banglanews24.com home page Independence Day of Bangladesh | 26th March, 1971
banglanews24.com home page প্রচ্ছদ

প্রচ্ছদ » গল্প

গল্প

মজনুর ভয়

স্কেচ: আহসান হাবীব
আহসান হাবীব
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

১৯৭১ সালের মে মাস। মহিমপুর গ্রামের একটা শান্ত পুকুরে ছিপ ফেলে বসে আছে মজনু। মাছ মারার দিকে অবশ্য তার মন নেই। তার মাথায় চিন্তা চলছে যুদ্ধে যাওয়া নিয়ে। তাদের গ্রামের অনেকেই গেছে। তারও কি যাওয়া উচিৎ নয় ? অবশ্যই যাওয়া উচিৎ... কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি তার ঠিক সাহস হচ্ছে না। দেশপ্রেম যে তার মধ্যে নেই তা না। অবশ্যই আছে। কিন্তু... কিন্তু সে যদি মরে যায়? আর ফিরে না আসে বুড়ো বাবা-মা আর ছোট বোনটা-- ওদের কী হবে? কিন্তু যারা যুদ্ধে গেছে তারা কি এসব ভেবে চিন্তে গেছে?  দেশকে ভালবাসে বলেই গেছে। তারও কি যাওয়া উচিৎ না?

এই সময় বর্শিতে টান পড়ল। মজনু ছিপ ধরে টান দিল। বেঁধেছে। বড়-সড় একটা মাছই আটকেছে ছিপে। মাছটাকে খেলিয়ে উঠাতে যাবে তখনই ছুটে গেল। মজনুর অবশ্য এর জন্য খুব একটা মন খারাপ হল না। কারণ মাছ ধরাতে আসলে তার মন নেই।
এইতো পর্শুদিন সে বাজারের চায়ের দোকানে বসে কম পক্ষে পরিচিত সাত আটজনকে জিজ্ঞেস করেছে, তার যুদ্ধে যাওয়া উচিৎ কিনা?

চারজন বলেছে এখনই যাওয়া উচিৎ।

তিনজন বলেছে আরেকটু দেখ দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।

একজন গলা নামিয়ে বলেছে ‘ আরে ধুর রাজাকারে ঢুকো। রাজাকার বাহিনী হইছে গ্রামে। ভাল বেতন পাইবা রাইফেল পাইবা। মেলেটারির সমান রেশন পাইবা...ভাইবা দেখ’

মজনু অবশ্য ঐ লাইনে কথা আর বাড়ায়নি। উঠে চলে এসেছে।

শেষ ধাক্কাটা খেয়েছে মরিয়মের কাছে।

মরিয়ম তাদের পাশের গ্রামের মেয়ে। ছোট বোনের বান্ধবী। মাঝে মাঝে আসে। একটু মুখরা টাইপ, বেশি কথা বলে। এইতো সেদিন মজনুকে দেখে ফট করে বলে বসল
- ভাইজান মাছ মারতে যান নাই?
মজনুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সে কি জেলে নাকি? শখ করে মাঝে মধ্যে মাছ ধরে...  
- কেন মাছ ধরা ছাড়া আর কাম নাই আমার?
- যুদ্ধের সময় আর কী কাম! তাইলে যুদ্ধে যান...

বলে মুখ বাকিয়ে চলে যায়! ভীষণ মেজাজ খারাপ হয় মজনুর। সেদিন মাছ ধরার ইচ্ছে থাকলেও যায় না। ঝিম মেরে ঘরে বসে থাকে। মরিয়মের কথা ভাবে।

মে মাসের ২৩ তারিখে মজনু কাউকে না বলে সত্যি সত্যি বেড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে একটা ছোট্ট ব্যাগ। তার যাত্রা মহিষখালি... ভারতের বর্ডার এখান থেকে ত্রিশ মাইল। ধর্মপাশা হয়ে নদী পার হয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ... অবশেষে মজনু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতেই চলেছে। আসার সময় শুধু বাবাকে বলেছে
- বাবা আমি যাই
- কই যাস?
- মহিষখালি ক্যাম্পে

বাবা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়েছে। বাবাকে দ্বিতীয় কথা বলার সুযোগ দেয়নি মজনু। লম্বা লম্বা পা ফেলে একদম বাড়ির বাইরে। বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভাল না। বাবার কাছে সে অপদার্থ পুত্র বিশেষ।

ধর্মপাশা বাজারের একটু আগে মজনু মিয়াকে মেলিটারিরা ধরল। মজনু আসলে বুঝতেই পারেনি। এখানে মেলিটারির ক্যাম্প হয়েছে। প্রাইমারি স্কুলের ভিতর ক্যাম্প। তাকে ধরে নিয়ে সোজা হাজির করা হল এক ক্যাপ্টেনের সামনে। ক্যাপ্টেন আয়েশ করে ফিল্টার সিগারেট টানছিল। তাকে দেখে মধুর হাসি দিয়ে বলল

- কই যাচ্ছিলে? (উর্দুতে)
মজনু কী বলবে বুঝতে পারল না। চুপ করে রইল। আসলে সে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে।
- মহিষখালি যাচ্ছিলে নিশ্চয়ই? (উর্দুতে)      
- ন ন্না
- সত্যি কথা বল ছেড়ে দিব। মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতে? (উর্দুতে)  
- জ্বী না
- সত্যি কথা বল ইয়ার...(উর্দুতে)

এই সময় একটা নারী কন্ঠের আর্তনাদ শুনলো মজনু, ঘুরে তাকিয়ে দেখে একটা তরুণী মেয়েকে টেনে হিচরে নিয়ে যাচ্ছে দু’জন মিলিটারি। মেয়েটার শাড়ির আচল মাটিতে লুটাচ্ছে। মিলিটারি দু’টোর মুখে হাসি। ক্যাপ্টেন ঐ দিকে ফিরেও তাকাল না। যেন এটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। মজনু ফিরে তাকাল ক্যাপ্টেনের দিকে। আর তখনই... আশ্চর্য একটা ব্যাপার ঘটলো- হঠাৎ করে তার ভিতরের ভয়ঙ্কর ভয়টা চলে গেল। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ক্যাপ্টেনের টেবিলের সামনের একমাত্র চেয়ারটা টেনে বসল। পাশে তার কাঁধের বাগটা নামিয়ে রাখল। তারপর পরিষ্কার গলায় বলল

- জ্বী ক্যাপ্টেন সাহেব, আমি আসলে মুক্তি বাহিনীতেই যোগ দিতে যাচ্ছিলাম ...ভারতের মহিষখালি ক্যাম্পে। আপনি ঠিকই ধরেছেন।

ক্যাপ্টেনের হাসি হাসি মুখটা নিভে গেল যেন। এবার ক্যাপ্টেন ইংরেজিতে বললেন-
- ও... ইয়া দ্যাটস নাইস ... দ্যান ইউ আর গোয়িং টু বি এ গ্রেট ফ্রিডম ফাইটার?
মজনু তার কথার জবাব দিল না। তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ক্যাপ্টেন সাহেবের চোখের দিকে। ক্যাপ্টেনের মুখটা আবার আস্তে আস্তে হাসি হাসি হয়ে উঠছে!

মজনুর হাত দু’টো পেছনে বাঁধা। চারজন রাজাকার তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে নদীর ধারে। এর মধ্যে একজন রাজাকার মজনুর চেনা। তাদের গ্রামের ছেলে, নামটাও মনে আছে জামাল... জামাল ভাই। মজনুর তখনও মোটেই ভয় লাগছিল না। যেন এটাই স্বাভাবিক, এভাবেই মরতে হয়। সে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল... এটা কেমন হল? মুক্তিযোদ্ধা হতে পারল না মিলিটারিদের দিকে একটা গুলি ছুরতে পারল না। এম্নি এম্নি মরে যেতে হবে? কোনো মানে আছে? এই মৃত্যুর মানে কী? সে হঠাৎ জামাল লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল
- আচ্ছা আপনারা মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে রাজাকার হলেন কেন?

রাজাকারের দলটির কেউ তার উত্তর দিল না। একজন রাইফেলের বাট দিয়ে সামনের দিকে ঠেলা দিল।
মজনু হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিয়ে সামনের দিকে এগুলো। সূর্য তখন হেলে পড়েছে পশ্চিমে।

চারিদিকে কেমন একটা ধোঁয়াশা ভাব!

মজনুকে পুকুর পাড়ে দাঁড় করানো হয়েছে। রাইফেল কক করলো চার রাজাকার। মজনুর চোখ ভেজা গামছায় বাধা। মজনু হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, জামাল ভাই আমার বাড়িতে খবরটা একটু পৌঁছে দিয়েন... তার কথা শেষ হওয়ার আগেই একসঙ্গে গর্জন করে উঠল চারটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল। মজনু যখন লুটিয়ে পড়ছিল মাটিতে তখন হঠাৎ তার মধ্যে ভয়টা ফিরে এল। ঠিক নিজের জন্য নয়... যে মাটির সবুজ ঘাসের ওপর সে মুখ থুবড়ে পড়েছে সেই মাটির জন্য ভয়... এই মাটি একদিন সত্যি সত্যি স্বাধীন হবে তো?
         
বাংলাদেশ সময়: ১৯২১ ঘণ্টা, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১২
একে

 

বিজয় দিবসের এই বিশেষ আয়োজনের সমন্বয় করেছেন- আহ্‌সান কবীর,আরিফুল ইসলাম আরমান, হাসিবুল হাসান
যোগাযোগ: বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, মিডিয়া হাউজ, প্লট # ৩৭১/এ (৩য় তলা), ব্লক # ডি, বসুন্ধরা রোড, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯, বাংলাদেশ
ফোন: +৮৮০ ২ ৮৪০২১৮১, ৮৪০২১৮২ আই.পি. ফোন: +৮৮০-৯৬১২১২০০০০ নিউজ রুম সেল: +৮৮-০১৭২৯০৭৬৯৯৬, ০১৭২৯০৭৬৯৯৯ ফ্যাক্স: +৮৮০ ২ ৮৪০ ২৩৪৬
ইমেইল: events.bn24@gmail.com, events@banglanews24.com    এডিটর-ইন-চিফ: আলমগীর হোসেন
কপিরাইট © 2013 সকল স্বত্ব ® সংরক্ষিত    একটি ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেড প্রতিষ্ঠান