|
|
|
ছাব্বিশের প্রথম প্রহরঃ পারফেক্ট টাইমিং পারফেক্ট ডিসিশন
|
|
আহমেদ শরীফ শুভ
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
জীবদ্দশায় জিয়াউর রহমান নিজেকে কখনো স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি না করলেও মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা তাকে এই কৃতিত্বের দাবিদার করছেন। সে কারণেই স্বাধীনতা ঘোষণার দিন ও সময় নিয়ে বিতর্ক আজো অব্যাহত আছে। সেই সাথে বিএনপিপন্থীরা বিভিন্ন সময়ে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার বরণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকেই বলছেন সে রাতে আত্মগোপন করে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি নেতৃত্ব দেয়াই তার জন্য অধিকতর যুক্তিযুক্ত হতো।কিন্তু একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে যে, বঙ্গবন্ধুর সামনে পথ ছিল দু’টি। একটি, অসতর্ক সাহসিকতার সাথে বাসভবন ত্যাগ করে জনতার ভিড়ে মিশে মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি নেতৃত্ব নেয়া, অন্যটি গ্রেফতার বরণ করে কৌশলে পশ্চাদপসারণ করা।রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাত্রই জানেন রাজনৈতিক কিংবা সামরিক সংঘাতে অসতর্ক সাহসিকতার সাথে নির্বুদ্ধিতার, আর কৌশলী পশ্চাদপসরণের সঙ্গে কাপুরুষতার ব্যবধান খুবই সূক্ষ্ণ।বাঙালী জাতির সৌভাগ্য, বঙ্গবন্ধু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পেরেছিলেন।তিনি না ছিলেন নির্বোধ, না ছিলেন কাপুরুষ। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণেই সরাসরি স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁর ও বাঙ্গালী জাতির ফিরে আসার কোন পথ ছিল না। কিন্তু তবুও আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে, গ্রেফতারের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। সে মুহূর্তের পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার ‘পূর্ব পাকিস্তানের’ জনগোষ্ঠির উপর সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে নি কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের সাংবিধানিক অধিকারকে সরাসরি অস্বীকার করে নি। সুতরাং, ৭ই মার্চে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে তা হতো রোডেশিয়ার (জিম্বাবুয়ের) শ্বেতাঙ্গ নেতা ইয়ান স্মিথের মতো ‘ইউনিলেটারাল ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’। আর বঙ্গবন্ধু যদি তা-ই করতেন, বহির্বিশ্বে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অধিকতর পরিচিত হওয়ার আশংকা থাকত। ২৫শে মার্চের রাতেই বঙ্গবন্ধুর কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এত সময় নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণের পর বাঙালি জাতির উপর আক্রমণ না চালিয়ে ফিরে যাওয়ার পথ নেই পাকিস্তানি জান্তার। তারা আক্রমণ করবেই।আর একটি নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর উপর প্রথমে আক্রমণ চালালে এবং তাদের ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাংবিধানিক অধিকার অস্বীকার করলে পাকিস্তান সরকার সেই জনগোষ্ঠীর আইনসিদ্ধ সরকার হিসাবে বৈধতা হারাবে। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাতেই বাঙালি জনগোষ্ঠীর নির্বাচিত নেতা হিসাবে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। মধ্যরাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পরপর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহর তাই ছিল আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার মাহেন্দ্রক্ষণ।সেই ঘোষণার সময়টি ইতিহাসকে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছিল। কারণ সেই সময়টিতেই পাকিস্তানি বাহিনী পরিণত হয়েছিল একটি দখলদার বাহিনীতে আর বঙ্গবন্ধু পরিণত হয়েছিলেন একজন স্বাধীনতাকামী রাষ্ট্রনায়কে। ২৫শে মার্চের রাতে কিংবা ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তার পক্ষে আত্মগোপনের চেষ্টা করা কেবল কাপুরুষতাই হতো না, হতো নির্বুদ্ধিতাও। অন্য নেতাদের পক্ষে সম্ভব হলেও পাকসেনা ও গোয়েন্দাদের দৃষ্টি এড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সে রাতে আত্মগোপন করা ছিল দুঃসাধ্য। ‘পলায়নরত’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ শেখ মুজিবকে সান্ধ্যআইন ভঙ্গের অজুহাতে হত্যা করা তখন তাদের পক্ষে অনেক সহজ হতো। হয়তো আন্তর্জাতিক মহলে মৃদু গুঞ্জন কিংবা আপত্তি উঠতো, কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়ে পড়তো দিকভ্রান্ত। আর জাতিকে বিভ্রান্তির মধ্যে দিক-নির্দেশনাহীনভাবে ফেলে রেখে ২৫শে মার্চের রাতে পাকবাহিনীর আক্রমণের আগে আত্মগোপন করলে তা সন্দেহাতীতভাবে হতো কাপুরুষোচিত এবং অধিনায়কের বৈশিষ্ট্য বিবর্জিত। জিয়াউর রহমানের ২৭শে মার্চের সংক্ষিপ্ত বেতার ভাষণ সশস্ত্র যুদ্ধের ঊষালগ্নটিকে আলোকিত করেছিল সত্যি। তিনি যদি বেতারে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পূনর্ব্যক্ত না করতেন তা হলে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের শুরুটি দু’ এক দিন বিলম্বিত হতে পারতো, কিন্তু তাতে মুক্তিযুদ্ধের গতিধারার কোনো পরিবর্তন হতো না।তা ছাড়া এ রকম একটি ঘোষণা দেয়ার বৈধ অধিকার একমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কারোই ছিল না। কারণ, বঙ্গবন্ধুই ছিলেন বাঙালি জাতির একমাত্র নির্বাচিত নেতা। সেই দিন জিয়া যদি স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ না করে অন্য কিছু করতেন, যদি পাকিস্তানিদের আনুগত্য মেনে নিতেন তাহলে কি আমাদের জাতির ইতিহাস অন্যরকম হতো? নিশ্চয়ই না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা না দিয়ে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের জাতিসত্তার অভ্যূদয়ের মোড় অন্য দিকে ঘুরে যেতে পারতো।২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণার সময়টি এবং বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার বরণ করার সিদ্ধান্তটি আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে অভ্যূদয়ের ইতিহাসকে দিক নির্দেশনা দিয়েছিল সঠিক গতিধারায়। অন্যথায় আমাদের ইতিহাস হতে পারতো অন্য রকম। বঙ্গবন্ধু সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন। পারফেক্ট টাইমিং, পারফেক্ট ডিসিশন। shuvo.sharif@gmail.com সম্পাদনা: জুয়েল মাজহার, কনসালট্যান্ট এডিটর।
|
|
|
|
| |
|