানেনা। তাইতো! ওরা কি সবাইকে জানিয়ে আসবে নাকি লোকজন ধরে নিতে? তসলিম ময়নার স্বামী। আগে রিক্সা চালাতো। রাজাকার বাহিনী গঠনের পর রাজাকারে যোগ দিয়েছে। আগে তাস, জুয়া খেলতো রাত জেগে। ফিরে এসে রাতে বউকে পেটাতো বলে ময়নার মা অনেক কান্নাকাটি করতো। এখন নাকি তাস, জুয়া খেলে না। অবশ্য বউ পেটানোর স্বভাবটা এখনো আছে। ময়নার মা’র ধারনা এই স্বভাবও বদলে যাবে। তাজুল কমান্ডার নাকি তসলিমকে অনেক পছন্দ করে। প্রায়ই ময়নার হাতের রান্না খেতে তসলিমের বাড়িতে যায়। তাজুল কমান্ডার বলে ময়নার রান্নার হাতে যাদু আছে।
বড় আফা, চা দিমু আরেক কাপ? কে কে চা খাইবেন কন। রাইখা লাভ নাই। পরে ঠাণ্ডা অইয়া যাইবো।
না, ময়নার মা। আমি খাবো না। বাকিদের জিজ্ঞেস করো। আর তুমি চায়ের চিন্তা বাদ দিয়ে দোয়া দরুদ পড়ো। তোমার কি ভয় হচ্ছে না?
আফাগো, ডর তো করতাছে। কিন্তুক কী দোয়া করুম এইডাই তো বুজতাছিনা। আমার তো একজন বাঁচলে আরেকজন মরবো। আফাগো, আমি কোন দোয়া করুম কইয়া দেন।
মেহেরুন্নেসা চুপ করে থাকেন। শিরীন আপা বলেন, ‘দোয়া করো যাতে আজ রাতটা আমাদের নিরাপদে কাটে। আমাদের এখন ঘণ্টার হিসাবে, দিনের হিসাবে বেঁচে থাকার কথা ভাবতে হবে। আর দোয়া করো তোমার দু’জনই যাতে বেঁচে ফিরে আসে। আগে তো ফিরে আসুক। তারপর দেখা যাবে।
ময়নার মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার হয়েছে জ্বালা। মেয়ের জামাই রাজাকার। ছেলে গেছে মুক্তিযুদ্ধে। কারো সাথেই যোগাযোগ নেই। বেঁচে আছে কিনা কে জানে! তসলিম দিন চারেক আগে তাদের বাহিনীর সাথে কী এক অপারেশনে গেছে কাবিলা বাজারের কাছে। ওরা গেছে লেফটেন্যান্ট ইসমতের দলকে সাহায্য করতে। আজো ফিরে আসেনি। কোনো খবরও পাঠায়নি। ময়নার গর্ভে চার মাসের সন্তান। মেয়েটা কেবল কেঁদেই চলছে। নুরু খবর পাঠিয়েছিল মাস দু’য়েক আগে। কোথায় আছে জানায়নি। একটি অপরিচিত মেয়ে একদিন ভোরে তার বাড়িতে এসে হাজির। বয়স বিশ/বাইশ হবে। বললো সওদাগর বাড়িতে কাজ করে। আগের রাতে সেই বাড়িতে কয়েকজন মুক্তি এসেছিল। তাকে বলে গেছে এই বাড়িতে এসে খবরটা দিয়ে যেতে যে ওরা নুরুর বন্ধু। সে ভালো আছে। যুদ্ধে ব্যস্ত আছে। যুদ্ধ শেষ হলেই ফিরে আসবে। বলেই মেয়েটা দ্রুত চলে গেছে। এতো ফর্সা একটা মেয়ে সওদাগর বাড়িতে কাজ করে? ওর কথাবার্তাও ঠিক কাজের মেয়েদের মতো মনে হয় না। ময়নার মা ফিরে ডাকতে গিয়েও ডাকেনা। থাক, আলো ফোটার আগেই চলে যাক রাস্তা পেরিয়ে। আহারে! পাকিস্তানিদের নজরে পড়লে মেয়েটার না জানি কী হবে!
পৌনে আটটা বেজে গেছে। যতটুকুই শোনা যাচ্ছে রেডিওতে কান পেতে বিবিসি শুনতে হবে। ভলিউম কিছুতেই বাড়ছে না। মেহেরুন্নেসা স্বামীকে বললেন, তোমাকেতো বলেছিলাম ব্যাটারি ফ্ল্যাট হয়ে আসছে। নতুন ব্যাটারি কিনে আনো। কে শুনে কার কথা!
আলতাফ সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। সবার মনোযোগ এখন রেডিওর দিকে। যতোদূর সম্ভব উঁচিয়ে ধরা হয়েছে। বাচ্চারা ফিস ফিস করে কথা বলছিল। তাদের ধমক দিয়ে থামানো হলো। কেবল থামানো গেল না লিয়াকত ওরফে বিপ্লবকে। সে চেঁচিয়ে চলেছে। আবারো বমি করেছে। কিছুই খাচ্ছে না। জামিলা একবার বাচ্চার দিকে আরেকবার লতিফ সাহেবের দিকে অসহায় চোখে তাকাচ্ছে।
বিবিসি’র সংবাদে নতুন তেমন কিছু নেই। যশোহর পতনের সংবাদই মুখ্য। সেই সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের আরো কিছু সাফল্যের খবর। যদিও মুক্তিবাহিনীর সালদা নদী অতিক্রমের খবর বলা হয়েছে, কিন্তু কুমিল্লা আক্রমণের পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই বলেনি। মফিজ সাহেব বললেন, দুলাভাই, আগেই তো বলেছি কিছুই হবেনা। ময়নামতি থেকে পাকিস্তানি সোলজাররা এখন সালদা নদীতে গিয়ে ওদের হটিয়ে দেবে।
বলেছে আপনাকে! ভাই সকালটা হতে দিন না। বিবিসি কি আক্রমণের আগাম সংবাদ দেবে নাকি? এটাতো গেরিলা যুদ্ধ। নাকি? মুক্তিযোদ্ধারা কি ঢাক ঢোল পিটিয়ে একশনে যাবে? এটা কি ঈসা খাঁ-মানসিংহের মল্লযুদ্ধ?
মফিজ সাহেব আর কথা বাড়ালেন না। ময়নার মা ফ্লাস্ক থেকে পুরুষদের সবাইকে চা দেয়। শিবলীর প্রচণ্ড প্রস্রাবের বেগ হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ যাবত। সাহসের অভাবে বলতে পারছে না। তাছাড়া সেও মনোযোগ দিয়ে খবর শোনার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আর থাকা যাচ্ছে না। কিন্তু যাবেটা কোথায়? বাইরে গিয়ে মাঠে পেসাব করে আসবে? যদি এখনি বিমান হামলা শুরু হয়ে যায়? বাসায় যাবে সুলতানকে নিয়ে? যদি ফিরে আসতে না পারে? যা হয় হবে। সেতো আর কাপড় ভেজাতে পারবে না। বাবা বললেন, ঠিক আছে, যাও। মাঠ পর্যন্ত যেতে হবে না। বাইরের দেয়ালের গায়ে করলেই হবে।
শিবলী আর সুলতান ফিরে আসার আগেই শব্দটা হলো। সে কী বিকট শব্দ! সেই সাথে বিদ্যুৎ চলে গেল। দূরে দক্ষিণ দিকে বিমান বন্দরের দিক থেকে আলোর ঝলকানি দেখা গেল, সেই সাথে একঝাঁক বোমারু বিমানের শব্দ। দ্যা ব্যাটল ফর কুমিল্লা হ্যাজ বিগান। সুলতান আর শিবলী এক দৌড়ে সিঁড়ি ঘরে ঢুকে গেল। ছোট ছোট বাচ্চাগুলো ভয়ে কাঁপছে। কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বড়দের কেউ কেউ নিঃশব্দে আবার কেউ কেউ শব্দ করে দোয়া দরুদ পড়তে লাগলেন। আলতাফ সাহেব কিছুতেই স্বাধীন বাংলা বেতার কিংবা আকাশবাণীর রিসেপশন পাচ্ছেন না। নব ঘোরানো বাদ দিয়ে তিনিও দোয়া পড়ায় সামিল হলেন। লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালেমিন। সিঁড়ি ঘরটা যেন গ্রামের কোনো মক্তব।
আফা, বেলেক আউটতো অইয়া গেল। হারিকেনটা জ্বালাই? কেমন জানি ডর ডর লাগতাছে।
জ্বালাও। কিন্তু সলতেটা কমিয়ে রেখো। আলো যাতে বাইরে থেকে দেখা না যায়।
না, দেখা যাইবোনা। সামনে দেওয়াল আছে না!
সিঁড়ি ঘরের সামনে প্রতিরক্ষা দেয়াল আছে ঠিকই, কিন্তু কোন দরজা নেই। শীতের রাতে হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। ঠাণ্ডা আর ভয়ে দোয়া পড়ার সময় সবার দাঁতে দাঁত বারি খাচ্ছে। হ্যারিকেনের নিভুনিভু আলোয় যে যার কাঁথা কম্বল গায়ে জড়িয়ে নেয়। মফিজ সাহেবের মুখটিই সবচেয়ে বেশি ভয়ার্ত মনে হলো। ময়নার মা আর দোয়া পড়ছেনা। তার চোখে জল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। স্কুল থেকে দুই বাড়ি পরেই ময়না তার স্বামীকে নিয়ে থাকে। কয়েকদিন ধরে একা। তসলিম ফিরে আসেনি কাবিলা বাজারের অপারেশন থেকে। রাতে ময়না মায়ের সাথে থাকে। আজ এখানে আসতে বলেছিল। কিন্তু সে রাজি হয়নি। যদি কেউ তাকে রাজাকারের বউ বলে গাল-মন্দ করে বের করে দেয়! তাছাড়া তাজুল কমান্ডার বলে গেছে, আজই হয়তো তসলিম ফিরে আসবে। কী একটা কাজে নাকি আটকে গিয়েছিল। কয়েকজন গতকাল ফিরে এসেছে। আজ বাকিরা আসবে। এসে যদি ময়নাকে না পায় তার মন খারাপ হবে না? মরতে হয় তিনজন এক সাথেই মরবে। তিন জন! কেন, পেটের জন আছে না? যেই কাহিল কাহিল লাগে! দুষ্টুটা মনে হয় ছেলেই হবে।
বাইরে একটু দূর থেকে একটা মেয়ের চিৎকার ভেসে আসছে। “পায়ে পড়ি, আমারে ছাইড়া দেন তাজুল সাব। হে না আপনের লগে রাজাকারে আছে। হে কই? হে না বলে আইজ আইবো? আপনে আমার ধর্মের ভাই! আমারে ছাইড়া দেন! আমার পেডেতো আপনের সারগেদের বাচ্চা! ভাইনা, মাফ কইরা দেন!”
“ধুর মাগী! তুই অইলি গনিমতের মাল, তোর ভাইনা মুক্তিতে গেছে। তুইতো মুক্তির বইন। তুই গনিমতের মাল। তুই আমার লাইগ্যা হালাল। তোরে খাইলে ছোয়াব অইবো।”
“অই তোরা দেখতাছস কী? মাগীর মুখটা চাইপ্পা ধর। গাড়িতে নিয়ে উডা। তাইরে লইয়া ক্যান্টনমেন্টে যাই। স্যারেরা খাইয়া আইডা থাকলে আমরাও খামু। না, আইডা খাওনের কাম নাই। গাড়িত নিয়াই এক শট মাইরা দিমু। যা যা, সময় নাই, গাড়িত তোল, মালাউনের পুতেরা আবার উপরের থিকা বোমা মারন শুরু করছে।”
সবাই কান খাড়া করে। কিন্তু ময়নার আর কোনো শব্দ পাওয়া যায়না। গাড়ি স্টার্ট দেয়ার শব্দ পাওয়া যায়। “ও আল্লাগো! আমার কী অইলো গো!” গগন বিদারী চিৎকার দিয়ে ময়নার মা সংজ্ঞা হারায়। শিরীন আপা আর মাজেদা আপা মিলে তাকে সটান শুইয়ে দেয়। মেহেরুন্নেসা তার চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দেন।
ভেতরে নানা রকম দোয়া-দরুদের শব্দ, বাইরে ঘন ঘন বোমার আওয়াজ আরো তীব্রতর হয়। কয়েকটা বোমা কাছাকাছি কোথাও পড়লো বলে মনে হয়। শিবলী বাবার জামা আঁকড়ে ধরে রাখে। চারিদিকে বোমা ফুটছে। এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ। কোনটা মেশিন গান, কোনটা এলএমজি কেউ জানে না। আজ তা জানার চেষ্টাও নেই। বোমা ফাটার সাথে সাথেই আলো আর আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে। ভারতীয় বিমানগুলো চারিদিকে বোমা ফেলছে। তবে বিমানবন্দরের দিকেই বেশি। সেখানে থাকা অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানগুলো থেকে প্রত্যুত্তর আসছিল। সেই আলোতে আকাশ উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। বারুদের গন্ধে চারিদিক ভারি হয়ে এলো। জামিলার ছেলেটা মনে হয় কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। অ্যাতো আওয়াজের মধ্যে ঘুমাচ্ছে কিভাবে? অন্য কিছু হয়নি তো? আরেকটা বিপদ সামলানোর মতো মনের অবস্থা এখানে কারোই আর নেই। এর মধ্যে অবশ্য ময়নার মায়ের জ্ঞান ফিরেছে। চোখ খুলে একটু পানি চাইলো খেতে। আর কোনো শব্দ করলোনা। মেহেরুন্নেসা বললেন, চুপচাপ শুয়ে থাকো। আল্লাহ্কে ডাকো। সকাল তো হয়েই এলো। মুক্তিবাহিনী ঢুকে পড়বে একটু পরেই। ওই বেজন্মাগুলো তোমার মেয়েকে কিছুই করতে পারবেনা।”
আকাশে আলো ছড়ানো অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানের গুলির শব্দ আস্তে আস্তে কমে আসতে লাগলো। বিমান থেকে আরো বেশি বোমা পড়তে লাগলো বিমানবন্দরসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায়। বারুদের গন্ধ আরো বেশি তীব্র হতে লাগলো। দূর থেকে অনেক মানুষের চিৎকার শোনা গেল। তারা কে, কোন পক্ষ বা কেন চিৎকার করছে কিছুই বোঝা গেলনা। ‘জয়বাংলা’ শ্লোগান এখনো কোনোদিক থেকেই শোনা যাচ্ছে না। তবে মনে হয় আর দেরিও নেই। এখনি শোনা যাবে। এরই মধ্যে ওরা নিশ্চয়ই কোনো না কোনো দিক দিয়ে শহরে ঢুকে পড়েছে। ময়নাকে ধরে নিয়ে যাওয়া ট্রাকটা কি শহর পার হয়ে গিয়েছে, নাকি কোথাও আটকা পড়লো? মেয়েটা কি পালাতে পেরেছে?
এই সব ভাবনায় সবাই আচ্ছন্ন। শিবলীর মনে পড়ে যায়, ৩০শে মার্চ বিকেলের কথা। সেদিনও চারিদিকে এমনই বোমা ফেটেছিল, এমনই বারুদের গন্ধ ছিল। এমনই আতংক ছিল। সেদিন বোমার শব্দ আর বারুদের গন্ধে একটা শ্বাসরুদ্ধকর ভীতি ছিল। সেদিন বারুদের গন্ধ আর বোমার শব্দকে শিবলী ঘৃণা করতে শিখেছিল। কিন্তু আজকে শিবলীর ভিন্ন অনুভূতি হয়। আতংকের সাথে আজ তার আনন্দও হচ্ছে। তার শহরে বোমা পড়ছে। দালান-কোঠা ভাঙছে। তবুও তার চোখে-মুখে ভীতিময় আনন্দ। তার কাছে এই বোমার শব্দ নতুন করে ভালো লাগছে। সে এই বারুদের গন্ধ ভালোবাসতে শুরু করেছে। কারণ, তার শহর আজ স্বাধীন হচ্ছে। তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা, নয় বছরের একটি বালক বোমার শব্দ আর বারুদের গন্ধ ভালোবাসতে শুরু করলো। আহা, ওর বাবা যদি মুক্তিযুদ্ধে যেতেন! তাহলে আজ সারারাত এই বোমার শব্দে জেগে বাবার জন্য ফুলের মালা গাঁথতো। সকালে যখন বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে বাবা শহরে ঢুকতেন তখন বাবার গলায় মালা পরিয়ে দিত। ভাবতে ভাবতে শিবলীর চোখ একটু লেগে আসে। আর তখনি খুব কাছে বিকট শব্দ করে একটা বোমা ফাটে। উপরে একটা বোমারু বিমান চক্কর খেতে থাকে। পাকিস্তানী সৈন্যদের কয়েকটা পলায়মান গাড়ির শব্দ শোনা যায়। শিবলীর আর ঘুম আসেনা। কারোই না। সবাই সকালের অপেক্ষায় থাকে। ক্যালেন্ডারে তখন ৮ই ডিসেম্বর, ১৯৭১।
বাংলাদেশ সময়: ১৯৩৫ ঘণ্টা, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১২
সম্পাদনা: আহ্সান কবীর